মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে চূড়ান্ত ধসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা জাতিসংঘ। সংস্থার মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দেওয়া এক চিঠিতে সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি বকেয়া চাঁদা দ্রুত পরিশোধ করা না হয় এবং প্রচলিত আর্থিক নিয়মে আমূল পরিবর্তন আনা না হয়, তবে বিশ্ব সংস্থাটি অচিরেই সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরের এক ব্রিফিংয়ে মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “তহবিলের অবস্থা এখন এমন এক সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এখনই বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। আমাদের হাতে আগের বছরগুলোর মতো কার্যক্রম সচল রাখার ন্যূনতম নগদ অর্থ বা তারল্য অবশিষ্ট নেই।”
সংকটের মূল কারণ ও বর্তমান চিত্র
জাতিসংঘের এই দেউলিয়াত্ব বা ধসের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
- রেকর্ড বকেয়া: ২০২৫ সাল শেষে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে রেকর্ড ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার চাঁদা বকেয়া পড়েছে। ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের চাঁদা পূর্ণ পরিশোধ করেছে।
- মার্কিন নীতি ও ট্রাম্পের প্রভাব: নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা না হলেও, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প কর্তৃক বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং বিকল্প বৈশ্বিক উদ্যোগ চালুর বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ এবং চীন ২০ শতাংশ অর্থায়ন করে থাকে।
- জুলাইয়ের ডেডলাইন: মহাসচিবের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান গতিতে খরচ চলতে থাকলে আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই জাতিসংঘের সব নগদ অর্থ ফুরিয়ে যেতে পারে।
প্রাচীন নিয়মের সমালোচনা
মহাসচিব গুতেরেস জাতিসংঘের একটি বিশেষ আর্থিক নিয়মের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী, বছর শেষে অব্যবহৃত অর্থ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়। গুতেরেস একে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “যেখানে কার্যক্রম চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থই নেই, সেখানে অর্থ ফেরত দেওয়ার এই প্রাচীন প্রক্রিয়া সংস্থাকে এক অদ্ভুত ও আত্মঘাতী চক্রে আটকে ফেলেছে।”
বিশ্বজুড়ে আশঙ্কার মেঘ
মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাতিসংঘের এই ধস আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ স্থবির করে দেবে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে শান্তি রক্ষা মিশন এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বড় রাষ্ট্রগুলোর এমন আর্থিক অনীহা বিশ্ব ব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মহাসচিবের এই আকুল আবেদন বিশ্ব সংস্থাকে কতটা রক্ষা করতে পারবে, তা এখন নির্ভর করছে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর দ্রুত পদক্ষেপের ওপর। নতুবা ৮০ বছরের এই বিশ্ব সংস্থাটি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























