ঢাকা ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের সাধারণ ক্ষমা: দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসানে স্বস্তির হাওয়া

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০০:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং একটি কুখ্যাত আটক কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশটিতে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অবসান ঘটাতে পারে—এমন আশার সঞ্চার করেছে। প্রায় এক চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে চলা ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পদক্ষেপগুলো। দেশটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে গৃহীত এসব উদ্যোগকে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত শুক্রবার কারাকাসের কাছে রোদেও-১ কারাগারের বাইরে জড়ো হওয়া বন্দিদের স্বজনরা ১৯৯৯ সাল থেকে আটক সব রাজনৈতিক বন্দির জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণার খবর পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন। তাঁরা “আমরা মুক্ত!” স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন আকাশ। ৬৪ বছর বয়সী জোরাইদা গনসালেস এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “আমার মনে হয়েছে শুধু আমি নই, পুরো দেশটাই যেন মুক্ত হয়ে গেছে।” সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন আবেগঘন দৃশ্য দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘদিনের ভয়ের আবহ কাটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ডেলসি রদ্রিগেজ একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এসব উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক মহলের, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আবহে বিরোধী দলীয় কর্মীরাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। মঙ্গলবার ১৭ মাস আত্মগোপনে থাকার পর প্রকাশ্যে আসেন বিরোধী কর্মী ও সাবেক সংসদ সদস্য ডেলসা সোলোরসানো। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যা জনগণ স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। তবে সব কিছুই মসৃণ নয়। এক ব্যতিক্রমী ঘটনায়, এক ছাত্র প্রকাশ্যে বন্দি মুক্তির ধীরগতির প্রতিবাদ জানিয়ে ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে তর্কে জড়ান। ছাত্রনেতা মিগুয়েলআঞ্জেল সুয়ারেজ আটক কেন্দ্রগুলোর বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর দুর্দশার কথা তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, সরকারপন্থী টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও রদ্রিগেজের কড়া সমালোচনা করেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর এই বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থী মারিয়া ইসাবেল সেন্টেনো বলেন, “ভয় পরাজিত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের আগে ও পরের ভেনেজুয়েলার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।” তাঁর মতে, ছাত্রসমাজ, নাগরিক সংগঠন ও বন্দিদের পরিবারগুলোই এই পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। তবে বিরোধী সংসদ সদস্য তোমাস গুয়ানিপা পরিবর্তনের গতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেও সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর এক ভাই কারাগারে এবং আরেকজন গৃহবন্দি। তিনি বলেন, “এক মাস আগেও কি কেউ ভাবতে পেরেছিল আজ আমরা এখানে পৌঁছাব?”

বিশ্লেষক পাবলো কিন্তেরো মনে করেন, বড় ধরনের রাজনৈতিক রূপান্তরের কথা বলা এখনই সময়ের আগেই হবে। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে বিরোধীদের দমন ও কারাবন্দি করা এখন সরকারের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। মাদুরোর শাসনের শেষ বছরগুলোতে দমন-পীড়ন চরমে পৌঁছেছিল এবং বহু পরিবার এখনও সেই ক্ষতের ভার বইছে। গনসালেস বলেন, “২৫ বছর ধরে আমরা দমন-পীড়নের মধ্যে বেঁচে আছি। আমার ছেলে নির্দোষ।” কারাকাসের আরেক কারাগার ‘জোনা ৭’-এর বাইরে অপেক্ষমাণ ৬৫ বছর বয়সী আলিসিয়া রোহাস বলেন, সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় তিনি আশাবাদী হলেও ভয় পুরোপুরি কাটেনি। “কখন কে আপনাকে ধরিয়ে দেবে, তা বলা যায় না।” কারাগারের দেয়ালে আঁকা সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মুরাল—কঠোর দৃষ্টি আর নিচে লেখা, “অলিগার্করা কাঁপুক! স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক”—ভেনেজুয়েলার অতীতের ভয়ের স্মারক হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে, যা মনে করিয়ে দেয় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীর ছয় থানা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৬০ জন গ্রেপ্তার

ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের সাধারণ ক্ষমা: দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসানে স্বস্তির হাওয়া

আপডেট সময় : ০৯:০০:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং একটি কুখ্যাত আটক কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশটিতে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অবসান ঘটাতে পারে—এমন আশার সঞ্চার করেছে। প্রায় এক চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে চলা ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পদক্ষেপগুলো। দেশটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে গৃহীত এসব উদ্যোগকে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত শুক্রবার কারাকাসের কাছে রোদেও-১ কারাগারের বাইরে জড়ো হওয়া বন্দিদের স্বজনরা ১৯৯৯ সাল থেকে আটক সব রাজনৈতিক বন্দির জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণার খবর পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন। তাঁরা “আমরা মুক্ত!” স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন আকাশ। ৬৪ বছর বয়সী জোরাইদা গনসালেস এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “আমার মনে হয়েছে শুধু আমি নই, পুরো দেশটাই যেন মুক্ত হয়ে গেছে।” সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন আবেগঘন দৃশ্য দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘদিনের ভয়ের আবহ কাটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ডেলসি রদ্রিগেজ একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এসব উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক মহলের, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আবহে বিরোধী দলীয় কর্মীরাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। মঙ্গলবার ১৭ মাস আত্মগোপনে থাকার পর প্রকাশ্যে আসেন বিরোধী কর্মী ও সাবেক সংসদ সদস্য ডেলসা সোলোরসানো। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যা জনগণ স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। তবে সব কিছুই মসৃণ নয়। এক ব্যতিক্রমী ঘটনায়, এক ছাত্র প্রকাশ্যে বন্দি মুক্তির ধীরগতির প্রতিবাদ জানিয়ে ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে তর্কে জড়ান। ছাত্রনেতা মিগুয়েলআঞ্জেল সুয়ারেজ আটক কেন্দ্রগুলোর বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর দুর্দশার কথা তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, সরকারপন্থী টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও রদ্রিগেজের কড়া সমালোচনা করেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর এই বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থী মারিয়া ইসাবেল সেন্টেনো বলেন, “ভয় পরাজিত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের আগে ও পরের ভেনেজুয়েলার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।” তাঁর মতে, ছাত্রসমাজ, নাগরিক সংগঠন ও বন্দিদের পরিবারগুলোই এই পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। তবে বিরোধী সংসদ সদস্য তোমাস গুয়ানিপা পরিবর্তনের গতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেও সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর এক ভাই কারাগারে এবং আরেকজন গৃহবন্দি। তিনি বলেন, “এক মাস আগেও কি কেউ ভাবতে পেরেছিল আজ আমরা এখানে পৌঁছাব?”

বিশ্লেষক পাবলো কিন্তেরো মনে করেন, বড় ধরনের রাজনৈতিক রূপান্তরের কথা বলা এখনই সময়ের আগেই হবে। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে বিরোধীদের দমন ও কারাবন্দি করা এখন সরকারের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। মাদুরোর শাসনের শেষ বছরগুলোতে দমন-পীড়ন চরমে পৌঁছেছিল এবং বহু পরিবার এখনও সেই ক্ষতের ভার বইছে। গনসালেস বলেন, “২৫ বছর ধরে আমরা দমন-পীড়নের মধ্যে বেঁচে আছি। আমার ছেলে নির্দোষ।” কারাকাসের আরেক কারাগার ‘জোনা ৭’-এর বাইরে অপেক্ষমাণ ৬৫ বছর বয়সী আলিসিয়া রোহাস বলেন, সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় তিনি আশাবাদী হলেও ভয় পুরোপুরি কাটেনি। “কখন কে আপনাকে ধরিয়ে দেবে, তা বলা যায় না।” কারাগারের দেয়ালে আঁকা সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মুরাল—কঠোর দৃষ্টি আর নিচে লেখা, “অলিগার্করা কাঁপুক! স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক”—ভেনেজুয়েলার অতীতের ভয়ের স্মারক হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে, যা মনে করিয়ে দেয় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।