ঢাকা ০৬:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

অপরিকল্পিত স্লুইস গেটে খরস্রোতা আত্রাইয়ের মৃত্যু

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২৪:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

## শিরোনাম: অপরিকল্পিত স্লুইস গেট: বিলুপ্তির পথে খরস্রোতা আত্রাই নদী, কৃষিকাজ ও মৎস্যজীবীদের জীবনে বিপর্যয়

নওগাঁ, [তারিখ]: অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত স্লুইস গেটের কারণে বিলুপ্তির পথে দাঁড়িয়েছে উত্তরাঞ্চলের একসময়ের খরস্রোতা আত্রাই নদী। এর ফলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট, যা ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। একই সঙ্গে, নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির নানা ধরনের মাছ, এবং এর সাথে জড়িত অসংখ্য মৎস্যজীবী পরিবার আজ বেকারত্বের অভিশাপে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ঐতিহাসিকভাবে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নদী আত্রাইয়ের উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ত্রিস্রোতা থেকে। এরপর এটি বাংলাদেশের দিনাজপুর, নওগাঁর ধামইরহাট, পত্নীতলা, মহাদেবপুর ও মান্দা হয়ে আত্রাই উপজেলায় প্রবেশ করেছে। উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নদীটি নাটোরের সিংড়া ও বিখ্যাত চলনবিলের ভেতর দিয়ে যমুনা নদীতে মিলিত হয়েছে। অন্যদিকে, উপজেলা সদরের উত্তর দিক থেকে গুড়ন নদী নামে একটি শাখা নদী সিংড়ার দিকে প্রবাহিত হয়েছে।

সমস্যাটির সূত্রপাত ঘটে গত শতাব্দীর আশির দশকে, যখন আত্রাই উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বিশাল আত্রাই নদীর উপর মাত্র একটি গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। একই সময়ে, উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কাশিয়াবাড়ী নামক স্থানে একটি সরু পাড়ের উপর ১০টি গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট স্থাপন করা হয়। এই দুটি স্থাপনার নকশা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশাল নদীর উপর একটি মাত্র গেট এবং সরু পাড়ের উপর দশটি গেট নির্মাণের পেছনের পরিকল্পনা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি রয়েছে।

কাশিয়াবাড়ীর ১০ গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণের ফলে আত্রাই নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গেট থেকে দক্ষিণ দিকে চলনবিল পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদীটি শুকিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ জলশূন্য অংশে অবস্থিত পাঁচপাকিয়া, বিলগলিয়া, জগদীশপুর, কোলা, কাসুন্দা, খনজোর, জয়সাড়া, নবাবের তাম্বু, পবনডাঙ্গা, বিপ্রবোয়ালিয়া, গোপালবাটি, বাঁকিওলমা, কান্দওলমা, স্থলওলমা, ভাগসুন্দর, ক্ষুদ্রবিশা, পারবিশা, নাটোরের খাজুরা, শেরকোলসহ অসংখ্য গ্রামের কৃষিজমি আজ পানির অভাবে ফসল উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। নদীর এই পানিশূন্যতার কারণে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছও এই অঞ্চল থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

পারকাসুন্দা গ্রামের খোরশেদ আলম, নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের নিয়ামত আলী বাবু, বাঁকিওলমা গ্রামের সাইফুল ইসলাম, পাঁচপাকিয়া গ্রামের জাহেদুল ইসলাম এবং খাজুরা গ্রামের রাজু আহমেদ জানান, “আত্রাই নদীর উপর এই অপরিকল্পিত স্লুইস গেট নির্মাণের ফলে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা যুগ যুগ ধরে কৃষি ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছি।”

উপজেলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি প্রফুল্ল চন্দ্র হাওলাদার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উপজেলার শত শত জেলে পরিবার সারা বছর মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আত্রাই নদী মরে যাওয়ায় তারা আজ বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।”

এ বিষয়ে নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি বলেন, “স্লুইস গেটগুলো অনেক আগে নির্মাণ করা হয়েছে, যখন আমার জন্মই হয়নি। একটি খালের উপর ১০ গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট এবং বিশাল আত্রাই নদীর উপর মাত্র এক গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণের বিষয়টি আমি বলতে পারব না। আমি এখানে নতুন এসেছি, এ ব্যাপারে আমার তেমন ধারণা নেই। তবে আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণ করেছে বিএনপি সরকার: অর্থমন্ত্রী

অপরিকল্পিত স্লুইস গেটে খরস্রোতা আত্রাইয়ের মৃত্যু

আপডেট সময় : ০৪:২৪:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## শিরোনাম: অপরিকল্পিত স্লুইস গেট: বিলুপ্তির পথে খরস্রোতা আত্রাই নদী, কৃষিকাজ ও মৎস্যজীবীদের জীবনে বিপর্যয়

নওগাঁ, [তারিখ]: অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত স্লুইস গেটের কারণে বিলুপ্তির পথে দাঁড়িয়েছে উত্তরাঞ্চলের একসময়ের খরস্রোতা আত্রাই নদী। এর ফলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট, যা ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। একই সঙ্গে, নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির নানা ধরনের মাছ, এবং এর সাথে জড়িত অসংখ্য মৎস্যজীবী পরিবার আজ বেকারত্বের অভিশাপে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ঐতিহাসিকভাবে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নদী আত্রাইয়ের উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ত্রিস্রোতা থেকে। এরপর এটি বাংলাদেশের দিনাজপুর, নওগাঁর ধামইরহাট, পত্নীতলা, মহাদেবপুর ও মান্দা হয়ে আত্রাই উপজেলায় প্রবেশ করেছে। উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নদীটি নাটোরের সিংড়া ও বিখ্যাত চলনবিলের ভেতর দিয়ে যমুনা নদীতে মিলিত হয়েছে। অন্যদিকে, উপজেলা সদরের উত্তর দিক থেকে গুড়ন নদী নামে একটি শাখা নদী সিংড়ার দিকে প্রবাহিত হয়েছে।

সমস্যাটির সূত্রপাত ঘটে গত শতাব্দীর আশির দশকে, যখন আত্রাই উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বিশাল আত্রাই নদীর উপর মাত্র একটি গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। একই সময়ে, উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কাশিয়াবাড়ী নামক স্থানে একটি সরু পাড়ের উপর ১০টি গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট স্থাপন করা হয়। এই দুটি স্থাপনার নকশা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশাল নদীর উপর একটি মাত্র গেট এবং সরু পাড়ের উপর দশটি গেট নির্মাণের পেছনের পরিকল্পনা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি রয়েছে।

কাশিয়াবাড়ীর ১০ গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণের ফলে আত্রাই নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গেট থেকে দক্ষিণ দিকে চলনবিল পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদীটি শুকিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ জলশূন্য অংশে অবস্থিত পাঁচপাকিয়া, বিলগলিয়া, জগদীশপুর, কোলা, কাসুন্দা, খনজোর, জয়সাড়া, নবাবের তাম্বু, পবনডাঙ্গা, বিপ্রবোয়ালিয়া, গোপালবাটি, বাঁকিওলমা, কান্দওলমা, স্থলওলমা, ভাগসুন্দর, ক্ষুদ্রবিশা, পারবিশা, নাটোরের খাজুরা, শেরকোলসহ অসংখ্য গ্রামের কৃষিজমি আজ পানির অভাবে ফসল উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। নদীর এই পানিশূন্যতার কারণে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছও এই অঞ্চল থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

পারকাসুন্দা গ্রামের খোরশেদ আলম, নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের নিয়ামত আলী বাবু, বাঁকিওলমা গ্রামের সাইফুল ইসলাম, পাঁচপাকিয়া গ্রামের জাহেদুল ইসলাম এবং খাজুরা গ্রামের রাজু আহমেদ জানান, “আত্রাই নদীর উপর এই অপরিকল্পিত স্লুইস গেট নির্মাণের ফলে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা যুগ যুগ ধরে কৃষি ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছি।”

উপজেলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি প্রফুল্ল চন্দ্র হাওলাদার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উপজেলার শত শত জেলে পরিবার সারা বছর মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আত্রাই নদী মরে যাওয়ায় তারা আজ বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।”

এ বিষয়ে নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি বলেন, “স্লুইস গেটগুলো অনেক আগে নির্মাণ করা হয়েছে, যখন আমার জন্মই হয়নি। একটি খালের উপর ১০ গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট এবং বিশাল আত্রাই নদীর উপর মাত্র এক গেটবিশিষ্ট স্লুইস গেট নির্মাণের বিষয়টি আমি বলতে পারব না। আমি এখানে নতুন এসেছি, এ ব্যাপারে আমার তেমন ধারণা নেই। তবে আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”