ঢাকা ০৪:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি’ ছিল বলেই এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেছেন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ‘হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি’ ছিল বলেই তারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেননি। তার মতে, তারা যদি সেদিন ওই সনদে স্বাক্ষর করতেন, তবে আজকে ‘এই পরিস্থিতিতে’ আসতে পারতেন না।

মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রূপরেখা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে নাসীরুদ্দীন এসব কথা বলেন।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন সংলাপ, বৈঠক ও তর্ক-বিতর্কের পর জুলাই জাতীয় সনদটি গ্রহণ করা হয়। গত ১৭ অক্টোবর সংলাপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করে।

তবে, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতারা ওই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। এনসিপিসহ মোট পাঁচটি দল এই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে।

এমন একটি পরিস্থিতিতেই মঙ্গলবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং সাংবিধানিক আদেশের সুপারিশসহ একটি সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দিয়েছে।

জুলাই সনদে এনসিপির কেন স্বাক্ষর করেনি, তার কারণ ব্যাখ্যা করে দলের মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, “এনসিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, কেন আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করিনি। (কিন্তু) আমরা যদি সেদিন স্বাক্ষর করতাম, তাহলে হয়তো আজকে এই পরিস্থিতিতে আমরা আসতে পারতাম না।”

নাসীরুদ্দীন বলেন, “আমরা বিষয়টি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমাদের সামনে তখন অনেক ঝুঁকি ছিল। আমরা স্বাক্ষর না করে জাসদের মতো হারিয়ে যাব কি না, অথবা আমরা যদি স্বাক্ষর না করি, তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাব কি না? এমন একটা আশঙ্কা আমাদের নিজেদের মধ্যেও ছিল।”

এরপরও এনসিপি ‘জনগণের কথা ভেবে’ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি দাবি করে নাসীরুদ্দীন বলেন, “কিন্তু আমরা তখন নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম যে, এই মুহূর্তে আমাদের আহত সৈনিকদের এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।”

“এবং সব ঝুঁকি আছে জেনেও আমরা এমন একটি ‘বোল্ড স্টেটমেন্ট’ বা সাহসী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আজকে তার একটা ফলাফল আমরা পেয়েছি। এজন্য আমরা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

তবে সনদ বাস্তবায়নের এই প্রক্রিয়ায় এখনও ভুল-ভ্রান্তি আছে দাবি করে তিনি বলেন, “যদিও এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক ভুল-ভ্রান্তি রয়ে গেছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, কীভাবে এই প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল করা যায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞরা বসে একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন।”

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আরও বলেন, “এনসিপির বিরুদ্ধে একটা পুরোনো অভিযোগ হলো, আমরা নাকি ‘জুলাই’ (আন্দোলন) বিক্রি করে দিয়েছি। আমরা জুলাই বিক্রি করতে আসিনি। আমরা ‘জুলাই’-কে তার সঠিক পথে ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

দেশের সংবিধানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো সংবিধান ছিল না। যা ছিল তা ‘মুজিবের আইন’। মুজিব যা বলেছেন, সেটাই সংবিধান ছিল। জিয়াউর রহমান যা বলেছেন, সেটাই সংবিধান ছিল। এরশাদ যা বলেছেন, তা-ই সংবিধান ছিল। খালেদা জিয়া যা বলেছিলেন, তা-ই সংবিধান ছিল। আর সবশেষে শেখ হাসিনা তো নিজেই সংবিধানের ওপরে উঠে গিয়েছিলেন।”

“ফলে, আমরা সব রাজনৈতিক দলকে টেনে ধরে সংবিধানের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। তারা যেটা তৈরি করেছিল, সেটা একটা পচা-গলা সংবিধান। এই সংবিধান দিয়ে আর বাংলাদেশ চলতে পারে না।”

এই গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি লিখিত রূপরেখা পেশ করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা।

বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও সারোয়ার তুষার, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরীন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি এবং সাংবাদিক রাজীব আহাম্মেদ।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরী ধর্ষণ-হত্যা: দ্রুত ও প্রকাশ্যে বিচার চাইলেন মাওলানা জালালুদ্দীন

‘হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি’ ছিল বলেই এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

আপডেট সময় : ০১:০৮:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেছেন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ‘হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি’ ছিল বলেই তারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেননি। তার মতে, তারা যদি সেদিন ওই সনদে স্বাক্ষর করতেন, তবে আজকে ‘এই পরিস্থিতিতে’ আসতে পারতেন না।

মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রূপরেখা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে নাসীরুদ্দীন এসব কথা বলেন।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন সংলাপ, বৈঠক ও তর্ক-বিতর্কের পর জুলাই জাতীয় সনদটি গ্রহণ করা হয়। গত ১৭ অক্টোবর সংলাপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করে।

তবে, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতারা ওই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। এনসিপিসহ মোট পাঁচটি দল এই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে।

এমন একটি পরিস্থিতিতেই মঙ্গলবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং সাংবিধানিক আদেশের সুপারিশসহ একটি সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দিয়েছে।

জুলাই সনদে এনসিপির কেন স্বাক্ষর করেনি, তার কারণ ব্যাখ্যা করে দলের মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, “এনসিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, কেন আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করিনি। (কিন্তু) আমরা যদি সেদিন স্বাক্ষর করতাম, তাহলে হয়তো আজকে এই পরিস্থিতিতে আমরা আসতে পারতাম না।”

নাসীরুদ্দীন বলেন, “আমরা বিষয়টি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমাদের সামনে তখন অনেক ঝুঁকি ছিল। আমরা স্বাক্ষর না করে জাসদের মতো হারিয়ে যাব কি না, অথবা আমরা যদি স্বাক্ষর না করি, তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাব কি না? এমন একটা আশঙ্কা আমাদের নিজেদের মধ্যেও ছিল।”

এরপরও এনসিপি ‘জনগণের কথা ভেবে’ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি দাবি করে নাসীরুদ্দীন বলেন, “কিন্তু আমরা তখন নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম যে, এই মুহূর্তে আমাদের আহত সৈনিকদের এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।”

“এবং সব ঝুঁকি আছে জেনেও আমরা এমন একটি ‘বোল্ড স্টেটমেন্ট’ বা সাহসী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আজকে তার একটা ফলাফল আমরা পেয়েছি। এজন্য আমরা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

তবে সনদ বাস্তবায়নের এই প্রক্রিয়ায় এখনও ভুল-ভ্রান্তি আছে দাবি করে তিনি বলেন, “যদিও এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক ভুল-ভ্রান্তি রয়ে গেছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, কীভাবে এই প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল করা যায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞরা বসে একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন।”

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আরও বলেন, “এনসিপির বিরুদ্ধে একটা পুরোনো অভিযোগ হলো, আমরা নাকি ‘জুলাই’ (আন্দোলন) বিক্রি করে দিয়েছি। আমরা জুলাই বিক্রি করতে আসিনি। আমরা ‘জুলাই’-কে তার সঠিক পথে ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

দেশের সংবিধানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো সংবিধান ছিল না। যা ছিল তা ‘মুজিবের আইন’। মুজিব যা বলেছেন, সেটাই সংবিধান ছিল। জিয়াউর রহমান যা বলেছেন, সেটাই সংবিধান ছিল। এরশাদ যা বলেছেন, তা-ই সংবিধান ছিল। খালেদা জিয়া যা বলেছিলেন, তা-ই সংবিধান ছিল। আর সবশেষে শেখ হাসিনা তো নিজেই সংবিধানের ওপরে উঠে গিয়েছিলেন।”

“ফলে, আমরা সব রাজনৈতিক দলকে টেনে ধরে সংবিধানের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। তারা যেটা তৈরি করেছিল, সেটা একটা পচা-গলা সংবিধান। এই সংবিধান দিয়ে আর বাংলাদেশ চলতে পারে না।”

এই গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি লিখিত রূপরেখা পেশ করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা।

বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও সারোয়ার তুষার, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরীন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি এবং সাংবাদিক রাজীব আহাম্মেদ।