ঢাকা ০৯:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

নির্বাচন ভণ্ডুলে মাঠে নেমেছে নয়াদিল্লি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:২৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

## শিরোনাম: নির্বাচন বানচালের মিশনে ভারত, ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ

ঢাকা: আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার একটি গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের নীতিনির্ধারকরা মূলত আসন্ন গণভোটকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে জানা গেছে। এই তৎপরতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নয়াদিল্লির এই অপতৎপরতার অংশ হিসেবেই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে সামনে আনা হচ্ছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘সেফ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার একটি অডিও বক্তব্য প্রচার করা হয়। এই বক্তব্যে তিনি দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি নির্বাচন প্রতিহত করার আহ্বান জানান, যা সন্ত্রাসকে উস্কে দেওয়ার শামিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বক্তব্যে বাংলাদেশের সরকার উৎখাত এবং আসন্ন নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে সহিংসতা উস্কে দেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি এবং দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিশ্বস্ত জাতীয় পার্টির অবস্থান নাজুক। অন্যদিকে, বিএনপিকে পুরোপুরি আস্থায় আনতে ভারত ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামী দলগুলোর জোটের নির্বাচনে ভালো ফলাফল করার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দিল্লির উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত নির্বাচন ভণ্ডুল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় অনুষ্ঠান এবং শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য প্রচারের নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরাসরি কাজ করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনুষ্ঠানটি মূলত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদারকিতে পরিচালিত হয়েছিল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে আনার ব্যাপারে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও কেউ কেউ শেখ হাসিনাকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত একটি রেকর্ড করা ইংরেজি অডিও বার্তা প্রচার করা হয়। বাংলাতেও একটি বার্তা রেকর্ড করা হয়েছিল, তবে কারিগরি সমস্যার কারণ দেখিয়ে সেটি প্রচার করা হয়নি। জানা গেছে, বাংলায় রেকর্ড করা বার্তাটি ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক।

শেখ হাসিনা তার অডিও বার্তায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, ড. ইউনূসকে খুনি, ফ্যাসিস্ট, সুদখোর, ক্ষমতালোভী এবং বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসাথে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সম্পদ বিদেশিদের কাছে বিকিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

দিল্লির একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল আগামী নির্বাচন ও গণভোটকে ব্যাহত করা। নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না এবং তাকে চাপে ফেলার শেষ চেষ্টা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা চাইছে গণভোটে যেন ‘না’ জয়যুক্ত হয় এবং এ লক্ষ্যে বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করেছে। তাদের বিশ্বস্ত জাতীয় পার্টি প্রকাশ্যে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলে ড. ইউনূসকে একটি শিক্ষা দেওয়া যাবে বলে ভারত মনে করছে। এছাড়া, তারা চাইছে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ভোটের হার যেন ৫০ শতাংশের নিচে থাকে, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে বলা যায় যে আওয়ামী লীগকে ছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে মাঠে নামানোর পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন থিংক ট্যাংক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে কাজে লাগাচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে অনিশ্চয়তায় ফেলার পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেয় করতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। সম্প্রতি দিল্লি প্রেস ক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন।

বাংলাদেশের সরকার, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশবিরোধী সর্বাত্মক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। দ্বিপাক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। এই ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের প্রচলিত নীতিমালা, যেমন সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং সুপ্রতিবেশী সুলভ আচরণের পরিপন্থী। এটি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি একটি স্পষ্ট অবমাননাকর পদক্ষেপ। সরকার আরও বলেছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারগুলোর পক্ষে পারস্পরিক কল্যাণমূলক দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ দিল্লির এই পদক্ষেপকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে এবং শেখ হাসিনাকে দিয়ে নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আগামী নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তিনি বলেন, ভারত প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকার, রাজনৈতিক দল ও দেশের সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ভারত সরকার ড. ইউনূস সরকারকে চাপে ফেলার পাশাপাশি নির্বাচন ভণ্ডুলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। তিনি বলেন, ভারতের নীতি-নির্ধারকরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছে। বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে সমান সমান লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছে তারা। তিনি আরও বলেন, দিল্লির মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকে ভণ্ডুল করে দেওয়া। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সোচ্চার হওয়া।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইয়া তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে ভারতে একটি অনুষ্ঠানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য প্রচারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ভারত গণহত্যার দায়ে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। তিনি আরও লেখেন, শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের বিজেপি সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে এবং ইতোমধ্যেই অবনতিশীল সম্পর্কটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার পরিণতিতে ভারতকে আরো বড় মূল্য দিতে বাধ্য হতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তারাগঞ্জে পাচারকালে ৪০০ লিটার পেট্রোল জব্দ, আটক ১

নির্বাচন ভণ্ডুলে মাঠে নেমেছে নয়াদিল্লি

আপডেট সময় : ০৫:২৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

## শিরোনাম: নির্বাচন বানচালের মিশনে ভারত, ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ

ঢাকা: আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার একটি গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের নীতিনির্ধারকরা মূলত আসন্ন গণভোটকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে জানা গেছে। এই তৎপরতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নয়াদিল্লির এই অপতৎপরতার অংশ হিসেবেই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে সামনে আনা হচ্ছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘সেফ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার একটি অডিও বক্তব্য প্রচার করা হয়। এই বক্তব্যে তিনি দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি নির্বাচন প্রতিহত করার আহ্বান জানান, যা সন্ত্রাসকে উস্কে দেওয়ার শামিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বক্তব্যে বাংলাদেশের সরকার উৎখাত এবং আসন্ন নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে সহিংসতা উস্কে দেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি এবং দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিশ্বস্ত জাতীয় পার্টির অবস্থান নাজুক। অন্যদিকে, বিএনপিকে পুরোপুরি আস্থায় আনতে ভারত ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামী দলগুলোর জোটের নির্বাচনে ভালো ফলাফল করার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দিল্লির উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত নির্বাচন ভণ্ডুল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় অনুষ্ঠান এবং শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য প্রচারের নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরাসরি কাজ করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনুষ্ঠানটি মূলত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদারকিতে পরিচালিত হয়েছিল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে আনার ব্যাপারে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও কেউ কেউ শেখ হাসিনাকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত একটি রেকর্ড করা ইংরেজি অডিও বার্তা প্রচার করা হয়। বাংলাতেও একটি বার্তা রেকর্ড করা হয়েছিল, তবে কারিগরি সমস্যার কারণ দেখিয়ে সেটি প্রচার করা হয়নি। জানা গেছে, বাংলায় রেকর্ড করা বার্তাটি ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক।

শেখ হাসিনা তার অডিও বার্তায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, ড. ইউনূসকে খুনি, ফ্যাসিস্ট, সুদখোর, ক্ষমতালোভী এবং বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসাথে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সম্পদ বিদেশিদের কাছে বিকিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

দিল্লির একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল আগামী নির্বাচন ও গণভোটকে ব্যাহত করা। নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না এবং তাকে চাপে ফেলার শেষ চেষ্টা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা চাইছে গণভোটে যেন ‘না’ জয়যুক্ত হয় এবং এ লক্ষ্যে বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করেছে। তাদের বিশ্বস্ত জাতীয় পার্টি প্রকাশ্যে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলে ড. ইউনূসকে একটি শিক্ষা দেওয়া যাবে বলে ভারত মনে করছে। এছাড়া, তারা চাইছে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ভোটের হার যেন ৫০ শতাংশের নিচে থাকে, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে বলা যায় যে আওয়ামী লীগকে ছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে মাঠে নামানোর পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন থিংক ট্যাংক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে কাজে লাগাচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে অনিশ্চয়তায় ফেলার পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেয় করতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। সম্প্রতি দিল্লি প্রেস ক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন।

বাংলাদেশের সরকার, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশবিরোধী সর্বাত্মক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। দ্বিপাক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। এই ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের প্রচলিত নীতিমালা, যেমন সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং সুপ্রতিবেশী সুলভ আচরণের পরিপন্থী। এটি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি একটি স্পষ্ট অবমাননাকর পদক্ষেপ। সরকার আরও বলেছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারগুলোর পক্ষে পারস্পরিক কল্যাণমূলক দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ দিল্লির এই পদক্ষেপকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে এবং শেখ হাসিনাকে দিয়ে নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আগামী নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তিনি বলেন, ভারত প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকার, রাজনৈতিক দল ও দেশের সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ভারত সরকার ড. ইউনূস সরকারকে চাপে ফেলার পাশাপাশি নির্বাচন ভণ্ডুলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। তিনি বলেন, ভারতের নীতি-নির্ধারকরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছে। বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে সমান সমান লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছে তারা। তিনি আরও বলেন, দিল্লির মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকে ভণ্ডুল করে দেওয়া। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সোচ্চার হওয়া।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইয়া তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে ভারতে একটি অনুষ্ঠানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য প্রচারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ভারত গণহত্যার দায়ে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। তিনি আরও লেখেন, শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের বিজেপি সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে এবং ইতোমধ্যেই অবনতিশীল সম্পর্কটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার পরিণতিতে ভারতকে আরো বড় মূল্য দিতে বাধ্য হতে হবে।