ঢাকা ০২:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

আমনের ক্ষেতে পোকার হানা, দিশেহারা কৃষকরা; বলছেন, কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা মিলছে না

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪৪ বার পড়া হয়েছে

ময়মনসিংহে আমন ধানের ক্ষেতে মাজরা পোকার ব্যাপক আক্রমণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পোকা দমনে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এই পোকা ধানের শীষ খেয়ে ফেলার ফলে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। কৃষকরা জানাচ্ছেন, বারবার কীটনাশক স্প্রে করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। তাদের আরও অভিযোগ, এই বিপদের সময়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকেই তারা কাছে পাচ্ছেন না। পোকা দমন বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের সহায়তা বা পরামর্শ মিলছে না বলে তারা জানান।

জেলার আমন চাষিরা এবার ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাজরা পোকা। পোকার আক্রমণে ধানগাছ শুকিয়ে মরে যাওয়ায় কৃষকরা এখন চরম হতাশ।

সদর উপজেলার গোপালনগর গ্রামের একজন কৃষক সাইফুল ইসলাম। তিনি এই মৌসুমে ২২ শতক জমিতে হাইব্রিড স্বর্ণা জাতের আমন ধান চাষ করেছেন। তার ক্ষেতে সবেমাত্র ধানের শীষ বের হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই পোকার আক্রমণ শুরু হয়। পোকার আক্রমণের ফলে ধানের শীষ শুকিয়ে যাচ্ছে এবং গাছগুলো মরে যাচ্ছে।

সাইফুল ইসলাম ‘বাংলা ট্রিবিউন’-কে বলেন, এই পোকা দমন করতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। তিনি বলেন, “গত ১০ বছরের মধ্যে এবারই আমনের আবাদ সবচেয়ে ভালো হয়েছিল। কিন্তু যেই শীষ বের হতে শুরু করলো, অমনি পোকার আক্রমণ। পোকাগুলো কচি শীষ খেয়ে ফেলার কয়েকদিন পরই গাছ মরে যাচ্ছে। আক্রমণ দিন দিন বাড়ছেই। চারবার কীটনাশক দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। পোকা কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছে না। এতে ফলন যে অনেক কমে যাবে তা বোঝাই যাচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ভেবেছিলাম এবার ফলন ভালো হলে সারা বছরের চাল রেখে বাকিটা বিক্রি করে লাভবান হবো। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি, তাতে ধান ঘরে তোলা নিয়েই সংশয়ে আছি।”

শুধু সাইফুল ইসলামই নন, জেলার আরও অনেক কৃষকের জমিতেই পোকা হানা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, বারবার কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো ফল মিলছে না, অথচ কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তার পরামর্শও তারা পাচ্ছেন না।

ওই একই এলাকার আরেক কৃষক আনসার আলী বলেন, “এলাকার বেশিরভাগ আমন ক্ষেতেই পোকা লেগেছে। বারবার ওষুধ ছিটিয়েও কাজ হচ্ছে না। পরামর্শের জন্য কৃষি অফিসের কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

জেলা সদরের কৃষক তালেব উদ্দিন জানান, “একটা ক্ষেতে পোকা লাগার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তা পাশের ক্ষেতেও ছড়িয়ে পড়ছে। কীটনাশক দিয়েও এই পোকা মরছে না। মনে হচ্ছে আমরা এবার বড় ধরনের লোকসানে পড়বো।”

আরেক চাষি মনির হোসেন জানালেন, পোকা দমনের জন্য কৃষকরা নানা কোম্পানির কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “পোকা লাগার কয়েকদিন পরেই ধানগাছ শুকিয়ে খড় হয়ে যাচ্ছে। সেই খড় এমনকি গরুও খাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যদি সঠিক পরামর্শ পেতাম, তাহলে হয়তো কিছুটা রক্ষা হতো। কিন্তু মাঠেই তো তাদের দেখা পাই না।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ময়মনসিংহ জেলায় মোট দুই লাখ ৬৮ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ ৮৬ হাজার ২৬০ মেট্রিক টন।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপপরিচালক মো. এনামুল হক ‘বাংলা ট্রিবিউন’-কে বলেন, “আমন ক্ষেতে পোকা দমনের জন্য কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠেই আছেন এবং কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। যেসব এলাকায় পোকার আক্রমণের কথা শোনা যাচ্ছে, সেখানকার কৃষকরা হয়তো আমাদের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাননি। তারপরও, আমরা অভিযোগ যেহেতু পেয়েছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। পাশাপাশি ওই এলাকাগুলোতে কৃষি অফিস থেকে দ্রুত কর্মকর্তা পাঠিয়ে পোকা দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরাইলি হেফাজতে আরও এক ফিলিস্তিনি বন্দির মৃত্যু, যুদ্ধ শুরুর পর প্রাণহানি বেড়ে ৮৭

আমনের ক্ষেতে পোকার হানা, দিশেহারা কৃষকরা; বলছেন, কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা মিলছে না

আপডেট সময় : ০৯:৩৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

ময়মনসিংহে আমন ধানের ক্ষেতে মাজরা পোকার ব্যাপক আক্রমণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পোকা দমনে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এই পোকা ধানের শীষ খেয়ে ফেলার ফলে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। কৃষকরা জানাচ্ছেন, বারবার কীটনাশক স্প্রে করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। তাদের আরও অভিযোগ, এই বিপদের সময়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকেই তারা কাছে পাচ্ছেন না। পোকা দমন বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের সহায়তা বা পরামর্শ মিলছে না বলে তারা জানান।

জেলার আমন চাষিরা এবার ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাজরা পোকা। পোকার আক্রমণে ধানগাছ শুকিয়ে মরে যাওয়ায় কৃষকরা এখন চরম হতাশ।

সদর উপজেলার গোপালনগর গ্রামের একজন কৃষক সাইফুল ইসলাম। তিনি এই মৌসুমে ২২ শতক জমিতে হাইব্রিড স্বর্ণা জাতের আমন ধান চাষ করেছেন। তার ক্ষেতে সবেমাত্র ধানের শীষ বের হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই পোকার আক্রমণ শুরু হয়। পোকার আক্রমণের ফলে ধানের শীষ শুকিয়ে যাচ্ছে এবং গাছগুলো মরে যাচ্ছে।

সাইফুল ইসলাম ‘বাংলা ট্রিবিউন’-কে বলেন, এই পোকা দমন করতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। তিনি বলেন, “গত ১০ বছরের মধ্যে এবারই আমনের আবাদ সবচেয়ে ভালো হয়েছিল। কিন্তু যেই শীষ বের হতে শুরু করলো, অমনি পোকার আক্রমণ। পোকাগুলো কচি শীষ খেয়ে ফেলার কয়েকদিন পরই গাছ মরে যাচ্ছে। আক্রমণ দিন দিন বাড়ছেই। চারবার কীটনাশক দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। পোকা কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছে না। এতে ফলন যে অনেক কমে যাবে তা বোঝাই যাচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ভেবেছিলাম এবার ফলন ভালো হলে সারা বছরের চাল রেখে বাকিটা বিক্রি করে লাভবান হবো। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি, তাতে ধান ঘরে তোলা নিয়েই সংশয়ে আছি।”

শুধু সাইফুল ইসলামই নন, জেলার আরও অনেক কৃষকের জমিতেই পোকা হানা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, বারবার কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো ফল মিলছে না, অথচ কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তার পরামর্শও তারা পাচ্ছেন না।

ওই একই এলাকার আরেক কৃষক আনসার আলী বলেন, “এলাকার বেশিরভাগ আমন ক্ষেতেই পোকা লেগেছে। বারবার ওষুধ ছিটিয়েও কাজ হচ্ছে না। পরামর্শের জন্য কৃষি অফিসের কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

জেলা সদরের কৃষক তালেব উদ্দিন জানান, “একটা ক্ষেতে পোকা লাগার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তা পাশের ক্ষেতেও ছড়িয়ে পড়ছে। কীটনাশক দিয়েও এই পোকা মরছে না। মনে হচ্ছে আমরা এবার বড় ধরনের লোকসানে পড়বো।”

আরেক চাষি মনির হোসেন জানালেন, পোকা দমনের জন্য কৃষকরা নানা কোম্পানির কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “পোকা লাগার কয়েকদিন পরেই ধানগাছ শুকিয়ে খড় হয়ে যাচ্ছে। সেই খড় এমনকি গরুও খাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যদি সঠিক পরামর্শ পেতাম, তাহলে হয়তো কিছুটা রক্ষা হতো। কিন্তু মাঠেই তো তাদের দেখা পাই না।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ময়মনসিংহ জেলায় মোট দুই লাখ ৬৮ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ ৮৬ হাজার ২৬০ মেট্রিক টন।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপপরিচালক মো. এনামুল হক ‘বাংলা ট্রিবিউন’-কে বলেন, “আমন ক্ষেতে পোকা দমনের জন্য কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠেই আছেন এবং কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। যেসব এলাকায় পোকার আক্রমণের কথা শোনা যাচ্ছে, সেখানকার কৃষকরা হয়তো আমাদের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাননি। তারপরও, আমরা অভিযোগ যেহেতু পেয়েছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। পাশাপাশি ওই এলাকাগুলোতে কৃষি অফিস থেকে দ্রুত কর্মকর্তা পাঠিয়ে পোকা দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।”