৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানকে শুরুতে অনেকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও বর্তমানে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অংশীজনদের মধ্যে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মতে, ছাত্রদের সাহস ও আত্মত্যাগ একটি প্রকৃত বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাস্তবিকভাবে এটি ছিল কেবল একটি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার রদবদল। এই পরিবর্তনটি সংঘটিত হয়েছিল বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষা করেই, যেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে পদে রেখেই বিদেশে চিকিৎসাধীন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যদিও পরে জানা যায়, এই পরিবর্তনের পেছনে এক তরুণ সঙ্গীর দীর্ঘমেয়াদী এবং সূক্ষ্ম পরিকল্পনা (মেটিকুলাস ডিজাইন) কাজ করেছে।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার মূলত শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মেটানো এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় দক্ষিণপন্থী শক্তির সমর্থনে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো। বিশ্লেষকরা একে ইউক্রেন বা আরব বসন্তের মতো একটি ‘রঙিন বিপ্লব’ (Colour Revolution) হিসেবেও সন্দেহ করছেন, যার লক্ষ্য হতে পারে এক দক্ষিণপন্থাকে সরিয়ে আরেক দক্ষিণপন্থা বা প্রো-আমেরিকান কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো। বর্তমানে এই সরকারের প্রধান কাজ ছিল প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, বাম ও বুর্জোয়া দলগুলোর চাপ এবং সেনাপ্রধানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে হয়তো নির্ধারিত সময়ের আগেই একটি দায়সারা নির্বাচন দিয়ে সরকারকে বিদায় নিতে হতে পারে। এমনকি সরকারের মূল ‘ডিজাইনার’ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিটিও পদত্যাগ করে স্বীকার করেছেন যে, তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং গণভোট নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন অত্যন্ত তরল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ড. ইউনূস ও আলী রীয়াজের প্রস্তাবিত ‘সংস্কার সনদ’ বা প্যাকেজ ডিল নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে সংবিধানে ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র মতো মূলনীতি বাদ দেওয়া এবং সাম্য ও মানবিক মর্যাদার মতো বিমূর্ত শব্দ যোগ করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপি প্রথমে নির্বাচনের দাবি তুললেও বর্তমানে শর্তসাপেক্ষে গণভোট ও নির্বাচন একসঙ্গে মেনে নিয়েছে, যদিও সংসদ পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। জামায়াত ও এনসিপি এই সংস্কার প্যাকেজের পক্ষে থাকলেও বামপন্থীরা একে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে হতাশা জেগেছে যে, তবে কি এত আত্মত্যাগ বৃথা যাবে? কিন্তু হতাশ না হয়ে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোকে মাঠে নামার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গণতন্ত্র রক্ষা এবং বৈষম্য নিরসনের স্পষ্ট কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে। বিপ্লব ‘বেহাত’ হয়ে গেছে বলে হাল ছেড়ে না দিয়ে বরং আসন্ন নির্বাচনে সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ বিরোধী শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে, যেন ৫ আগস্টের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়।
রিপোর্টারের নাম 

























