কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী রেঞ্জে সরকারি বনভূমি উজাড় এবং পাহাড় কাটার এক মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং একটি ভূমিখেকো সিন্ডিকেটের যোগসাজশে এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
অভিযোগের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, বন রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা বন ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বনভূমি বিক্রি এবং ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। বিগত তিন বছর ধরে এই রেঞ্জে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল-আমিন, বনভূমি ধ্বংস করে আসছে। এই কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও তাদের নীরব ভূমিকা রহস্যজনক বলে মনে করছেন পরিবেশ কর্মীরা।
ইনানী রেঞ্জের মনখালী, রাজাপালং, জালিয়াপালং এবং ছোয়ানখালী বিট এলাকায় ছোট-বড় গাছ কাটা, ঝাউগাছ নিধন, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি, বনভূমি দখল ও বেচাকেনা, অবৈধ করাতকল পরিচালনা, বালু ও মাটি উত্তোলন এবং বনভূমিতে নতুন ঘর নির্মাণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ড একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ইনানী রেঞ্জের একাধিক বিট কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
সরেজমিনে জালিয়াপালং বিট এলাকায় দেখা গেছে, বনাঞ্চল উজাড় করে বিশাল পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। রাজাপালং বিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিছুর রহমান এসব অনিয়ম দেখেও রহস্যজনকভাবে নীরব থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাজাপালং বিটে বড় বড় পাহাড় কেটে দালানঘর নির্মাণ, বন কেটে পানের বরজ ও ব্যক্তিগত বাগান তৈরি করার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। অন্যান্য বিটগুলোর অবস্থাও একই রকম বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত তিন বছরে পাহাড় কাটার সময় অন্তত চারজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বন উজাড়ের কারণে দুটি হাতির মৃত্যু এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে। ইনানী রেঞ্জের বনভূমির আয়তন প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে শেখ জামাল জাতীয় উদ্যানের ২৯৩৩.৬১ হেক্টর আয়তন কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জালিয়াপালং জুম্মাপাড়ার এক বাসিন্দা জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে আঁতাত করে শত শত বছরের পুরোনো পাহাড়গুলো ধ্বংস করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনো পাহাড় অবশিষ্ট নেই। ছোয়ানখালী এলাকার আব্দুল আলম বলেন, রাতের অন্ধকারে গাছ কাটা এবং বালু-মাটি পাচার করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। রাজাপালং তুতরবিলা এলাকার কৃষক আমিন জানান, দুই বছর আগেও এই এলাকায় হাতি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ ছিল, কিন্তু গত তিন বছরে এখানে প্রায় হাজারখানেক ঘর উঠেছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণ বাবদ রেঞ্জারের নাম ব্যবহার করে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল-আমিন বলেন, তিনি সরাসরি এসব বিষয়ে জড়িত নন। তিনি স্বীকার করেন যে কিছু ছোটখাটো অনিয়ম হয়েছে এবং কিছু উন্নয়নমূলক কাজও হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং জালিয়াপালং বিট কর্মকর্তা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে এসব অনিয়ম সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে এসব বিষয়ে অবগত হয়েছেন। তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 





















