ঢাকা ১১:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা, প্রাণ হারালেন র‍্যাব কর্মকর্তা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের ধরতে গিয়ে সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। সন্ত্রাসীদের এই অতর্কিত হামলায় র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আরও এক সদস্য।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে র‍্যাব-৭-এর একটি দল ওই এলাকায় বিশেষ অভিযানে গেলে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত কর্মকর্তার নাম আব্দুল মোতালেব। তিনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েব সুবেদা‌র ছিলেন এবং বর্তমানে প্রেষণে র‍্যাবে কর্মরত ছিলেন। বিজিবিতে নায়েব সুবেদার পদটি মূলত প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে, যা মাঠপর্যায়ের আভিযানিক কার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

র‍্যাব সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে থাকা সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসীরা আকস্মিক হামলা চালালে ঘটনাস্থলেই আব্দুল মোতালেব গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে তার মৃত্যু হয়। হামলায় আহত র‍্যাবের অপর এক সদস্যকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

র‍্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সন্ত্রাসীরা র‍্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এক পর্যায়ে র‍্যাবের তিন সদস্যকে আটকে রাখার খবর পাওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং তাদের উদ্ধারে সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পুরো এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বর্তমানে ওই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘ চার দশক ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমি দখল করে এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অবৈধ বসতি। দুর্গম পাহাড় ও বনবেষ্টিত এই এলাকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভূমিদস্যু, পাহাড়খেকো ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সেখানে নিজেদের শক্তিশালী ঘাঁটি গেড়েছে। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত রেখে এলাকাটি কার্যত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র মতে, এই বিশাল খাস জমির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকাটিতে প্রায়ই আধিপত্য বিস্তার, খুনোখুনি ও সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দখলদারদের মধ্যে বিরোধ আরও চরম আকার ধারণ করে। সম্প্রতি সেখানে গোলাগুলিতে নিহতের ঘটনা এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

এর আগেও বিভিন্ন সময় জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান বা অপরাধী ধরতে গিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা হামলার মুখে পড়েছেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এক অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। ২০২২ সালেও র‍্যাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছিল। আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনা জঙ্গল সলিমপুরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অস্থিরতা ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জে এজলাসে বিচারকের ছোড়া পেপারওয়েটের আঘাতে শিক্ষানবিশ আইনজীবী আহত

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা, প্রাণ হারালেন র‍্যাব কর্মকর্তা

আপডেট সময় : ১১:০১:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের ধরতে গিয়ে সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। সন্ত্রাসীদের এই অতর্কিত হামলায় র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আরও এক সদস্য।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে র‍্যাব-৭-এর একটি দল ওই এলাকায় বিশেষ অভিযানে গেলে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত কর্মকর্তার নাম আব্দুল মোতালেব। তিনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েব সুবেদা‌র ছিলেন এবং বর্তমানে প্রেষণে র‍্যাবে কর্মরত ছিলেন। বিজিবিতে নায়েব সুবেদার পদটি মূলত প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে, যা মাঠপর্যায়ের আভিযানিক কার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

র‍্যাব সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে থাকা সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসীরা আকস্মিক হামলা চালালে ঘটনাস্থলেই আব্দুল মোতালেব গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে তার মৃত্যু হয়। হামলায় আহত র‍্যাবের অপর এক সদস্যকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

র‍্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সন্ত্রাসীরা র‍্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এক পর্যায়ে র‍্যাবের তিন সদস্যকে আটকে রাখার খবর পাওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং তাদের উদ্ধারে সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পুরো এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বর্তমানে ওই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘ চার দশক ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমি দখল করে এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অবৈধ বসতি। দুর্গম পাহাড় ও বনবেষ্টিত এই এলাকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভূমিদস্যু, পাহাড়খেকো ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সেখানে নিজেদের শক্তিশালী ঘাঁটি গেড়েছে। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত রেখে এলাকাটি কার্যত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র মতে, এই বিশাল খাস জমির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকাটিতে প্রায়ই আধিপত্য বিস্তার, খুনোখুনি ও সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দখলদারদের মধ্যে বিরোধ আরও চরম আকার ধারণ করে। সম্প্রতি সেখানে গোলাগুলিতে নিহতের ঘটনা এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

এর আগেও বিভিন্ন সময় জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান বা অপরাধী ধরতে গিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা হামলার মুখে পড়েছেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এক অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। ২০২২ সালেও র‍্যাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছিল। আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনা জঙ্গল সলিমপুরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অস্থিরতা ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।