জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সংসদ ভেঙে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। সোমবার তার এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দেশটিতে একটি আগাম নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হতে যাচ্ছে। মূলত নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতিগত কর্মসূচিগুলো দ্রুত ও নির্বিঘ্নে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনমতের ওপর ভরসা করেই তিনি এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দলটির নেতৃত্বে ঘনঘন পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে সংসদের নিম্নকক্ষে এলডিপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তা অত্যন্ত সামান্য। ফলে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এবং সক্রিয় রাজস্ব ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পাসে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে সরকারকে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বড় জয় তাকাইচির অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদাফুমি কাওয়াতো এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানান, যদি এলডিপি এককভাবে নিম্নকক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, তবে প্রধানমন্ত্রীকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা বা কোনো বিষয়ে ছাড় না দিয়েই নিজের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করার সুযোগ দেবে। ইতোমধ্যে তাকাইচি সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ১২২.৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের একটি বিশাল বাজেট অনুমোদন করেছে। মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা এবং স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এই বাজেটের দ্রুত সংসদীয় অনুমোদন প্রয়োজন।
তবে সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দলগুলো। প্রধান বিরোধী দল সিডিপির নেতা জুন আজুমি অভিযোগ করেছেন, সংসদ ভেঙে দেওয়ার ফলে বাজেট পাসে অযথা বিলম্ব হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে খাদ্যপণ্যের ওপর কর কমানোর মতো জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ক্ষমতাসীন দল।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অচলাবস্থা নিরসনে আগাম নির্বাচন তাকাইচিকে বাড়তি শক্তি জোগাবে। দেশের ভেতরে শক্তিশালী জনসমর্থন থাকলে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে জাপানের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, চীনের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বা অন্য কোনো উপায়ে জাপানি ভোটারদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির চেষ্টা থাকতে পারে। সম্প্রতি চীন জাপানে সামরিক খাতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল ধাতুর রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিক বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিজনিত অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তাকাইচির পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবার আমলে এলডিপি ও তার জোটসঙ্গী কোমেইতো গত নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মরিয়া এলডিপি। অন্যদিকে, কোমেইতো ও প্রধান বিরোধী দল সিডিপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব মিলিয়ে জাপানের আসন্ন এই নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 






















