ভারতের রাজনীতিতে এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলা। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এর তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ইডির দাবি, গত ৮ই জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেসের এক পরামর্শদাতা সংস্থার মালিকের বাড়ি ও দপ্তরে তল্লাশি চালানোর সময় মুখ্যমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হয়ে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে যান। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও গণমাধ্যমের সামনে এই তথ্য স্বীকার করেছেন।
ইডি কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা, যা মূলত অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করে এবং প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা রাখে। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি, তবে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগটি সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। এই ঘটনা ভারতে মুখ্যমন্ত্রীদের কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার নজিরকে আবার সামনে এনেছে। অতীতেও বিভিন্ন রাজ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মুখ্যমন্ত্রীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, পদত্যাগ করেছেন, অথবা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কারাবাস করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার ও কারাবাসের নজির:
অরবিন্দ কেজরিওয়াল (দিল্লি): দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের হাতে গ্রেপ্তার হন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনিই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি পদে থাকাকালীন গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। মদের লাইসেন্স নীতি বদল করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে এই গ্রেপ্তার হয়। তিহার জেলে থেকেই তিনি কিছুদিন সরকার পরিচালনা করেন, যদিও পরে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়।
লালু প্রসাদ যাদব (বিহার): বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব ‘চারা কেলেঙ্কারি’ বা গবাদিপশুর খাদ্য কেনার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ তছরুপের অভিযোগে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তাঁর স্ত্রী রাবড়ি দেবীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। सीबीआई এই মামলার তদন্ত করেছিল। এছাড়াও, রেলমন্ত্রী থাকাকালীন চাকরি দুর্নীতির আরেকটি মামলায়ও তিনি অভিযুক্ত।
ঝাড়খণ্ডের তিন মুখ্যমন্ত্রী:
হেমন্ত সরেন: সম্প্রতি জমি বিক্রি ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলায় ইডির হাতে গ্রেপ্তার হন হেমন্ত সরেন। গ্রেপ্তারের ঠিক আগে তিনি পদত্যাগ করেন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন চম্পাই সরেন। বর্তমানে তিনি জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।
শিবু সরেন: হেমন্ত সরেনের বাবা এবং ঝাড়খণ্ডের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শিবু সরেন একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তিনি যখন মনমোহন সিং সরকারের কয়লা মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে। যদিও পরে আদালত তাঁকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়।
মধু কোড়া: ঝাড়খণ্ডের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মধু কোড়া অর্থ পাচার ও আয় বহির্ভূত সম্পত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘুষ নিয়ে কয়লাখনি বরাদ্দের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হয় এবং দীর্ঘ সময় বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন।
জে. জয়ললিতা (তামিলনাড়ু): তামিলনাড়ুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জে. জয়ললিতা আয় বহির্ভূত সম্পত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং চার বছরের কারাদণ্ড পান। এই ঘটনা ছিল ভারতে প্রথম, যখন একজন মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় কারাবরণ করেন। রায় ঘোষণার পরপরই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ হারান।
চন্দ্রবাবু নাইডু (অন্ধ্র প্রদেশ): অন্ধ্র প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু ২০২৩ সালে একটি দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন। যদিও তিনি তখন মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন না। রাজ্যের সিআইডি এই গ্রেপ্তার করে।
ওম প্রকাশ चौटाला (হরিয়ানা): হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওম প্রকাশ चौटाला শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ২০১৩ সালে তাঁর এবং তাঁর ছেলের সাজা বহাল রাখে আদালত। ২০২২ সালে তিনি আয় বহির্ভূত সম্পত্তির মামলায় আবারও দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পান।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তবে, প্রায়শই অভিযোগ ওঠে যে, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার অপরাধ সাব্যস্ত করার হার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবুও, মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার ও কারাবাসের ঘটনাগুলো ভারতের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছে।
রিপোর্টারের নাম 






















