ঢাকা ০১:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

চিলিতে ভয়াবহ দাবানল: নিহত ১৯, ৫০ হাজার মানুষ গৃহহীন; জরুরি অবস্থা জারি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

চিলির দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৯ জনে। এতে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রবল বাতাস ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে নুবল ও বিয়োবিও প্রদেশের বিস্তৃত এলাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানী সান্তিয়াগো থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই দুই প্রদেশে এরই মধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

গত দুই দিন ধরে জ্বলতে থাকা এই দাবানলে অসংখ্য ঘরবাড়ি, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভস্মীভূত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, চারদিকে শুধু পোড়া বাড়িঘর আর ধ্বংসস্তূপের নিস্তব্ধতা।

পেনকো শহরের এক বাসিন্দা, ২৫ বছর বয়সী মাতিয়াস সিদ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, “ভোর আড়াইটার দিকে আগুন সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের মতো আগুনের ঢেউ নিচের দিকের বাড়িঘর গ্রাস করছিল। আমরা কেবল পরনের কাপড় নিয়ে পালাতে পেরেছি। আর ২০ মিনিট দেরি হলে হয়তো আমরাও পুড়ে মারা যেতাম।”

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই পেনকো শহরের বাসিন্দা। পাশের ছোট বন্দর শহর লিরকেনেও পরিস্থিতি ছিল সমান ভয়াবহ। প্রায় ২০ হাজার জনসংখ্যার এই শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, “কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই” আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

লিরকেনের ৫৭ বছর বয়সী আলেহান্দ্রো আরেদোন্দোর ভাষ্য, “অনেকে সমুদ্রতীরে ছুটে গিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছেন। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।” রবিবার রাতে শহরের রাস্তায় সেনাবাহিনী টহল দিতে দেখা যায়। কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও কিছু বাসিন্দা টর্চলাইট হাতে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিচ্ছিলেন।

চিলির প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বোরিচ নুবলে ও বিয়োবিও প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। প্রায় চার হাজার দমকলকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। জরুরি অবস্থা জারির ফলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট বোরিচ ক্ষতিগ্রস্ত কনসেপসিওন শহর পরিদর্শন করে আগুন নেভানোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাতের কারফিউ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন।” সান্তিয়াগোতে ফিরে তিনি জানান, দাবানল পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য বিনিময়ের জন্য সোমবার তিনি প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হোসে আন্তোনিও কাস্তের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বোরিচের মন্তব্য, “এই কঠিন সময়ে চিলি ঐক্যবদ্ধ।”

জাতীয় দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া সংস্থার পরিচালক আলিসিয়া সেব্রিয়ান জানিয়েছেন, বিয়োবিও প্রদেশের পেনকো ও লিরকেন শহর থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই দুই শহরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসও দমকলকর্মীদের জন্য কোনো সুখবর দিচ্ছে না। বিয়োবিও অঞ্চলের বন সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান এস্তেবান ক্রাউসে উল্লেখ করেছেন, রবিবার উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তিশালী বাতাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ-মধ্য চিলিতে দাবানলের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চরম আবহাওয়া, খরা এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দেশটিকে ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সান্তিয়াগোর উত্তর-পশ্চিমে ভিনিয়া দেল মার শহরের কাছে সৃষ্ট একাধিক দাবানলে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় ১৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা এরদোয়ানের

চিলিতে ভয়াবহ দাবানল: নিহত ১৯, ৫০ হাজার মানুষ গৃহহীন; জরুরি অবস্থা জারি

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

চিলির দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৯ জনে। এতে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রবল বাতাস ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে নুবল ও বিয়োবিও প্রদেশের বিস্তৃত এলাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানী সান্তিয়াগো থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই দুই প্রদেশে এরই মধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

গত দুই দিন ধরে জ্বলতে থাকা এই দাবানলে অসংখ্য ঘরবাড়ি, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভস্মীভূত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, চারদিকে শুধু পোড়া বাড়িঘর আর ধ্বংসস্তূপের নিস্তব্ধতা।

পেনকো শহরের এক বাসিন্দা, ২৫ বছর বয়সী মাতিয়াস সিদ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, “ভোর আড়াইটার দিকে আগুন সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের মতো আগুনের ঢেউ নিচের দিকের বাড়িঘর গ্রাস করছিল। আমরা কেবল পরনের কাপড় নিয়ে পালাতে পেরেছি। আর ২০ মিনিট দেরি হলে হয়তো আমরাও পুড়ে মারা যেতাম।”

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই পেনকো শহরের বাসিন্দা। পাশের ছোট বন্দর শহর লিরকেনেও পরিস্থিতি ছিল সমান ভয়াবহ। প্রায় ২০ হাজার জনসংখ্যার এই শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, “কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই” আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

লিরকেনের ৫৭ বছর বয়সী আলেহান্দ্রো আরেদোন্দোর ভাষ্য, “অনেকে সমুদ্রতীরে ছুটে গিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছেন। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।” রবিবার রাতে শহরের রাস্তায় সেনাবাহিনী টহল দিতে দেখা যায়। কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও কিছু বাসিন্দা টর্চলাইট হাতে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিচ্ছিলেন।

চিলির প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বোরিচ নুবলে ও বিয়োবিও প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। প্রায় চার হাজার দমকলকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। জরুরি অবস্থা জারির ফলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট বোরিচ ক্ষতিগ্রস্ত কনসেপসিওন শহর পরিদর্শন করে আগুন নেভানোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাতের কারফিউ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন।” সান্তিয়াগোতে ফিরে তিনি জানান, দাবানল পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য বিনিময়ের জন্য সোমবার তিনি প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হোসে আন্তোনিও কাস্তের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বোরিচের মন্তব্য, “এই কঠিন সময়ে চিলি ঐক্যবদ্ধ।”

জাতীয় দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া সংস্থার পরিচালক আলিসিয়া সেব্রিয়ান জানিয়েছেন, বিয়োবিও প্রদেশের পেনকো ও লিরকেন শহর থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই দুই শহরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসও দমকলকর্মীদের জন্য কোনো সুখবর দিচ্ছে না। বিয়োবিও অঞ্চলের বন সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান এস্তেবান ক্রাউসে উল্লেখ করেছেন, রবিবার উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তিশালী বাতাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ-মধ্য চিলিতে দাবানলের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চরম আবহাওয়া, খরা এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দেশটিকে ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সান্তিয়াগোর উত্তর-পশ্চিমে ভিনিয়া দেল মার শহরের কাছে সৃষ্ট একাধিক দাবানলে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় ১৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।