খাগড়াছড়ির রামগড় স্থলবন্দর সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি জোরদার এবং পাহাড় কাটার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন নৌপরিবহন ও শ্রম এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন।
বুধবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বৈঠকে তিনি এই নির্দেশ প্রদান করেন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভারতের জন্য বন্দর নির্মাণে পাহাড় কেটে জমি ভরাট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে উপদেষ্টা এই নির্দেশনা দেন।
খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় স্থলবন্দরের জমি ভরাটের কাজে পরিবেশ ধ্বংস করে নির্বিচারে পাহাড় কাটার অভিযোগ সংক্রান্ত একটি সংবাদ গত জানুয়ারি মাসে জনসমক্ষে আসে। সংবাদটি দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর উপদেষ্টা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন।
সংবাদে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, পরিবেশগত ও কারিগরি দিকসমূহ মূল্যায়ন এবং কোনো অনিয়ম বা অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টার নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা, স্থানীয় জনগণের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, প্রকৌশলগত মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, রামগড় স্থলবন্দরের সাইট ডেভেলপমেন্ট ও বালু ভরাটের কাজ জানুয়ারি মাসে শুরু হয়ে এপ্রিল মাসে সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী মোট ১,৮৯,২৩২.২৮১ ঘনমিটার বালু ভরাটের বিপরীতে ১,৮৭,৫০৯.২৪৪ ঘনমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ২০.১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকল্পের অবশিষ্ট বিল প্রায় ৪৮ লাখ টাকা, যা তত্ত্বাবধায়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার সময়কাল বিবেচনায়, প্রকাশিত সংবাদে উল্লিখিত ২০২৬ সালের জানুয়ারির তথ্য স্থলবন্দরের জমি ভরাট কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত নয় বলে কমিটি মতামত প্রদান করেছে।
কারিগরি যাচাইয়ের অংশ হিসেবে তদন্ত কমিটি বালুর গুণগত মান পরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করে। চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহৃত বালুর এফএম ০.৮০ হওয়ার কথা থাকলেও, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষিত বালুর এফএম পাওয়া যায় ১.৬২ এবং সরেজমিন প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনে তা ১.৮৪ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে কমিটি ভবিষ্যতে আরও নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞ মতামতের জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা সমমানের স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে পুনরায় নমুনা পরীক্ষার সুপারিশ করেছে।
অবকাঠামোগত পরিদর্শনে দেখা যায়, স্থলবন্দরের পূর্ত কাজের কিয়দাংশে প্লাস্টারে কিউরিং ঘাটতিজনিত কারণে ত্রুটি বিদ্যমান থাকলেও কোথাও বড় ধরনের বসে যাওয়া বা কাঠামোগত ত্রুটি পাওয়া যায়নি। কমিটির মতে এসব ত্রুটি সামান্য মেরামতের মাধ্যমে সহজেই সংশোধনযোগ্য।
পরিবেশগত দিক বিবেচনায় তদন্ত কমিটি উল্লেখ করে যে, রামগড় এলাকায় অতীতে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ পাহাড় কাটার অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে কমিটি নিশ্চিত হয় যে, সাম্প্রতিক সময়ে যে পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে, তা স্থলবন্দরের প্রকল্প কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা পুনরায় দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, পরিবেশ ধ্বংস, অবৈধ পাহাড় কাটা কিংবা সরকারি প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম সরকার কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণে নিয়মিত নজরদারি জোরদার, অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রামগড় স্থলবন্দরের অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























