ঢাকা ০৪:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

সুনামগঞ্জে নির্বাচনি উত্তাপের আড়ালে ম্লান গণভোট: প্রার্থীদের নীরবতায় জনমনে বিভ্রান্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৩০:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামায় মুখরিত হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত ‘গণভোট’ নিয়ে অধিকাংশ প্রার্থীর মধ্যেই দেখা গেছে রহস্যজনক নীরবতা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি।

সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসন ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীরা উঠান বৈঠক, পথসভা এবং গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোটারদের মন জয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণী ‘গণভোট’ নিয়ে তাদের বক্তব্যে কোনো দিকনির্দেশনা মিলছে না। গণভোটের উদ্দেশ্য, এর গুরুত্ব কিংবা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের তাৎপর্য কী—সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো অন্ধকারে। অনেক ভোটারই জানেন না, ব্যালট পেপারে এই বাড়তি ভোটটি কেন এবং কীভাবে দিতে হবে।

তবে এই নীরবতার ভিড়ে ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জেলার কয়েকটি আসনে দলটির প্রার্থীদের তাদের নিজস্ব প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরতে দেখা গেছে। তারা রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠন করছেন।

সুনামগঞ্জ-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আনিসুল হক জানান, হাওরাঞ্চলে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি তিনি গণভোটের পক্ষেও প্রচার জোরদার করবেন বলে জানান। সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তারা নীতিগতভাবে গণভোটের পক্ষে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোট জরুরি। তবে প্রচারণার শুরুতে এটি নিয়ে সরব না হলেও ২০ তারিখের পর থেকে তারা এই বিষয়ে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করবেন।

এদিকে সুনামগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির মনে করেন, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোটের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে পরিবর্তনের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাবে। আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ গড়তে দাঁড়িপাল্লার পাশাপাশি গণভোটের পক্ষেও ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছি।” একই ধরণের মন্তব্য করেছেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী ইয়াসীন খাঁন এবং সুনামগঞ্জ-৪ আসনের অ্যাডভোকেট শামস উদ্দিন।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন এবং এবি পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলমও গণভোটের পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের সফলতা ধরে রাখতে হলে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত করা অপরিহার্য। তবে তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সরকারিভাবে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার অভাব রয়েছে।

সচেতন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মতে, গণভোটের বিষয়টি কেবল প্রার্থীদের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, “ফ্যাসিবাদ নির্মূল ও নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কোনো বিকল্প নেই।” সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সাধারণ ভোটাররা এখনো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে স্পষ্ট নন। তাই দ্রুত গণসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিজাম উদ্দিনের মতে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ভোটারদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্ব। গণভোটের গুরুত্ব এবং নাগরিকের একটি ভোট কীভাবে জাতীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে, তা সহজ ভাষায় প্রচার করা জরুরি। অন্যথায় গণভোটের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আলোচিত ছাত্রনেতা রিয়াদ হত্যাচেষ্টা মামলায় রিমান্ডে, জামিন পেলেন ৩ সহ-অভিযুক্ত

সুনামগঞ্জে নির্বাচনি উত্তাপের আড়ালে ম্লান গণভোট: প্রার্থীদের নীরবতায় জনমনে বিভ্রান্তি

আপডেট সময় : ০৩:৩০:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামায় মুখরিত হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত ‘গণভোট’ নিয়ে অধিকাংশ প্রার্থীর মধ্যেই দেখা গেছে রহস্যজনক নীরবতা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি।

সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসন ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীরা উঠান বৈঠক, পথসভা এবং গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোটারদের মন জয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণী ‘গণভোট’ নিয়ে তাদের বক্তব্যে কোনো দিকনির্দেশনা মিলছে না। গণভোটের উদ্দেশ্য, এর গুরুত্ব কিংবা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের তাৎপর্য কী—সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো অন্ধকারে। অনেক ভোটারই জানেন না, ব্যালট পেপারে এই বাড়তি ভোটটি কেন এবং কীভাবে দিতে হবে।

তবে এই নীরবতার ভিড়ে ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জেলার কয়েকটি আসনে দলটির প্রার্থীদের তাদের নিজস্ব প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরতে দেখা গেছে। তারা রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠন করছেন।

সুনামগঞ্জ-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আনিসুল হক জানান, হাওরাঞ্চলে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি তিনি গণভোটের পক্ষেও প্রচার জোরদার করবেন বলে জানান। সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তারা নীতিগতভাবে গণভোটের পক্ষে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোট জরুরি। তবে প্রচারণার শুরুতে এটি নিয়ে সরব না হলেও ২০ তারিখের পর থেকে তারা এই বিষয়ে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করবেন।

এদিকে সুনামগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির মনে করেন, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোটের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে পরিবর্তনের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাবে। আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ গড়তে দাঁড়িপাল্লার পাশাপাশি গণভোটের পক্ষেও ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছি।” একই ধরণের মন্তব্য করেছেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী ইয়াসীন খাঁন এবং সুনামগঞ্জ-৪ আসনের অ্যাডভোকেট শামস উদ্দিন।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন এবং এবি পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলমও গণভোটের পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের সফলতা ধরে রাখতে হলে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত করা অপরিহার্য। তবে তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সরকারিভাবে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার অভাব রয়েছে।

সচেতন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মতে, গণভোটের বিষয়টি কেবল প্রার্থীদের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, “ফ্যাসিবাদ নির্মূল ও নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কোনো বিকল্প নেই।” সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সাধারণ ভোটাররা এখনো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে স্পষ্ট নন। তাই দ্রুত গণসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিজাম উদ্দিনের মতে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ভোটারদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্ব। গণভোটের গুরুত্ব এবং নাগরিকের একটি ভোট কীভাবে জাতীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে, তা সহজ ভাষায় প্রচার করা জরুরি। অন্যথায় গণভোটের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।