দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যমান অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার জন্য ভারতের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করেছে পাকিস্তান। দিল্লির আধিপত্যবাদী আচরণের কারণেই এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের বর্তমান আচরণকে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সম্প্রতি পাকিস্তান সফরে যাওয়া বাংলাদেশ মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই সিনিয়র কূটনীতিক বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং সার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে খোলামেলা আলোচনা করেন।
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ভারতের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বহীন ও উস্কানিমূলক বক্তব্য এই অঞ্চলকে ক্রমাগত অশান্ত করে তুলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের ভাষা কোনোভাবেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয় না, বরং তা প্রতিবেশীদের জন্য সরাসরি হুমকির শামিল। তথাকথিত ‘অপারেশন সিন্দুর’ এর ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের আসল রূপ এখন বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সাবেক এই হাইকমিশনার বলেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দুই দেশের মধ্যে একটি স্বাভাবিক ও টেকসই সম্পর্ক নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কর্তৃক ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি ও চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। এমনকি ঐতিহাসিক অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়েও আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায় ইসলামাবাদ।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতাকে ভারতের পক্ষ থেকে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে দেখার কঠোর সমালোচনা করেন ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দুই দেশ তাদের পারস্পরিক স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখবে, এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ অনভিপ্রেত। ভারতের এমন নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। সামরিক সহযোগিতার প্রশ্নে তিনি জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো নিরাপত্তা বিরোধ নেই এবং ঢাকা চাইলে প্রশিক্ষণসহ যেকোনো সামরিক সহযোগিতায় ইসলামাবাদ প্রস্তুত।
আঞ্চলিক ফোরাম সার্ক সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতের অনড় অবস্থানের কারণে সার্ক আজ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অথচ এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সার্ককে সক্রিয় করা জরুরি। এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পাকিস্তান সবসময় বাংলাদেশের পাশে আছে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে এই ইস্যুতে সব ধরনের সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলে তিনি পুনরায় নিশ্চিত করেন। আফগানিস্তান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো দেশের উস্কানিতে আফগান মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হলে তা সহ্য করা হবে না।
একই ডেলিগেশনের সঙ্গে পৃথক আলোচনায় পাকিস্তানের থিংকট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজ’ (আইআরএস) এর প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রদূত জওহর সেলিম বলেন, ভারতের হস্তক্ষেপমূলক নীতির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকছে। তিনি মনে করেন, ভারত ছাড়া সার্ক সফল হওয়া কঠিন, তাই ভারতের উচিত নিজের জনগণের স্বার্থেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সালমা মালিক দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন। এমনকি ১৯৭১ সালের মতো সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক ইস্যুগুলো নিয়েও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি আরও মজবুত করা সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
রিপোর্টারের নাম 

























