ঢাকা ০১:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে নয়

কোনও ব্যক্তি বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না, এমন বিধান বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। 

এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দিয়েছেন বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি এ রায় প্রকাশিত হয়েছে। 

এর আগে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়। 

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহু বিবাহ সংক্রান্ত ৬ ধারায় বলা হয়েছে—(১) “কোনও ব্যক্তির বিবাহ বলবত থাকিতে সে সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিবে না বা ঐরূপ অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনও বিবাহ ১৯৭৪ সনের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেকরণ) আইনের অধীনে রেজিস্ট্রিকৃত হইবে না।” (২) “১নং উপধারা অনুযায়ী অনুমতির ও দরখাস্ত নির্ধারিত ফি-সহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দফতরে দাখিল করিতে হইবে ও উহাতে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণসমূহ এবং এই বিবাহের ব্যাপারে বর্তমানে স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি লওয়া হইয়াছে কিনা উহার উল্লেখ থাকিবে।” (৩) “২নং উপধারা অনুযায়ী দরখাস্ত গ্রহণ করিবার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের প্রত্যককে একজন করিয়া প্রতিনিধি মনোনীত করিতে বলিবেন। উক্তরূপে গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিবাহ প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত বলিয়া মনে করিলে যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হইতে পারে এমন সকল শর্ত থাকিলে তৎসাপেক্ষে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করিতে পারেন।” (৪) “দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করিবার নিমিত্ত সালিশি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করিবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেকোনও পক্ষ নির্দিষ্ট ফি প্রদানক্রমে নির্দিষ্ট দফতরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের নিকট পুনর্বিবেচনার নিমিত্ত দরখাস্ত দাখিল করিতে পারে; তাহার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে ও কোনও আদালতে এই সম্বন্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।” (৫) “কোনও ব্যক্তি যদি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত অন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় তবে সে—(ক) বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করিতে হইবে। উক্ত টাকা উক্তরূপে পরিশোধ না করা হইলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হইবে; এবং (খ) অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।”  

এ বিষয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছিলেন, “এখানে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে ইসলামিক আইন দেখিয়ে বলা হচ্ছে চার জন রাখতে পারবে, সেখানে ইসলামে বলা হয়েছে, সবার প্রতি সমানভাবে সুবিচার করতে হবে। এখানে শুধু পিক অ্যান্ড চুজ করা যাবে না। শুধু বিয়ে করতে পারবে— ওই অংশটুকু নিলে হবে না। সবার প্রতি কীভাবে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে ওইটার প্রভিশন রাখতে হবে। টাকা দিচ্ছে কিনা। আদৌ তার বিয়ে করার আর্থিক সঙ্গতি আছে কিনা, এগুলো দেখার সুযোগ চেয়ারম্যানের নাই।”   

তিনি আরও বলেন, “মালয়েশিয়ায় কোর্টের মাধ্যমে হয়, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নয়। কোর্ট সমন দেন, সাক্ষীদের ডাকেন। বিয়ের যে কারণটা উল্লেখ করেন, সেটা সত্য কিনা যাচাই করেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের যাচাই করার সুযোগ নেই। এছাড়া চেয়ারম্যান যদি বিয়ে করতে চান তাহলে তো তিনি নিজেকে নিজে পারমিশন দিতে হবে।”  

পরে হাইকোর্ট ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি রুল জারি করেন। রুলে পারিবারিক জীবন রক্ষার বৃহৎস্বার্থে বহুবিবাহ আইনের বিষয়ে নীতিমালা কেন করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে স্ত্রীদের মধ্যে সম-অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া আইন অনুসারে বহু বিবাহের অনুমতির প্রক্রিয়া কেন অবৈধ হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। 

ওই রুলের শুনানি শেষে ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বহাল থাকলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তবে তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা বলেছেন। 

ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রায়ের মূল সারাংশে আদালত বলেন, “পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পিটিশনার একজন আইনজীবী, তিনি নারীদের সম্মান এবং পারিবারিক বৃহত্তর সুরক্ষার জন্য বহুবিবাহের বর্তমান আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যা নিঃসন্দেহে নারীদের অধিকার এবং জনস্বার্থে করা হয়েছে। তাই এই রিট পিটিশনকে জনস্বার্থে করা রিট পিটিশন হিসেবে গণ্য করা হলো।”  

আদালতের বরাতে তিনি আরও জানান, যেহেতু আরবিট্রেশন কাউন্সিলের বহুবিবাহের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে স্ত্রী/স্ত্রীদের থেকে শোনার ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া আরবিট্রেশন কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিভিশন করার সুযোগ বন্ধ রয়েছে। একজন সিভিল জজ সেই রিভিশন শুনানি শুনবেন, যা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। এছাড়া সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করারও সুযোগ রয়েছে। 

এছাড়াও আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে স্ত্রীর দেনমোহর পাওয়া সুনিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ বছর পর্যন্ত সাজা ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান হয়েছে। যা সমাজে সচেতনতা তৈরি করবে। যদিও আইনে বলা হয়নি যে কমপ্লেইন করবে তবু ৫০ ডিএলআর অনুযায়ী আগের স্ত্রী হবেন অভিযোগকারী। 

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় বহুবিবাহের জন্য স্ত্রীর ৭ বছরের সাজার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সাজার অসমতা থাকলেও ইসলামী আইন অনুযায়ী পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। তাই নারীর বহুবিবাহের সাজা এবং পুরুষের বহুবিবাহের সাজা এক না হলেও তা বৈষম্যমূলক নয়। 

রায়ে আদালত সুরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন। এছাড়া রায়ে বুখারী শরীফের [২৪৯৪, ৪৫৭৪, ৫০৯২, মুসলিম ৩০১৮]-এর রেফারেন্স উল্লেখ করেন। 

রায়ে আদালত বলেন, শাফী-হানাফী মাজহাবে স্কলাররা উল্লেখ করেন, যদি একজন পুরুষের অর্থনৈতিক ও অন‍্যান‍্য যোগ‍্যতা না থাকে এবং সব স্ত্রীদের সমান মর্যাদা দিতে না পারে তাহলে সে পুরুষ শুধু একটি বিয়েই করবে। 

তিউনিশিয়া ১৯৫৭ সালে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করেছে। ১৯২৬ সালে তুর্কি মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করেছে। হাইকোর্ট ইতোপূর্বে সরকারকে বহুবিবাহের আইন পরিবর্তন করে অথবা বর্তমান আইনকে বাদ দিয়ে বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। 

আরবিট্রেশন কাউন্সিল চাইলে বহুবিবাহের অনুমতি নাকচ করতে পারে, তাই এটি বৈষম্যমূলক নয় এবং সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। এমতাবস্থায় আইনটি সংবিধান পরিপন্থি নয়। 

তাই বহু বিবাহের বিষয়ক বর্তমান আইনটি সংবিধানের পরিপন্থি নয় মর্মে রায়ে ঘোষণা করা হয় এবং এ সংক্রান্ত রুলটি খারিজ করা হয়। 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাখাইনে ত্রিমুখী ভয়াবহ সংঘর্ষ: টেকনাফে শিশু গুলিবিদ্ধ, ৫৩ সশস্ত্র সদস্য আটক

সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে নয়

আপডেট সময় : ০৮:২৫:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

কোনও ব্যক্তি বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না, এমন বিধান বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। 

এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দিয়েছেন বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি এ রায় প্রকাশিত হয়েছে। 

এর আগে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়। 

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহু বিবাহ সংক্রান্ত ৬ ধারায় বলা হয়েছে—(১) “কোনও ব্যক্তির বিবাহ বলবত থাকিতে সে সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিবে না বা ঐরূপ অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনও বিবাহ ১৯৭৪ সনের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেকরণ) আইনের অধীনে রেজিস্ট্রিকৃত হইবে না।” (২) “১নং উপধারা অনুযায়ী অনুমতির ও দরখাস্ত নির্ধারিত ফি-সহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দফতরে দাখিল করিতে হইবে ও উহাতে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণসমূহ এবং এই বিবাহের ব্যাপারে বর্তমানে স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি লওয়া হইয়াছে কিনা উহার উল্লেখ থাকিবে।” (৩) “২নং উপধারা অনুযায়ী দরখাস্ত গ্রহণ করিবার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের প্রত্যককে একজন করিয়া প্রতিনিধি মনোনীত করিতে বলিবেন। উক্তরূপে গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিবাহ প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত বলিয়া মনে করিলে যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হইতে পারে এমন সকল শর্ত থাকিলে তৎসাপেক্ষে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করিতে পারেন।” (৪) “দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করিবার নিমিত্ত সালিশি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করিবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেকোনও পক্ষ নির্দিষ্ট ফি প্রদানক্রমে নির্দিষ্ট দফতরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের নিকট পুনর্বিবেচনার নিমিত্ত দরখাস্ত দাখিল করিতে পারে; তাহার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে ও কোনও আদালতে এই সম্বন্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।” (৫) “কোনও ব্যক্তি যদি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত অন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় তবে সে—(ক) বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করিতে হইবে। উক্ত টাকা উক্তরূপে পরিশোধ না করা হইলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হইবে; এবং (খ) অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।”  

এ বিষয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছিলেন, “এখানে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে ইসলামিক আইন দেখিয়ে বলা হচ্ছে চার জন রাখতে পারবে, সেখানে ইসলামে বলা হয়েছে, সবার প্রতি সমানভাবে সুবিচার করতে হবে। এখানে শুধু পিক অ্যান্ড চুজ করা যাবে না। শুধু বিয়ে করতে পারবে— ওই অংশটুকু নিলে হবে না। সবার প্রতি কীভাবে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে ওইটার প্রভিশন রাখতে হবে। টাকা দিচ্ছে কিনা। আদৌ তার বিয়ে করার আর্থিক সঙ্গতি আছে কিনা, এগুলো দেখার সুযোগ চেয়ারম্যানের নাই।”   

তিনি আরও বলেন, “মালয়েশিয়ায় কোর্টের মাধ্যমে হয়, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নয়। কোর্ট সমন দেন, সাক্ষীদের ডাকেন। বিয়ের যে কারণটা উল্লেখ করেন, সেটা সত্য কিনা যাচাই করেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের যাচাই করার সুযোগ নেই। এছাড়া চেয়ারম্যান যদি বিয়ে করতে চান তাহলে তো তিনি নিজেকে নিজে পারমিশন দিতে হবে।”  

পরে হাইকোর্ট ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি রুল জারি করেন। রুলে পারিবারিক জীবন রক্ষার বৃহৎস্বার্থে বহুবিবাহ আইনের বিষয়ে নীতিমালা কেন করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে স্ত্রীদের মধ্যে সম-অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া আইন অনুসারে বহু বিবাহের অনুমতির প্রক্রিয়া কেন অবৈধ হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। 

ওই রুলের শুনানি শেষে ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বহাল থাকলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তবে তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা বলেছেন। 

ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রায়ের মূল সারাংশে আদালত বলেন, “পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পিটিশনার একজন আইনজীবী, তিনি নারীদের সম্মান এবং পারিবারিক বৃহত্তর সুরক্ষার জন্য বহুবিবাহের বর্তমান আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যা নিঃসন্দেহে নারীদের অধিকার এবং জনস্বার্থে করা হয়েছে। তাই এই রিট পিটিশনকে জনস্বার্থে করা রিট পিটিশন হিসেবে গণ্য করা হলো।”  

আদালতের বরাতে তিনি আরও জানান, যেহেতু আরবিট্রেশন কাউন্সিলের বহুবিবাহের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে স্ত্রী/স্ত্রীদের থেকে শোনার ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া আরবিট্রেশন কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিভিশন করার সুযোগ বন্ধ রয়েছে। একজন সিভিল জজ সেই রিভিশন শুনানি শুনবেন, যা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। এছাড়া সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করারও সুযোগ রয়েছে। 

এছাড়াও আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে স্ত্রীর দেনমোহর পাওয়া সুনিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ বছর পর্যন্ত সাজা ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান হয়েছে। যা সমাজে সচেতনতা তৈরি করবে। যদিও আইনে বলা হয়নি যে কমপ্লেইন করবে তবু ৫০ ডিএলআর অনুযায়ী আগের স্ত্রী হবেন অভিযোগকারী। 

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় বহুবিবাহের জন্য স্ত্রীর ৭ বছরের সাজার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সাজার অসমতা থাকলেও ইসলামী আইন অনুযায়ী পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। তাই নারীর বহুবিবাহের সাজা এবং পুরুষের বহুবিবাহের সাজা এক না হলেও তা বৈষম্যমূলক নয়। 

রায়ে আদালত সুরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন। এছাড়া রায়ে বুখারী শরীফের [২৪৯৪, ৪৫৭৪, ৫০৯২, মুসলিম ৩০১৮]-এর রেফারেন্স উল্লেখ করেন। 

রায়ে আদালত বলেন, শাফী-হানাফী মাজহাবে স্কলাররা উল্লেখ করেন, যদি একজন পুরুষের অর্থনৈতিক ও অন‍্যান‍্য যোগ‍্যতা না থাকে এবং সব স্ত্রীদের সমান মর্যাদা দিতে না পারে তাহলে সে পুরুষ শুধু একটি বিয়েই করবে। 

তিউনিশিয়া ১৯৫৭ সালে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করেছে। ১৯২৬ সালে তুর্কি মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করেছে। হাইকোর্ট ইতোপূর্বে সরকারকে বহুবিবাহের আইন পরিবর্তন করে অথবা বর্তমান আইনকে বাদ দিয়ে বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। 

আরবিট্রেশন কাউন্সিল চাইলে বহুবিবাহের অনুমতি নাকচ করতে পারে, তাই এটি বৈষম্যমূলক নয় এবং সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। এমতাবস্থায় আইনটি সংবিধান পরিপন্থি নয়। 

তাই বহু বিবাহের বিষয়ক বর্তমান আইনটি সংবিধানের পরিপন্থি নয় মর্মে রায়ে ঘোষণা করা হয় এবং এ সংক্রান্ত রুলটি খারিজ করা হয়।