ঢাকা ০৮:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

রাজনৈতিক ডামাডোলে বিপন্ন জনজীবন: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন জোট গঠন এবং নির্বাচনের নানা সমীকরণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, আয়ের সংস্থান এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষ দেখেছিল, তা এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় রূপ নিয়েছে।

খেটে খাওয়া মানুষের কাছে রাষ্ট্র সংস্কার বা নতুন সাংবিধানিক বন্দোবস্তের মতো গূঢ় শব্দগুলোর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের আহার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। একজন রিকশাচালক, গার্মেন্টসকর্মী বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কাছে রাজনীতি মানে দিনশেষে পেটে ভাত জুটল কি না এবং পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে ঘরে ফিরল কি না। এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে বর্তমান সরকার দৃশ্যত ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে মব-সন্ত্রাস, ছিনতাই ও অনিশ্চয়তা নিয়ে জনমনে গভীর ভীতি জেঁকে বসেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয়। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের কারণে সাধারণ মানুষের বাজেট এখন হিসাবের বাইরে চলে গেছে। চাল, ডাল, তেল ও মাছ-মাংসের মতো প্রতিটি পণ্যের দাম চড়া থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের খাদ্যতালিকা সংকুচিত করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

টানা তিন মাস ধরে বাড়তে থাকা এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সঞ্চয়কে গিলে খাচ্ছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭৭ শতাংশ, যার ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কাগজে-কলমে বাড়লেও বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এই পরিস্থিতির কারণে সমাজে একটি ‘নতুন দরিদ্র শ্রেণি’ তৈরি হচ্ছে, যারা আগে মধ্যবিত্ত ছিল কিন্তু এখন ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

বাজারের এই অস্থিরতা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এক ধরনের ‘অঘোষিত করের’ মতো সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিবিএস-এর হিসাব অনুযায়ী, এক বছর আগে যে পরিবার ১ লাখ টাকায় সংসার চালাত, এখন তাদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে অতিরিক্ত প্রায় ৮ হাজার ৫০০ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এই বাড়তি অর্থের জোগাড় করতে গিয়ে মানুষ সঞ্চয় ভাঙছে বা পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সরবরাহ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সরকার সুদের হার বাড়ানো বা শুল্ক কমানোর মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনো অধরা।

সার্বিকভাবে, সাধারণ মানুষের কাছে বড় বড় সংস্কারের বুলি বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্পগুলো এখন অর্থহীন মনে হচ্ছে। কারণ ক্ষুধার্ত পেটে রাষ্ট্র পরিবর্তনের গল্প কোনো স্বস্তি বয়ে আনে না। জনগণের আস্থা ধরে রাখা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ডিসেম্বরের ৮.৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি লাখো মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের করুণ প্রতিচ্ছবি।

এই চাপ সামাল দিতে না পারলে সরকারের অন্যান্য অর্জনগুলো প্রশ্নের মুখে পড়বে। সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির বড় কোনো চমক চায় না; তারা চায় কেবল পেটের ভাত, জীবনের নিরাপত্তা এবং একটি স্বস্তিময় স্বাভাবিক জীবন। এই অতি সাধারণ চাহিদাগুলো পূরণ না হলে সরকারের গৃহীত যাবতীয় মহাপরিকল্পনা জনগণের কাছে গুরুত্বহীন হয়েই থেকে যাবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

রাজনৈতিক ডামাডোলে বিপন্ন জনজীবন: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

আপডেট সময় : ১২:৪২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন জোট গঠন এবং নির্বাচনের নানা সমীকরণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, আয়ের সংস্থান এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষ দেখেছিল, তা এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় রূপ নিয়েছে।

খেটে খাওয়া মানুষের কাছে রাষ্ট্র সংস্কার বা নতুন সাংবিধানিক বন্দোবস্তের মতো গূঢ় শব্দগুলোর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের আহার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। একজন রিকশাচালক, গার্মেন্টসকর্মী বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কাছে রাজনীতি মানে দিনশেষে পেটে ভাত জুটল কি না এবং পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে ঘরে ফিরল কি না। এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে বর্তমান সরকার দৃশ্যত ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে মব-সন্ত্রাস, ছিনতাই ও অনিশ্চয়তা নিয়ে জনমনে গভীর ভীতি জেঁকে বসেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয়। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের কারণে সাধারণ মানুষের বাজেট এখন হিসাবের বাইরে চলে গেছে। চাল, ডাল, তেল ও মাছ-মাংসের মতো প্রতিটি পণ্যের দাম চড়া থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের খাদ্যতালিকা সংকুচিত করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

টানা তিন মাস ধরে বাড়তে থাকা এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সঞ্চয়কে গিলে খাচ্ছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭৭ শতাংশ, যার ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কাগজে-কলমে বাড়লেও বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এই পরিস্থিতির কারণে সমাজে একটি ‘নতুন দরিদ্র শ্রেণি’ তৈরি হচ্ছে, যারা আগে মধ্যবিত্ত ছিল কিন্তু এখন ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

বাজারের এই অস্থিরতা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এক ধরনের ‘অঘোষিত করের’ মতো সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিবিএস-এর হিসাব অনুযায়ী, এক বছর আগে যে পরিবার ১ লাখ টাকায় সংসার চালাত, এখন তাদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে অতিরিক্ত প্রায় ৮ হাজার ৫০০ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এই বাড়তি অর্থের জোগাড় করতে গিয়ে মানুষ সঞ্চয় ভাঙছে বা পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সরবরাহ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সরকার সুদের হার বাড়ানো বা শুল্ক কমানোর মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনো অধরা।

সার্বিকভাবে, সাধারণ মানুষের কাছে বড় বড় সংস্কারের বুলি বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্পগুলো এখন অর্থহীন মনে হচ্ছে। কারণ ক্ষুধার্ত পেটে রাষ্ট্র পরিবর্তনের গল্প কোনো স্বস্তি বয়ে আনে না। জনগণের আস্থা ধরে রাখা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ডিসেম্বরের ৮.৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি লাখো মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের করুণ প্রতিচ্ছবি।

এই চাপ সামাল দিতে না পারলে সরকারের অন্যান্য অর্জনগুলো প্রশ্নের মুখে পড়বে। সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির বড় কোনো চমক চায় না; তারা চায় কেবল পেটের ভাত, জীবনের নিরাপত্তা এবং একটি স্বস্তিময় স্বাভাবিক জীবন। এই অতি সাধারণ চাহিদাগুলো পূরণ না হলে সরকারের গৃহীত যাবতীয় মহাপরিকল্পনা জনগণের কাছে গুরুত্বহীন হয়েই থেকে যাবে।