দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পেট্রল পাম্পগুলোতে বর্তমানে জ্বালানি তেলের জন্য এক চরম হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে। প্রয়োজনীয় তেলের সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকছে, আর যে দু-একটি পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সামান্য পরিমাণ তেল পেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই তীব্র সংকটের ফলে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি, অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা। রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে আগারগাঁও—সর্বত্রই চিত্র একই রকম; তেলপ্রত্যাশী যানবাহনগুলোর চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে শহরের যানচলাচল।
পাম্পে পাম্পে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি জ্বালানি তেলের এই সংকট পাম্পগুলোতে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাহকরা এতটাই উত্তেজিত ও রুক্ষ হয়ে উঠছেন যে, সামান্য কারণেই একে অপরের ওপর চড়াও হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে উত্তেজিত জনতা এমনকি জরুরি সেবার অ্যাম্বুলেন্স বা সরকারি গাড়িগুলোকেও বিশেষ সুবিধায় তেল নিতে বাধা দিচ্ছেন। পাম্প কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করছে। যান্ত্রিক গোলযোগ বা কোনো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছাড়া পাম্প মালিকরা এখন আর পাম্প চালু রাখার সাহস পাচ্ছেন না। তাদের মতে, পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বড় ধরনের দাঙ্গা বা ভায়োলেন্সের রূপ নিতে পারে।
চালকদের সীমাহীন দুর্ভোগ ও প্যানিক বায়িং জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ চালকরা। অনেক প্রাইভেটকার চালক রাতভর পাম্পের সামনে অপেক্ষা করে পরদিন আবার দিনের বেলা গাড়ি চালাচ্ছেন, যা তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলছে। শেওড়াপাড়ার একটি পাম্পে অপেক্ষমাণ এক চালক জানান, আগের রাত ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও পরদিন দুপুরের আগে তেলের দেখা পাননি তিনি। পাম্প ম্যানেজারদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় তেলের সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এর ওপর সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা অতিরিক্ত তেল মজুত করার প্রবণতা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। গ্রাহকদের একাংশ বলছেন, সরকারের প্রকৃত তথ্যের অভাব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকেই তারা বাড়তি তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মেলবন্ধন জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে মূলত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের ডিপো থেকে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদার অনৈতিকভাবে তেল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় মাসে সারাদেশে পরিচালিত কয়েক হাজার অভিযানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার অবৈধভাবে মজুতকৃত তেল জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় ৩ হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের এবং ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তেলের বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরছে না।
জরুরি সেবা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব তেলের অভাবে অ্যাম্বুলেন্স চালকরা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দূরপাল্লার পথে যেতে সাহস পাচ্ছেন না, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বাস চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরাও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। শুধু ডিজেল বা অকটেন নয়, সিএনজি গ্যাসের সংকটের খবরও পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারকে পাম্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণকে প্রকৃত তথ্য দিয়ে সচেতন করতে হবে এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা জারি রাখতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 






















