ঢাকা ০৬:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান: ঝুঁকিতে চীনের দক্ষিণ আমেরিকান প্রভাব, বাড়ছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান চীনের কয়েক দশকের দীর্ঘ সম্পর্ককে মুহূর্তেই ভেঙে দিয়েছে, যা বেইজিংয়ের দক্ষিণ আমেরিকায় প্রভাব টিকিয়ে রাখাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান শক্তি প্রতিযোগিতাকে এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) গভীর রাতে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হন। অথচ এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি বেইজিংয়ের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে অভিহিত করে বিশ্ব নেতৃত্বে তার দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করেন।

তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় চীন বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং দেশটি বেইজিংয়ের দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৬০০ চুক্তি পর্যালোচনা সংক্রান্ত খবর ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারের পরপরই মাদুরোর হাতকড়া পরা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আটকের ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ। বেইজিং অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন ‘বিশ্বের বিচারক’ সেজে উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সকল দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত।

কড়া ভাষায় নিন্দা জানানোর পাশাপাশি চীন এখন জটিল এক হিসাব কষছে। তারা দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইতোমধ্যে জটিল হয়ে ওঠা সম্পর্ক কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে ভাবছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও অনেকে এটিকে চীনের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন, তবে বেইজিংয়ের জন্য এতে রয়েছে ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা ও হতাশা। কারণ, এতদিন আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই চীন এগিয়ে চলার চেষ্টা করছিল, যা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কার্যত বিঘ্নিত হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী চীন সাধারণত বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার এমন বিশৃঙ্খলাই দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকলেও, এবার চীন এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে চীনের গভীর সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। চীনা প্রভাব দমনে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত রোববার (৪ জানুয়ারি) এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ বা প্রতিযোগীদের ঘাঁটি হতে দেব না।’ বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের সুস্পষ্ট বার্তা বেইজিংয়ের জন্য ছিল ‘আমাদের জায়গা ছাড়ুন’।

চীন প্রকাশ্যে এর জবাব না দিলেও গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও কি বেইজিং একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে? চীন তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রদেশ মনে করে এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এটিকে একদিন চীনের সাথে একত্রিত করার অঙ্গীকার করেছেন। চীনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কারাকাসে এমন অভিযান চালাতে পারে, তাহলে বেইজিং কেন পারবে না?

তবে, বিশ্লেষক ডেভিড স্যাকসের মতে, চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে কেবল তখনই, যখন তারা সামরিক হামলা ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে সফল হবে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে নয়।

গত বছর ভেনেজুয়েলার প্রায় ৮০ শতাংশ তেল চীনে গিয়েছিল, যদিও এটি চীনের মোট তেল আমদানির মাত্র ৪ শতাংশ। তবুও, ভেনেজুয়েলায় চীনা কোম্পানিগুলোর বিশাল সম্পদ এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় বেইজিংকে একটি জটিল ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তাদের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সম্পন্ন হওয়া বাণিজ্য সমঝোতাকে নষ্ট না করে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখা। ট্রাম্পের মতো ‘আনপ্রেডিকটেবল’ বা অপ্রত্যাশিত নেতার সঙ্গে এই সমীকরণ বেশ কঠিন ও জটিল বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নরসিংদীতে শিশু হত্যার নির্মমতা: ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার জমিয়ত

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান: ঝুঁকিতে চীনের দক্ষিণ আমেরিকান প্রভাব, বাড়ছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা

আপডেট সময় : ০৮:০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান চীনের কয়েক দশকের দীর্ঘ সম্পর্ককে মুহূর্তেই ভেঙে দিয়েছে, যা বেইজিংয়ের দক্ষিণ আমেরিকায় প্রভাব টিকিয়ে রাখাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান শক্তি প্রতিযোগিতাকে এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) গভীর রাতে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হন। অথচ এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি বেইজিংয়ের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে অভিহিত করে বিশ্ব নেতৃত্বে তার দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করেন।

তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় চীন বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং দেশটি বেইজিংয়ের দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৬০০ চুক্তি পর্যালোচনা সংক্রান্ত খবর ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারের পরপরই মাদুরোর হাতকড়া পরা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আটকের ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ। বেইজিং অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন ‘বিশ্বের বিচারক’ সেজে উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সকল দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত।

কড়া ভাষায় নিন্দা জানানোর পাশাপাশি চীন এখন জটিল এক হিসাব কষছে। তারা দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইতোমধ্যে জটিল হয়ে ওঠা সম্পর্ক কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে ভাবছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও অনেকে এটিকে চীনের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন, তবে বেইজিংয়ের জন্য এতে রয়েছে ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা ও হতাশা। কারণ, এতদিন আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই চীন এগিয়ে চলার চেষ্টা করছিল, যা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কার্যত বিঘ্নিত হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী চীন সাধারণত বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার এমন বিশৃঙ্খলাই দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকলেও, এবার চীন এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে চীনের গভীর সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। চীনা প্রভাব দমনে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত রোববার (৪ জানুয়ারি) এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ বা প্রতিযোগীদের ঘাঁটি হতে দেব না।’ বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের সুস্পষ্ট বার্তা বেইজিংয়ের জন্য ছিল ‘আমাদের জায়গা ছাড়ুন’।

চীন প্রকাশ্যে এর জবাব না দিলেও গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও কি বেইজিং একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে? চীন তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রদেশ মনে করে এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এটিকে একদিন চীনের সাথে একত্রিত করার অঙ্গীকার করেছেন। চীনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কারাকাসে এমন অভিযান চালাতে পারে, তাহলে বেইজিং কেন পারবে না?

তবে, বিশ্লেষক ডেভিড স্যাকসের মতে, চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে কেবল তখনই, যখন তারা সামরিক হামলা ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে সফল হবে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে নয়।

গত বছর ভেনেজুয়েলার প্রায় ৮০ শতাংশ তেল চীনে গিয়েছিল, যদিও এটি চীনের মোট তেল আমদানির মাত্র ৪ শতাংশ। তবুও, ভেনেজুয়েলায় চীনা কোম্পানিগুলোর বিশাল সম্পদ এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় বেইজিংকে একটি জটিল ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তাদের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সম্পন্ন হওয়া বাণিজ্য সমঝোতাকে নষ্ট না করে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখা। ট্রাম্পের মতো ‘আনপ্রেডিকটেবল’ বা অপ্রত্যাশিত নেতার সঙ্গে এই সমীকরণ বেশ কঠিন ও জটিল বলেই বিবেচিত হচ্ছে।