বাংলাদেশের শ্রমবাজার বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষার্ধে প্রকাশিত ‘শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪’ (১৩তম আইসিএলএস অনুযায়ী) পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে শ্রমশক্তির আকার বাড়লেও কাজের গুণমান, নিরাপত্তা এবং অংশগ্রহণের হারে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে জাতীয় শ্রমশক্তি ৭৩.৪৫ মিলিয়নে দাঁড়ালেও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের ৬১.২ শতাংশ থেকে কমে ৫৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শ্রমবাজারে ‘নিরুৎসাহিত কর্মীবাহিনীর’ একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত, যেখানে কর্মক্ষম মানুষ উপযুক্ত কাজের অভাবে কাজ খোঁজার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে নারী শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে। এক বছরের ব্যবধানে নারী শ্রমশক্তি ২৫.৩৩ মিলিয়ন থেকে কমে ২৩.৬৯ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যাতায়াত সমস্যা এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারীরা শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ে পুনরায় গৃহস্থালি ও অবৈতনিক কাজে ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও কর্মসংস্থান না বাড়ার ফলে দেশ এক ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির’ (Jobless Growth) বৃত্তে আটকে পড়েছে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে এবং মানুষ নিরুপায় হয়ে পুনরায় কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতের (৪৮.৪৯%) দিকে ঝুঁকছে, যা আধুনিক অর্থনীতির লক্ষণের পরিপন্থী।
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার মাত্র ৩.৬৬ শতাংশ দেখালেও এর অন্তরালে রয়েছে পরিসংখ্যানগত জটিলতা। মূলত আইএলও-র কঠোর সংজ্ঞার কারণে বিপুল সংখ্যক ‘আধা-বেকার’ এবং কাজ ছেড়ে দেওয়া মানুষকে এই গণনায় আনা হয় না। প্রায় ৪৭ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে শ্রমশক্তির বাইরে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে ১৫-২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তির ক্রমহ্রাসমান হার প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধা হারাতে বসেছে। এছাড়া মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৮ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কোনো নিয়োগপত্র বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। ২০২৬ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই কাঠামোগত সংকট নিরসন ও বিনিয়োগবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























