ঢাকা ০১:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ব্রিটেনের জন্মহারের পতন ঠেকাচ্ছে বাংলাদেশি ও মুসলিমরা

যুক্তরাজ্যের জনতাত্ত্বিক ইতিহাসে ২০২৬ সালটি একটি স্থায়ী ও বড় পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। গত ১০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রাকৃতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা থমকে গিয়ে দেশটিতে জন্মহারের তুলনায় মৃত্যুহার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে গবেষণা সংস্থা রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন। তবে ব্রিটিশ সমাজের এই বার্ধক্যজনিত সংকটের বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে ব্রিটিশবাংলাদেশি ও বৃহত্তর মুসলিম সম্প্রদায়।

দেশটির মূলধারার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর জন্মহার আশঙ্কাজনক হারে কমলেও ব্রিটিশবাংলাদেশি পরিবারগুলোতে উচ্চ জন্মহার এবং তরুণ প্রজন্মের আধিক্য যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

রেজোলিউশন ফাউন্ডেশনের গবেষণা পরিচালক গ্রেগরি থোয়েটস এবং প্রধান নির্বাহী রুথ কার্টিস এক যৌথ বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, ২০২৬ সাল হবে ব্রিটেনের জন্য একটি ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন স্বাভাবিকতার বছর। ১৯ শতকের পর থেকে কেবল ১৯২৬ সালের ধর্মঘট এবং করোনা মহামারীর সময় বাদে প্রতিবছর মৃত্যুর চেয়ে জন্ম বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে নারীদের প্রজনন হার প্রতিজনে ১.এ নেমে আসায় এই চিত্র পাল্টে গেছে। ২০২৬ সাল থেকে মৃত্যুহার ধারাবাহিকভাবে জন্মহারকে ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বছরে ১ লাখে গিয়ে ঠেকতে পারে।

ব্রিটেনের সামগ্রিক জনসংখ্যা যখন বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন মুসলিম এবং বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশরা তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ দখল করে আছে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনসংখ্যার গড় বয়স যেখানে ৪০ বছর, সেখানে ব্রিটিশ মুসলিমদের গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর।

ব্রিটেনের জন্মহারের পতন ঠেকাচ্ছে বাংলাদেশি ও মুসলিমরা

ব্রিটিশবাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মহার জাতীয় গড়ের তুলনায় এখনও বেশ সন্তোষজনক এবং এই জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হারও অনেক কম। ফলে ব্রিটেনের শহরগুলোতে আগামীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর রাজস্বের বড় অংশটি আসবে এই ক্রমবর্ধমান তরুণ শ্রমশক্তি থেকে।

যুক্তরাজ্যের জন্মহার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জন কন্যা শিশুর বিপরীতে প্রায় ১০৫ জন পুত্র শিশু জন্মগ্রহণ করছে। তবে সংখ্যাতত্ত্বের চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীদের মাতৃত্বের হার। বর্তমানে ৩০ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৪ শতাংশই নিঃসন্তান থাকছেন, যা বিগত প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্যারিয়ারের চাপ এবং জীবনযাত্রার উচ্চব্যয়ের কারণে শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে সন্তান ধারণের প্রবণতা কমলেও বাংলাদেশি ও মুসলিম নারীদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধের কারণে এখনও প্রজনন হার টেকসই পর্যায়ে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজার সচল রাখতে বর্তমানে অভিবাসনই একমাত্র পথ। তবে দেশটি এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে যখন চাইলেও আর নতুন অভিবাসীদের স্বাগত জানানো সম্ভব হবে না। আবাসন সংকট যখন চরম সীমায় পৌঁছাবে এবং বিদ্যমান অবকাঠামো যখন অতিরিক্ত মানুষের চাপ নিতে অক্ষম হয়ে পড়বে, তখনই অভিবাসনে কঠোর লাগাম টানতে বাধ্য হবে সরকার। ২০২৬ সালের মধ্যে গৃহহীনদের সংখ্যা এবং আবাসনের উচ্চমূল্য এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।

রেজোলিউশন ফাউন্ডেশনের এই সতর্কবার্তা মূলত ব্রিটিশ জনসেবা এবং কর ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চাপের ইঙ্গিত। শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পেনশন এবং এনএইচএসএর মতো জনসেবা খাতগুলো তহবিলের সংকটে পড়বে। ২০২৬ সালে মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি মাত্র ০.২ শতাংশে স্থবির হয়ে যেতে পারে।

এমতাবস্থায় ব্রিটিশবাংলাদেশি এবং মুসলিমদের মতো বিকাশমান সম্প্রদায়গুলো যদি শ্রমবাজারে নেতৃত্ব না দেয়, তবে ব্রিটিশ অর্থনীতি একটি স্থবির জম্বি ইকোনমিতে পরিণত হওয়ার বড় ধরণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পুনরায় সরকারি ছুটি ঘোষিত হলো ৭ নভেম্বর: মন্ত্রিসভার বড় সিদ্ধান্ত

ব্রিটেনের জন্মহারের পতন ঠেকাচ্ছে বাংলাদেশি ও মুসলিমরা

আপডেট সময় : ০৬:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাজ্যের জনতাত্ত্বিক ইতিহাসে ২০২৬ সালটি একটি স্থায়ী ও বড় পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। গত ১০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রাকৃতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা থমকে গিয়ে দেশটিতে জন্মহারের তুলনায় মৃত্যুহার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে গবেষণা সংস্থা রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন। তবে ব্রিটিশ সমাজের এই বার্ধক্যজনিত সংকটের বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে ব্রিটিশবাংলাদেশি ও বৃহত্তর মুসলিম সম্প্রদায়।

দেশটির মূলধারার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর জন্মহার আশঙ্কাজনক হারে কমলেও ব্রিটিশবাংলাদেশি পরিবারগুলোতে উচ্চ জন্মহার এবং তরুণ প্রজন্মের আধিক্য যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

রেজোলিউশন ফাউন্ডেশনের গবেষণা পরিচালক গ্রেগরি থোয়েটস এবং প্রধান নির্বাহী রুথ কার্টিস এক যৌথ বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, ২০২৬ সাল হবে ব্রিটেনের জন্য একটি ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন স্বাভাবিকতার বছর। ১৯ শতকের পর থেকে কেবল ১৯২৬ সালের ধর্মঘট এবং করোনা মহামারীর সময় বাদে প্রতিবছর মৃত্যুর চেয়ে জন্ম বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে নারীদের প্রজনন হার প্রতিজনে ১.এ নেমে আসায় এই চিত্র পাল্টে গেছে। ২০২৬ সাল থেকে মৃত্যুহার ধারাবাহিকভাবে জন্মহারকে ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বছরে ১ লাখে গিয়ে ঠেকতে পারে।

ব্রিটেনের সামগ্রিক জনসংখ্যা যখন বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন মুসলিম এবং বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশরা তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ দখল করে আছে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনসংখ্যার গড় বয়স যেখানে ৪০ বছর, সেখানে ব্রিটিশ মুসলিমদের গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর।

ব্রিটেনের জন্মহারের পতন ঠেকাচ্ছে বাংলাদেশি ও মুসলিমরা

ব্রিটিশবাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মহার জাতীয় গড়ের তুলনায় এখনও বেশ সন্তোষজনক এবং এই জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হারও অনেক কম। ফলে ব্রিটেনের শহরগুলোতে আগামীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর রাজস্বের বড় অংশটি আসবে এই ক্রমবর্ধমান তরুণ শ্রমশক্তি থেকে।

যুক্তরাজ্যের জন্মহার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জন কন্যা শিশুর বিপরীতে প্রায় ১০৫ জন পুত্র শিশু জন্মগ্রহণ করছে। তবে সংখ্যাতত্ত্বের চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীদের মাতৃত্বের হার। বর্তমানে ৩০ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৪ শতাংশই নিঃসন্তান থাকছেন, যা বিগত প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্যারিয়ারের চাপ এবং জীবনযাত্রার উচ্চব্যয়ের কারণে শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে সন্তান ধারণের প্রবণতা কমলেও বাংলাদেশি ও মুসলিম নারীদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধের কারণে এখনও প্রজনন হার টেকসই পর্যায়ে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজার সচল রাখতে বর্তমানে অভিবাসনই একমাত্র পথ। তবে দেশটি এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে যখন চাইলেও আর নতুন অভিবাসীদের স্বাগত জানানো সম্ভব হবে না। আবাসন সংকট যখন চরম সীমায় পৌঁছাবে এবং বিদ্যমান অবকাঠামো যখন অতিরিক্ত মানুষের চাপ নিতে অক্ষম হয়ে পড়বে, তখনই অভিবাসনে কঠোর লাগাম টানতে বাধ্য হবে সরকার। ২০২৬ সালের মধ্যে গৃহহীনদের সংখ্যা এবং আবাসনের উচ্চমূল্য এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।

রেজোলিউশন ফাউন্ডেশনের এই সতর্কবার্তা মূলত ব্রিটিশ জনসেবা এবং কর ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চাপের ইঙ্গিত। শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পেনশন এবং এনএইচএসএর মতো জনসেবা খাতগুলো তহবিলের সংকটে পড়বে। ২০২৬ সালে মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি মাত্র ০.২ শতাংশে স্থবির হয়ে যেতে পারে।

এমতাবস্থায় ব্রিটিশবাংলাদেশি এবং মুসলিমদের মতো বিকাশমান সম্প্রদায়গুলো যদি শ্রমবাজারে নেতৃত্ব না দেয়, তবে ব্রিটিশ অর্থনীতি একটি স্থবির জম্বি ইকোনমিতে পরিণত হওয়ার বড় ধরণের ঝুঁকিতে রয়েছে।