ঢাকা ১০:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

হলফনামার রাজনীতি

নিজের ব্যাংকে আছে এক হাজার টাকা। স্ত্রীর আছে ১৮৭ ভরি স্বর্ণ! এটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের তথ্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেয়া হলফনামায় তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, সেখানে বলা হয়েছে: তার ব্যাংক হিসাবে মাত্র ১ হাজার ১৭৬ টাকা আছে। তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে কোনো টাকা নেই। তবে স্ত্রীর কাছে নগদ রয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ১৮৭ ভরি স্বর্ণ। স্থাবর সম্পদের হিসাবে ফয়জুল করিমের রয়েছে ২ হাজার ৪৩৬ শতাংশ কৃষি জমি, অকৃষি জমি ২ দশমিক ৪০ শতাংশ, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৬৬১ বর্গফুটের একটি বাণিজ্যিক ভবন (দোকান) এবং ২ হাজার ১৩ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট।

১৮৭ ভরি স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য চার কোটি টাকার চেয়ে বেশি। প্রশ্ন হলো, যার এত স্থাবর সম্পত্তি এবং স্ত্রীর প্রায় দুইশো ভরি স্বর্ণ আছে, তার ব্যাংকে মাত্র এক হাজার টাকা থাকে কী করে? এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে। ১. ওইসব স্বর্ণ তার স্ত্রী উপহার হিসেবে পেয়েছেন এবং এগুলো স্বর্ণের দাম যখন অনেক কম ছিল, সেই সময়ের কেনা। ২. তিনি ব্যাংকে বেশি টাকা রাখেন না। যেমন হলফনামায় ফয়জুল করিম উল্লেখ করেছেন, তার হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ৩১ লাখ ১২ হাজার ৪৭ টাকা। প্রশ্ন হলো, ব্যাংকে না রেখে তিনি এবং তার স্ত্রী এত টাকা নগদ বা হাতে রাখছেন কেন? দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নেই নাকি তারা এটাকে হারাম মনে করেন? নাকি হলফনামায় যা বলেছেন, গোপন করেছেন তারও বেশি?

বলা হয়, যেকোনো ব্যক্তিগত সম্পদের দাম নির্ভর করে ওই ব্যক্তি সেটির দাম কতটা বলছেন তারওপর। যেমন কেউ যদি তার স্বর্ণ বিক্রি করতে না চান তাহলে তিনি বলতে পারেন যে তার কাছে থাকা ১৮৭ ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ টাকা। কিন্তু তিনি বিক্রি করবেন না। আবার কেউ হয়তো বললেন যে, তার ওই স্বর্ণের দাম ১০ কোটি টাকা। তাহলে এই দামেও কেউ কিনবে না। সুতরাং ব্যক্তিগত সম্পদের দাম যদি বর্তমান বাজার মূল্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়, সেটি এরকরম। আর যদি তা না হয়, তাহলে অন্য কথা। কিন্তু নির্বাচনি হলফনামায় সম্পদের দাম বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী উল্লেখ করতে হবে কি না—সেটি স্পষ্ট নয়।

যেমন জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমানের হলফানামায় ১১ দশমকি ৭৭ শতকের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও তার দাম বলা হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। এই দামে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি কেনা বা বানানো অসম্ভব। কিন্তু এটিও আগের দাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনি হলফনামায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দিয়েছেন। লিখেছেন, তার এফডিআর রয়েছে ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ টাকার; আর স্ত্রীর এফডিআর রয়েছে ৩৫ লাখ টাকার।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হলফনামায় তার পেশা উল্লেখ করেছেন শিক্ষক ও পরামর্শক। বছরে আয় করেন বছরে ১৬ লাখ টাকা। মোট ৩২ লাখ টাকার সম্পদ থাকলেও নেই বাড়ি-গাড়ি-জমি। তার পৌনে ৮ লাখ টাকা মূল্যের অলংকার এবং স্ত্রীর আছে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গহনা। এক লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও আসবাব আছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে এনসিপি প্রধানের ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকার সম্পদ।

কিন্তু নাহিদের হলফনামায় দেয়া তথ্য প্রকাশের পরে এ নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় অনেকেই নানা প্রশ্ন তুললে এনসিপির পক্ষ থেকে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, নাহিদ ইসলামের ৩২ লক্ষ টাকার মোট সম্পত্তি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করার পর নাহিদ ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে মাসিক এক লক্ষ টাকা সম্মানিতে কাজ শুরু করেন। সে হিসেবে গত অর্থ বছরে উপদেষ্টা পদে থেকে এবং পরামর্শক পেশার আয় থেকে মোট ১৬ লক্ষ টাকা আয় করেন এবং ২০২৪-২৫ আয়বর্ষে তার আয়ের উপর সর্বমোট ১ লক্ষ ১৩ হাজার ২৭৪ টাকা আয়কর পরিশোধ করেন। এই সকল তথ্য তার আয়কর রিটার্নে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

বহুদিন ধরেই এটা বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে রাজনীতি। যে কারণে এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান পদে জয়ী হওয়া তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই ভীষণ যুদ্ধ চলে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায় মনোনয়ন পেতে গিয়েই। কারণ বিগত বছরগুলোয় একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই জয় নিশ্চিত। আর জয়ী হলেই সুদে-আসলে সব টাকা উঠে আসবে।

তবে আয়কর রিটার্ন কিংবা নির্বাচনী হলফনামার কোথাও নাহিদ ইসলামের পেশা শিক্ষকতা দেখানো হয়নি বলে দাবি করা হলেও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলফনামার ৪ নম্বর পয়েন্টে পেশা পরামর্শক লেখা হলেও ৬ নম্বর পয়েন্টে আয়ের উৎসের জায়গায় তার পেশা লেখা হয়েছে শিক্ষকতা ও পরামর্শক। তার মানে এনসিপির বিবৃতিতে যা দাবি করা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়।

আশ্বর্যের বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বড় পাঁচটি দলের ১০ শীর্ষ নেতার মধ্যে সাতজনেরই মাসে আয় লাখ টাকার কম। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে কম আয় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের। তার বার্ষিক আয় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। মানে বছরে মাত্র ৩০ হাজার টাকা! প্রশ্ন হলো, এই টাকা দিয়ে তিনি কীভাবে চলেন?

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন চার লাখ টাকা। তবে দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি বছরে আয় দেখিয়েছেন ৩৩ লাখ টাকা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ছয় লাখ ৭৬ হাজার টাকা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাসিক আয় লাখ টাকার মতো। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বছরে ১৬ লাখ টাকা আয় করেন। ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের বার্ষিক আয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

প্রশ্ন হলো, এরকম ব্যক্তিদের মাসিক আয় এক লাখ টাকার কম-বেশি, এটা কতজন লোক বিশ্বাস করে? উল্লিখিত প্রার্থীদের মধ্যে কেবল জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারিই কেবল বিশ্বাসযোগ্য আয়ের কথা বলেছেন। প্রশ্ন হলো, বড় দলের শীর্ষ নেতারা হলফনামায় যে বার্ষিক আয়ের কথা লিখেছেন, তার সঙ্গে তাদের ব্যয় ও জীবন-যাপনের কোনো মিল আছে? তার মানে হলফনামায় তারা এর চেয়ে বেশি বৈধ বা প্রকাশ্য আয় দেখাতে পারছেন না ট্যাক্সের হিসাব মেলানোর জন্য। বাকি সম্পদ ও উপার্জনের কথা তারা গোপন করেছেন?

বাস্তবতা হলো, প্রত্যেকটা নির্বাচনের সময়ই হলফনামায় উল্লিখিত প্রার্থীদের তথ্য নিয়ে নানা বিতর্ক ওঠে। জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। মানুষ ভাবে, তারা যা বলছেন, গোপন করছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। এটা মূলত রাজনীতিবিদদের ওপর মানুষের অবিশ্বাস ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।

আবার হলফনামায় দেয়া তথ্য নানা কারণেই জনমনে সন্দেহের জন্ম দেয়। যেমন জমি যে দামে কেনা হয়, রেজিস্ট্রেশনের সময় সেই দাম উল্লেখ করা হয় না সরকারি নানাবিধ ট্যাক্সের ভয়ে। ট্যাক্স রিটার্নেও সম্পদের পরিমাণ কম দেখানোর জন্য সম্পত্তির প্রকৃত ক্রয়মূল্য থেকে অনেক কম দেখানো ওপেন সিক্রেট। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে প্লটের দাম ১০ লাখ টাকা, প্রকৃত অর্থে তার দাম কয়েক গুণ বেশি। তার মানে এটি একটি ‘সর্বজনস্বীকৃত বৈধ গোপনীয়তা’। ফলে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ১০টি কলামে যেসব তথ্য দেন, সেখানে সম্পদের বিবরণীর ঘরে তারা যা লেখেন, তার বিরাট অংশই যে মিথ্যা বা অর্ধসত্য, তাতে সন্দেহ কম।

হলফনামায় সম্পদের বিবরণে তারা যে সবচেয়ে বেশি তথ্য গোপন করেন এটি যেমন সত্য, তেমনি এই গোপনীয়তার ভেতর থেকেও এমন অনেক সত্য বেরিয়ে আসে, যাতে বোঝাই যায়, দুয়েকজন খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ এমপির কাছেই সংসদ সদস্য পদ আসলে একটি আলাদিনের চেরাগ। কেননা সংসদ সদস্য হওয়ার আগে হলফনামায় তারা যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন, পরে নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায় তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকশো গুণ।

সংসদ সদস্য হিসেবে তারা যে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পান, তাতে মাত্র পাঁচ বছরে স্বাভাবিক পথে কারও পক্ষে কোটিপতি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দেখা যায় শুধু কোটি নন, তাদের কেউ কেউ শত কোটি টাকারও মালিক হয়ে যাচ্ছেন। তার মানে তারা হয় সরকারের নানা প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন অথবা এমপি পদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।

বহুদিন ধরেই এটা বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে রাজনীতি। যে কারণে এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান পদে জয়ী হওয়া তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই ভীষণ যুদ্ধ চলে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায় মনোনয়ন পেতে গিয়েই। কারণ বিগত বছরগুলোয় একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই জয় নিশ্চিত। আর জয়ী হলেই সুদে-আসলে সব টাকা উঠে আসবে। ফলে তারা যদি হলফনামায় স্বর্ণের ভরি এক হাজার টাকা কিংবা রাজধানীতে এটি প্লটের দাম চারশো টাকাও দেখানতা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতা হবে বটে, আখেরে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না। কেউ এর জন্য জবাবদিহি কিংবা বিচারের মুখোমুখিও হবেন না। কারণ টাকা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাই এখন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শচীনকে ছাড়িয়ে কোহলির বিশ্বরেকর্ড, কিউইদের হারিয়ে শুভসূচনা ভারতের

হলফনামার রাজনীতি

আপডেট সময় : ০১:০১:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

নিজের ব্যাংকে আছে এক হাজার টাকা। স্ত্রীর আছে ১৮৭ ভরি স্বর্ণ! এটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের তথ্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেয়া হলফনামায় তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, সেখানে বলা হয়েছে: তার ব্যাংক হিসাবে মাত্র ১ হাজার ১৭৬ টাকা আছে। তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে কোনো টাকা নেই। তবে স্ত্রীর কাছে নগদ রয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ১৮৭ ভরি স্বর্ণ। স্থাবর সম্পদের হিসাবে ফয়জুল করিমের রয়েছে ২ হাজার ৪৩৬ শতাংশ কৃষি জমি, অকৃষি জমি ২ দশমিক ৪০ শতাংশ, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৬৬১ বর্গফুটের একটি বাণিজ্যিক ভবন (দোকান) এবং ২ হাজার ১৩ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট।

১৮৭ ভরি স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য চার কোটি টাকার চেয়ে বেশি। প্রশ্ন হলো, যার এত স্থাবর সম্পত্তি এবং স্ত্রীর প্রায় দুইশো ভরি স্বর্ণ আছে, তার ব্যাংকে মাত্র এক হাজার টাকা থাকে কী করে? এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে। ১. ওইসব স্বর্ণ তার স্ত্রী উপহার হিসেবে পেয়েছেন এবং এগুলো স্বর্ণের দাম যখন অনেক কম ছিল, সেই সময়ের কেনা। ২. তিনি ব্যাংকে বেশি টাকা রাখেন না। যেমন হলফনামায় ফয়জুল করিম উল্লেখ করেছেন, তার হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ৩১ লাখ ১২ হাজার ৪৭ টাকা। প্রশ্ন হলো, ব্যাংকে না রেখে তিনি এবং তার স্ত্রী এত টাকা নগদ বা হাতে রাখছেন কেন? দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নেই নাকি তারা এটাকে হারাম মনে করেন? নাকি হলফনামায় যা বলেছেন, গোপন করেছেন তারও বেশি?

বলা হয়, যেকোনো ব্যক্তিগত সম্পদের দাম নির্ভর করে ওই ব্যক্তি সেটির দাম কতটা বলছেন তারওপর। যেমন কেউ যদি তার স্বর্ণ বিক্রি করতে না চান তাহলে তিনি বলতে পারেন যে তার কাছে থাকা ১৮৭ ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ টাকা। কিন্তু তিনি বিক্রি করবেন না। আবার কেউ হয়তো বললেন যে, তার ওই স্বর্ণের দাম ১০ কোটি টাকা। তাহলে এই দামেও কেউ কিনবে না। সুতরাং ব্যক্তিগত সম্পদের দাম যদি বর্তমান বাজার মূল্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়, সেটি এরকরম। আর যদি তা না হয়, তাহলে অন্য কথা। কিন্তু নির্বাচনি হলফনামায় সম্পদের দাম বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী উল্লেখ করতে হবে কি না—সেটি স্পষ্ট নয়।

যেমন জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমানের হলফানামায় ১১ দশমকি ৭৭ শতকের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও তার দাম বলা হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। এই দামে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি কেনা বা বানানো অসম্ভব। কিন্তু এটিও আগের দাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনি হলফনামায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দিয়েছেন। লিখেছেন, তার এফডিআর রয়েছে ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ টাকার; আর স্ত্রীর এফডিআর রয়েছে ৩৫ লাখ টাকার।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হলফনামায় তার পেশা উল্লেখ করেছেন শিক্ষক ও পরামর্শক। বছরে আয় করেন বছরে ১৬ লাখ টাকা। মোট ৩২ লাখ টাকার সম্পদ থাকলেও নেই বাড়ি-গাড়ি-জমি। তার পৌনে ৮ লাখ টাকা মূল্যের অলংকার এবং স্ত্রীর আছে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গহনা। এক লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও আসবাব আছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে এনসিপি প্রধানের ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকার সম্পদ।

কিন্তু নাহিদের হলফনামায় দেয়া তথ্য প্রকাশের পরে এ নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় অনেকেই নানা প্রশ্ন তুললে এনসিপির পক্ষ থেকে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, নাহিদ ইসলামের ৩২ লক্ষ টাকার মোট সম্পত্তি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করার পর নাহিদ ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে মাসিক এক লক্ষ টাকা সম্মানিতে কাজ শুরু করেন। সে হিসেবে গত অর্থ বছরে উপদেষ্টা পদে থেকে এবং পরামর্শক পেশার আয় থেকে মোট ১৬ লক্ষ টাকা আয় করেন এবং ২০২৪-২৫ আয়বর্ষে তার আয়ের উপর সর্বমোট ১ লক্ষ ১৩ হাজার ২৭৪ টাকা আয়কর পরিশোধ করেন। এই সকল তথ্য তার আয়কর রিটার্নে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

বহুদিন ধরেই এটা বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে রাজনীতি। যে কারণে এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান পদে জয়ী হওয়া তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই ভীষণ যুদ্ধ চলে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায় মনোনয়ন পেতে গিয়েই। কারণ বিগত বছরগুলোয় একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই জয় নিশ্চিত। আর জয়ী হলেই সুদে-আসলে সব টাকা উঠে আসবে।

তবে আয়কর রিটার্ন কিংবা নির্বাচনী হলফনামার কোথাও নাহিদ ইসলামের পেশা শিক্ষকতা দেখানো হয়নি বলে দাবি করা হলেও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলফনামার ৪ নম্বর পয়েন্টে পেশা পরামর্শক লেখা হলেও ৬ নম্বর পয়েন্টে আয়ের উৎসের জায়গায় তার পেশা লেখা হয়েছে শিক্ষকতা ও পরামর্শক। তার মানে এনসিপির বিবৃতিতে যা দাবি করা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়।

আশ্বর্যের বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বড় পাঁচটি দলের ১০ শীর্ষ নেতার মধ্যে সাতজনেরই মাসে আয় লাখ টাকার কম। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে কম আয় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের। তার বার্ষিক আয় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। মানে বছরে মাত্র ৩০ হাজার টাকা! প্রশ্ন হলো, এই টাকা দিয়ে তিনি কীভাবে চলেন?

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন চার লাখ টাকা। তবে দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি বছরে আয় দেখিয়েছেন ৩৩ লাখ টাকা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ছয় লাখ ৭৬ হাজার টাকা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাসিক আয় লাখ টাকার মতো। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বছরে ১৬ লাখ টাকা আয় করেন। ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের বার্ষিক আয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

প্রশ্ন হলো, এরকম ব্যক্তিদের মাসিক আয় এক লাখ টাকার কম-বেশি, এটা কতজন লোক বিশ্বাস করে? উল্লিখিত প্রার্থীদের মধ্যে কেবল জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারিই কেবল বিশ্বাসযোগ্য আয়ের কথা বলেছেন। প্রশ্ন হলো, বড় দলের শীর্ষ নেতারা হলফনামায় যে বার্ষিক আয়ের কথা লিখেছেন, তার সঙ্গে তাদের ব্যয় ও জীবন-যাপনের কোনো মিল আছে? তার মানে হলফনামায় তারা এর চেয়ে বেশি বৈধ বা প্রকাশ্য আয় দেখাতে পারছেন না ট্যাক্সের হিসাব মেলানোর জন্য। বাকি সম্পদ ও উপার্জনের কথা তারা গোপন করেছেন?

বাস্তবতা হলো, প্রত্যেকটা নির্বাচনের সময়ই হলফনামায় উল্লিখিত প্রার্থীদের তথ্য নিয়ে নানা বিতর্ক ওঠে। জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। মানুষ ভাবে, তারা যা বলছেন, গোপন করছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। এটা মূলত রাজনীতিবিদদের ওপর মানুষের অবিশ্বাস ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।

আবার হলফনামায় দেয়া তথ্য নানা কারণেই জনমনে সন্দেহের জন্ম দেয়। যেমন জমি যে দামে কেনা হয়, রেজিস্ট্রেশনের সময় সেই দাম উল্লেখ করা হয় না সরকারি নানাবিধ ট্যাক্সের ভয়ে। ট্যাক্স রিটার্নেও সম্পদের পরিমাণ কম দেখানোর জন্য সম্পত্তির প্রকৃত ক্রয়মূল্য থেকে অনেক কম দেখানো ওপেন সিক্রেট। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে প্লটের দাম ১০ লাখ টাকা, প্রকৃত অর্থে তার দাম কয়েক গুণ বেশি। তার মানে এটি একটি ‘সর্বজনস্বীকৃত বৈধ গোপনীয়তা’। ফলে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ১০টি কলামে যেসব তথ্য দেন, সেখানে সম্পদের বিবরণীর ঘরে তারা যা লেখেন, তার বিরাট অংশই যে মিথ্যা বা অর্ধসত্য, তাতে সন্দেহ কম।

হলফনামায় সম্পদের বিবরণে তারা যে সবচেয়ে বেশি তথ্য গোপন করেন এটি যেমন সত্য, তেমনি এই গোপনীয়তার ভেতর থেকেও এমন অনেক সত্য বেরিয়ে আসে, যাতে বোঝাই যায়, দুয়েকজন খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ এমপির কাছেই সংসদ সদস্য পদ আসলে একটি আলাদিনের চেরাগ। কেননা সংসদ সদস্য হওয়ার আগে হলফনামায় তারা যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন, পরে নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায় তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকশো গুণ।

সংসদ সদস্য হিসেবে তারা যে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পান, তাতে মাত্র পাঁচ বছরে স্বাভাবিক পথে কারও পক্ষে কোটিপতি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দেখা যায় শুধু কোটি নন, তাদের কেউ কেউ শত কোটি টাকারও মালিক হয়ে যাচ্ছেন। তার মানে তারা হয় সরকারের নানা প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন অথবা এমপি পদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।

বহুদিন ধরেই এটা বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে রাজনীতি। যে কারণে এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান পদে জয়ী হওয়া তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই ভীষণ যুদ্ধ চলে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায় মনোনয়ন পেতে গিয়েই। কারণ বিগত বছরগুলোয় একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই জয় নিশ্চিত। আর জয়ী হলেই সুদে-আসলে সব টাকা উঠে আসবে। ফলে তারা যদি হলফনামায় স্বর্ণের ভরি এক হাজার টাকা কিংবা রাজধানীতে এটি প্লটের দাম চারশো টাকাও দেখানতা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতা হবে বটে, আখেরে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না। কেউ এর জন্য জবাবদিহি কিংবা বিচারের মুখোমুখিও হবেন না। কারণ টাকা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাই এখন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।