নিউ ইয়র্ক/কারাকাস – লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদুরোর ছবি প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তাকে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করে নিউ ইয়র্ক নিয়ে আসা হচ্ছে। মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মার্কিন আদালতে মাদুরোর বিচার করা হবে। এই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা ১৯৮৯ সালে পানামার নরিয়েগা বা ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে আটকের ঘটনার সাথে তুলনা করছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে মার্কিন ‘লাগামহীন ক্ষমতার’ নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এক চরম নাটকীয়তায় রূপ নিল। শুক্রবার রাতে (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর) মার্কিন বাহিনীর আচমকা হামলায় পতন ঘটল মাদুরো প্রশাসনের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঝটিকা পদক্ষেপ বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছে।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও ট্রাম্পের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোকে সস্ত্রীক হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার তথ্য শেয়ার করেছেন। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ, কোকেন আমদানি এবং অবৈধ মারণাস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯ শতকের ‘মনরো’ মতবাদ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের একক ‘প্রভাব অঞ্চল’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
নরিয়েগা ও সাদ্দাম হোসেনের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
১৯৮৯ সালে পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে মাদক পাচারের অভিযোগে তুলে নিয়ে গিয়ে যেভাবে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, মাদুরোর ক্ষেত্রেও একই ছক অনুসরণ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর এই প্রথম কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে সরাসরি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বন্দি করল যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য, নরিয়েগা এবং সাদ্দাম—দুজনই একসময় ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।
তেলের রাজনীতি ও নেপথ্য কারণ
মাদুরো দীর্ঘকাল ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন যে, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ দখল করা, যা বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে পারমাণবিক ডুবোজাহাজ মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই চাপ তৈরি করে আসছিল। যদিও মাদুরোর বিরুদ্ধে কলম্বিয়া থেকে মাদক পাচারের রুট হিসেবে ভেনেজুয়েলাকে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল, তবে সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে জ্বালানি স্বার্থকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে? মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলার পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেত্রী ও নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো বা এডমুন্ডো গঞ্জালেজের ক্ষমতা নেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী এখনো মাদুরোর অনুগত হওয়ায় গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে কিছুটা নীরব থাকলেও কারাকাসের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
রিপোর্টারের নাম 
























