ঢাকা ০৬:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

লাইটার জাহাজ মালিকরা ‘আওয়ামী সিন্ডিকেটের’ কাছে জিম্মি: ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

নদীপথে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম লাইটার কার্গো জাহাজ শিল্প এখনো আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, ওবায়দুল কাদের, সালমান এফ রহমান, আ জ ম নাছির ও হাসান মাহমুদ চক্রের দোসররা জাহাজ মালিকদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ডেমারেজ ও ভাড়া আত্মসাৎ করছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং বকেয়া আদায়ের দাবিতে জাহাজ মালিকরা ১০ দফা দাবি পেশ করেছেন; অন্যথায় সারা দেশে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত লাইটার জাহাজ খাতে এক ভয়াবহ অরাজকতা বিরাজ করছে। আওয়ামী শাসনামলের চিহ্নিত ‘রাঘব বোয়ালদের’ সিন্ডিকেট এখনো এই খাতকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ জাহাজ মালিকরা।

লাইটার কার্গো জাহাজ মালিকদের মতে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এবং তার ভাই খালেদ মাহমুদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গত ১৫ বছর ধরে এই খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হাজী শফিক আহমেদ নিজেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) কনভেনার ঘোষণা করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সহযোগিতায় এই ‘ভুয়া’ কমিটি গঠন করে জাহাজ মালিকদের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত লাইটার জাহাজ মালিকদের ডেমারেজ (ক্ষতিপূরণ) ও ভাড়া বাবদ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। এই টাকা পরিশোধ না করে সিন্ডিকেট সদস্যরা সেই অর্থ দিয়ে নিজেদের নামে নতুন জাহাজ তৈরি করছে এবং নীতিমালা অমান্য করে পণ্য পরিবহন করছে। এছাড়া, লাইটার জাহাজগুলোকে ‘ভাসমান গোডাউন’ হিসেবে মাসের পর মাস আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম পণ্য সংকট তৈরি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

ব্যবসায় টিকতে না পেরে এবং ব্যাংক লোনের দায়ে দেউলিয়া হয়ে এরই মধ্যে ৮০০ জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছেন মালিকরা। বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে তারা ১০টি দাবি জানিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • পণ্য পরিবহন নীতিমালা-২০২৪-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন।
  • ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের পণ্যের এজেন্ট সিন্ডিকেট বাতিল।
  • বকেয়া ২১১ কোটি টাকাসহ মোট ৫০০ কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধ।
  • জাহাজকে ভাসমান গোডাউন বানানো বন্ধ করা।
  • সমস্ত জাহাজকে নৌ-নীতিমালা অনুযায়ী সিরিয়ালভুক্ত করা।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (শিপিং) কমডোর মো. শফিউল বারী সিন্ডিকেট বজায় থাকার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্বে এবং অবৈধ টাকার প্রভাবে এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত বেলায়েত হোসেন ও শফিক আহমেদ বকেয়া টাকার কথা আংশিক স্বীকার করলেও পদ নিয়ে আন্দোলনের কথা জানিয়েছেন।

লাইটার জাহাজ খাতে শৃঙ্খলা না ফিরলে দেশের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মালিকদের দেওয়া হুমকি অনুযায়ী ২,৫০০ জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। তাই দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং বকেয়া টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে অবৈধ দখল উচ্ছেদ: যানজট ও ভোগান্তি কমাতে সিটি কর্পোরেশনের অভিযান

লাইটার জাহাজ মালিকরা ‘আওয়ামী সিন্ডিকেটের’ কাছে জিম্মি: ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

আপডেট সময় : ০১:২৪:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
নদীপথে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম লাইটার কার্গো জাহাজ শিল্প এখনো আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, ওবায়দুল কাদের, সালমান এফ রহমান, আ জ ম নাছির ও হাসান মাহমুদ চক্রের দোসররা জাহাজ মালিকদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ডেমারেজ ও ভাড়া আত্মসাৎ করছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং বকেয়া আদায়ের দাবিতে জাহাজ মালিকরা ১০ দফা দাবি পেশ করেছেন; অন্যথায় সারা দেশে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত লাইটার জাহাজ খাতে এক ভয়াবহ অরাজকতা বিরাজ করছে। আওয়ামী শাসনামলের চিহ্নিত ‘রাঘব বোয়ালদের’ সিন্ডিকেট এখনো এই খাতকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ জাহাজ মালিকরা।

লাইটার কার্গো জাহাজ মালিকদের মতে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এবং তার ভাই খালেদ মাহমুদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গত ১৫ বছর ধরে এই খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হাজী শফিক আহমেদ নিজেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) কনভেনার ঘোষণা করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সহযোগিতায় এই ‘ভুয়া’ কমিটি গঠন করে জাহাজ মালিকদের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত লাইটার জাহাজ মালিকদের ডেমারেজ (ক্ষতিপূরণ) ও ভাড়া বাবদ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। এই টাকা পরিশোধ না করে সিন্ডিকেট সদস্যরা সেই অর্থ দিয়ে নিজেদের নামে নতুন জাহাজ তৈরি করছে এবং নীতিমালা অমান্য করে পণ্য পরিবহন করছে। এছাড়া, লাইটার জাহাজগুলোকে ‘ভাসমান গোডাউন’ হিসেবে মাসের পর মাস আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম পণ্য সংকট তৈরি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

ব্যবসায় টিকতে না পেরে এবং ব্যাংক লোনের দায়ে দেউলিয়া হয়ে এরই মধ্যে ৮০০ জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছেন মালিকরা। বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে তারা ১০টি দাবি জানিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • পণ্য পরিবহন নীতিমালা-২০২৪-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন।
  • ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের পণ্যের এজেন্ট সিন্ডিকেট বাতিল।
  • বকেয়া ২১১ কোটি টাকাসহ মোট ৫০০ কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধ।
  • জাহাজকে ভাসমান গোডাউন বানানো বন্ধ করা।
  • সমস্ত জাহাজকে নৌ-নীতিমালা অনুযায়ী সিরিয়ালভুক্ত করা।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (শিপিং) কমডোর মো. শফিউল বারী সিন্ডিকেট বজায় থাকার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্বে এবং অবৈধ টাকার প্রভাবে এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত বেলায়েত হোসেন ও শফিক আহমেদ বকেয়া টাকার কথা আংশিক স্বীকার করলেও পদ নিয়ে আন্দোলনের কথা জানিয়েছেন।

লাইটার জাহাজ খাতে শৃঙ্খলা না ফিরলে দেশের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মালিকদের দেওয়া হুমকি অনুযায়ী ২,৫০০ জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। তাই দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং বকেয়া টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।