ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬-এর নির্বাচন: পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিএনপি-জামায়াতের শক্তিমত্তা

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের অভাবনীয় সব ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দিয়েছে। শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের রেকর্ড ভাঙা উপস্থিতি দেশের বৃহত্তম দল বিএনপির পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াতে ইসলামীও তাদের শক্তি ও জনসমর্থন বাড়িয়ে এখন একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে সক্রিয়। ৫ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিনে দেখা যাচ্ছে, লড়াই মূলত দ্বি-মুখী হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ২০২৫ সালের শেষ মাসটি ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য স্থান দখল করে নিয়েছে। একদিকে তারেক রহমানের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই ঘটনা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এক নজিরবিহীন আবেগীয় জোয়ার তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জনস্রোত আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচনী ময়দানের বর্তমান চিত্র ও প্রার্থীদের পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে বড় দলগুলোর চিত্র নিম্নরূপ:

  • বিএনপি: ৩৩১ জন (বিদ্রোহী প্রার্থীসহ)।
  • জামায়াতে ইসলামী: ২৭৬ জন।
  • জাতীয় পার্টি: ২২৪ জন।
  • ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ২৬৮ জন।
  • জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): ৪৪ জন।
  • গণঅধিকার পরিষদ: ১০৪ জন।

৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বাছাইপর্বে মাহমুদুর রহমান মান্না ও হামিদুর রহমান আযাদের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা:
দীর্ঘ দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। শুরুর দিকে যে আস্থার জায়গাটি ছিল, তা এখন ম্লান হয়ে আসছে। ফলে জনগণ যত দ্রুত সম্ভব একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক্ষায় রয়েছে।

জাতীয় সরকার বনাম একক ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা:
জুলাই বিপ্লবের পর ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের যে প্রস্তাব জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, বিএনপি তা থেকে এখন অনেকটাই দূরে সরে এসেছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। ফলে জামায়াতের সাথে দীর্ঘদিনের জোটবদ্ধ রাজনীতির যে সম্পর্ক ছিল, তাতে বড় ফাটল ধরেছে। জামায়াত ও অন্যান্য ছোট দলগুলো এখনও সর্বদলীয় সরকারের কথা বললেও বিএনপি এখন একক আধিপত্যের দিকেই বেশি মনোযোগী।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: কার পাল্লা ভারী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এই আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব নির্বাচনে ভোটারদের বিভাজন তৈরি করবে। জামায়াতের ওপর চালানো বিগত সরকারের নিপীড়ন তাদের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়িয়েছে, যা তাদের ভোটের হার বৃদ্ধি করবে। তবে বর্তমান জনস্রোত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের বিমা সুবিধা দিতে ন্যাশনাল ব্যাংক ও ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চুক্তি

২০২৬-এর নির্বাচন: পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিএনপি-জামায়াতের শক্তিমত্তা

আপডেট সময় : ১২:৫৪:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের অভাবনীয় সব ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দিয়েছে। শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের রেকর্ড ভাঙা উপস্থিতি দেশের বৃহত্তম দল বিএনপির পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াতে ইসলামীও তাদের শক্তি ও জনসমর্থন বাড়িয়ে এখন একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে সক্রিয়। ৫ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিনে দেখা যাচ্ছে, লড়াই মূলত দ্বি-মুখী হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ২০২৫ সালের শেষ মাসটি ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য স্থান দখল করে নিয়েছে। একদিকে তারেক রহমানের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই ঘটনা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এক নজিরবিহীন আবেগীয় জোয়ার তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জনস্রোত আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচনী ময়দানের বর্তমান চিত্র ও প্রার্থীদের পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে বড় দলগুলোর চিত্র নিম্নরূপ:

  • বিএনপি: ৩৩১ জন (বিদ্রোহী প্রার্থীসহ)।
  • জামায়াতে ইসলামী: ২৭৬ জন।
  • জাতীয় পার্টি: ২২৪ জন।
  • ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ২৬৮ জন।
  • জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): ৪৪ জন।
  • গণঅধিকার পরিষদ: ১০৪ জন।

৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বাছাইপর্বে মাহমুদুর রহমান মান্না ও হামিদুর রহমান আযাদের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা:
দীর্ঘ দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। শুরুর দিকে যে আস্থার জায়গাটি ছিল, তা এখন ম্লান হয়ে আসছে। ফলে জনগণ যত দ্রুত সম্ভব একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক্ষায় রয়েছে।

জাতীয় সরকার বনাম একক ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা:
জুলাই বিপ্লবের পর ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের যে প্রস্তাব জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, বিএনপি তা থেকে এখন অনেকটাই দূরে সরে এসেছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। ফলে জামায়াতের সাথে দীর্ঘদিনের জোটবদ্ধ রাজনীতির যে সম্পর্ক ছিল, তাতে বড় ফাটল ধরেছে। জামায়াত ও অন্যান্য ছোট দলগুলো এখনও সর্বদলীয় সরকারের কথা বললেও বিএনপি এখন একক আধিপত্যের দিকেই বেশি মনোযোগী।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: কার পাল্লা ভারী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এই আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব নির্বাচনে ভোটারদের বিভাজন তৈরি করবে। জামায়াতের ওপর চালানো বিগত সরকারের নিপীড়ন তাদের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়িয়েছে, যা তাদের ভোটের হার বৃদ্ধি করবে। তবে বর্তমান জনস্রোত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে।