ভেনেজুয়েলায় হামলা ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘকালীন সামরিক হস্তক্ষেপ ও অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। শীতলযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ওয়াশিংটন বারবার এই অঞ্চলে বলপ্রয়োগ বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল ঘটিয়েছে।
মাদুরো ও তার পূর্বসূরি হুগো শ্যাভেজ দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগ তুলে আসছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপগুলোর একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
গুয়াতেমালা ও কিউবা: ১৯৫০ ও ৬০–এর দশক
১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেঞ্জ গুজম্যানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ওয়াশিংটন ভাড়াটে সেনা পাঠিয়েছিল। মার্কিন কোম্পানি ইউনাইটেড ফ্রুট কর্পোরেশন–এর স্বার্থ রক্ষায় চালানো সেই অভিযানে সিআইএ–এর ভূমিকার কথা ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ১৯৬১ সালে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে সিআইএ–এর প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা বে অব পিগস–এ অবতরণ করে ব্যর্থ হয়, যাতে প্রাণ হারায় দুই শতাধিক মানুষ।
স্বৈরশাসকদের মদত ও অপারেশন কনডর
সত্তরের দশকে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থি আন্দোলন দমাতে চিলির অগাস্তো পিনোশে এবং আর্জেন্টিনার জান্তা সরকারের মতো একাধিক সামরিক স্বৈরশাসককে সরাসরি সমর্থন দেয় ওয়াশিংটন। মার্কিন নথিতে দেখা গেছে, চিলিতে সালভাদর আলেন্দেকে হটাতে পিনোশেকে এবং আর্জেন্টিনায় ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে জান্তাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। ওই সময় লাতিন আমেরিকার ছয়টি একনায়কতান্ত্রিক দেশ (আর্জেন্টিনা, চিলি, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও ব্রাজিল) ঐক্যবদ্ধ হয়ে বামপন্থিদের নির্মূল করতে ‘অপারেশন কনডর’ পরিচালনা করে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সমর্থন ছিল।
আশির দশকের রক্তাক্ত সংঘাত
১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়ায় সান্দিনিস্তা বিদ্রোহের পর প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান সিআইএকে গোপনে ২০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেন, যা ‘কন্ট্রা’ বিদ্রোহীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এই গৃহযুদ্ধে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। একই সময় এল সালভাদরের বিদ্রোহ দমাতেও সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছিলেন রেগান, যেখানে নিহত হন ৭২ হাজার মানুষ। এছাড়া ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডায় অপারেশন আর্জেন্ট ফিউরি চালিয়ে কয়েকশ‘ মানুষের মৃত্যু ঘটায় মার্কিন মেরিন সেনারা।
পানামা অভিযান: নোরিয়েগার পতন
১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পানামায় সামরিক হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেন। ২৭ হাজার মার্কিন সেনার এই অপারেশন জাস্ট কজ–এ সরকারিভাবে ৫০০ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হলেও বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটি কয়েক হাজার। এই অভিযানের মাধ্যমে জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়, যেখানে মাদক চোরাচালানের দায়ে দুই দশকের বেশি সময় তিনি কারাগারে ছিলেন।
মাদুরোর বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক নোরিয়েগা বা সাদ্দাম হোসেনের পরিণতির সঙ্গে তুলনা করছেন, যা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ হস্তক্ষেপের ইতিহাসেরই নতুন সংযোজন।
রিপোর্টারের নাম 

























