ঢাকা ১০:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান: আন্তর্জাতিক আইনের ‘কফিনে শেষ পেরেক’

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে নাটকীয় এক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করেছে মার্কিন বিশেষ বাহিনী। শনিবার ভোরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর লাতিন আমেরিকায় এটিই সবচেয়ে বড় সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশ্ববিষয়ক সাংবাদিক জো ইনউড এই অভিযানকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, মার্কিন বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স কারাকাসের প্রাণকেন্দ্রে ঢুকে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে আসার ঘটনা আগে কখনও দেখা যায়নি। এর আগে ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করার ঘটনার সঙ্গে এর মিল থাকলেও, মাদুরোর ক্ষেত্রে প্রথাগত কোনও স্থল যুদ্ধ ছাড়াই এই উচ্চাভিলাষী মিশন সফল করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে নোরিয়েগাকে ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার পর রক মিউজিক বাজিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়েছিল। মাদুরোর ক্ষেত্রেও একই পরিণতির শঙ্কা করা হচ্ছে, মার্কিন কোনও কারাগারে তার ঠাঁই হতে পারে।

কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক সুলতান বারাকাত এই অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, এটি সম্ভবত যেকোনও আন্তর্জাতিক আইনের কফিনে শেষ পেরেক। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নীতি এখন তছনছ হয়ে গেছে।

বারাকাত সতর্ক করে বলেন, ইরাকে সরকার পরিবর্তনের মার্কিন চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা চীনকে তাইওয়ানের ওপর একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার অজুহাত করে দিতে পারে। তার মতে, ইসরায়েল যেভাবে লেবানন ও ইরানে অভিযান চালাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই মানদণ্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেলো, যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থি।

ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর বিরুদ্ধে একটি অপরাধী মাদক পাচারকারী চক্র চালানোর অভিযোগ এনেছে, যদিও মাদুরো বরাবরই তা অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার অজুহাতে ওয়াশিংটন তাকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছিল। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা সরকারের দাবি, দেশটির বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ দখল করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই আক্রমণ চালিয়েছে।

বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকা সংবাদদাতা ইয়ন ওয়েলস জানিয়েছেন, মাদুরোর অপসারণকে ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থিরা বড় জয় হিসেবে দেখলেও ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল। মার্কিন হস্তক্ষেপের সমর্থকরা আশা করছেন, নোবেলজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো বা ২০২৪ সালের বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হবে।

তবে সরেজমিনের চিত্র ভিন্ন হতে পারে। ভেনেজুয়েলার সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী এখন পর্যন্ত মাদুরোর প্রতি অনুগত। সমালোচকদের ভয়, সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। মাদুরোর সহযোগীরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অনভিজ্ঞ নিউজিল্যান্ডের সামনে অভিজ্ঞ বাংলাদেশ: সিরিজ জয়ে আত্মবিশ্বাসী টাইগাররা

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান: আন্তর্জাতিক আইনের ‘কফিনে শেষ পেরেক’

আপডেট সময় : ০৫:২৩:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে নাটকীয় এক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করেছে মার্কিন বিশেষ বাহিনী। শনিবার ভোরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর লাতিন আমেরিকায় এটিই সবচেয়ে বড় সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশ্ববিষয়ক সাংবাদিক জো ইনউড এই অভিযানকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, মার্কিন বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স কারাকাসের প্রাণকেন্দ্রে ঢুকে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে আসার ঘটনা আগে কখনও দেখা যায়নি। এর আগে ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করার ঘটনার সঙ্গে এর মিল থাকলেও, মাদুরোর ক্ষেত্রে প্রথাগত কোনও স্থল যুদ্ধ ছাড়াই এই উচ্চাভিলাষী মিশন সফল করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে নোরিয়েগাকে ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার পর রক মিউজিক বাজিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়েছিল। মাদুরোর ক্ষেত্রেও একই পরিণতির শঙ্কা করা হচ্ছে, মার্কিন কোনও কারাগারে তার ঠাঁই হতে পারে।

কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক সুলতান বারাকাত এই অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, এটি সম্ভবত যেকোনও আন্তর্জাতিক আইনের কফিনে শেষ পেরেক। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নীতি এখন তছনছ হয়ে গেছে।

বারাকাত সতর্ক করে বলেন, ইরাকে সরকার পরিবর্তনের মার্কিন চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা চীনকে তাইওয়ানের ওপর একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার অজুহাত করে দিতে পারে। তার মতে, ইসরায়েল যেভাবে লেবানন ও ইরানে অভিযান চালাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই মানদণ্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেলো, যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থি।

ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর বিরুদ্ধে একটি অপরাধী মাদক পাচারকারী চক্র চালানোর অভিযোগ এনেছে, যদিও মাদুরো বরাবরই তা অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার অজুহাতে ওয়াশিংটন তাকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছিল। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা সরকারের দাবি, দেশটির বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ দখল করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই আক্রমণ চালিয়েছে।

বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকা সংবাদদাতা ইয়ন ওয়েলস জানিয়েছেন, মাদুরোর অপসারণকে ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থিরা বড় জয় হিসেবে দেখলেও ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল। মার্কিন হস্তক্ষেপের সমর্থকরা আশা করছেন, নোবেলজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো বা ২০২৪ সালের বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হবে।

তবে সরেজমিনের চিত্র ভিন্ন হতে পারে। ভেনেজুয়েলার সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী এখন পর্যন্ত মাদুরোর প্রতি অনুগত। সমালোচকদের ভয়, সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। মাদুরোর সহযোগীরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা