ঢাকা ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালেই কি লন্ডনে ফিরছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শামীমা?

২০২৬ সালের শুরুতেই এক চরম আইনি ও রাজনৈতিক নাটকীয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতর (হোম অফিস)। গত সাত বছর ধরে শামীমা বেগমকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার যে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা, তা এখন আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (ইসিএইচআর) এমন কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা ব্রিটিশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। টাওয়ার হ্যামলেটসের সেই স্কুলছাত্রীর মামলাটি এখন কেবল জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি লাখো অভিবাসী নাগরিকের নাগরিকত্বের অধিকার রক্ষার এক অগ্নিপরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

নাগরিকত্ব হরণে ‘বাংলাদেশি শেকড়’ ব্যবহার

শামীমা বেগমের এই দীর্ঘ নির্বাসনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে তার পৈতৃক পরিচয়। পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে বেড়ে ওঠা শামীমা ছিলেন বেথনাল গ্রিন অ্যাকাডেমির (বর্তমান মালবেরি অ্যাকাডেমি শোরডিচ) ছাত্রী। তার শৈশবকৈশোর কেটেছে লন্ডনের আলোবাতাসে। কিন্তু ২০১৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ যখন তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেন, তখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল শামীমার পারিবারিক ইতিহাসকে।

শামীমার বাবার বাড়ি বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়। ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি ছিল, যেহেতু তার মাবাবা বাংলাদেশি, তাই শামীমা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের দাবিদার। এই ‘সুনামগঞ্জ কানেকশন’ ব্যবহার করেই তাকে রাষ্ট্রহীন করার দায় এড়াতে চেয়েছিল ব্রিটেন। কার্যত, একটি ব্রিটিশ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের দায়ভার বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার এই চতুর কৌশল শুরু থেকেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত ও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে, শামীমা কখনোই বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না এবং তাকে দেশে ঢুকতে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

২০২৬ সালে আইনি মোড়: অপরাধী নাকি পাচারের শিকার?

দীর্ঘ সাত বছর সিরিয়ার আলরোজ ক্যাম্পে বন্দি থাকা শামীমার বয়স এখন ২৬। পাকিস্তানি অভিবাসী পরিবারের সন্তান ও বর্তমান ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই নির্বাসনকে ‘দৃঢ়ভাবে’ সমর্থন করলেও, ২০২৬ সালে এসে আন্তর্জাতিক আইনি হাওয়া ভিন্ন দিকে বইতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এখন খতিয়ে দেখছে যে, ১৫ বছরের একটি শিশুকে যখন আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র প্রলোভন দেখিয়ে সিরিয়ায় নিয়ে গেলো, তখন ব্রিটিশ রাষ্ট্র কেন তাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলো?

আইনজীবীদের মতে, শুধু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে একজন জন্মগত ব্রিটিশ নাগরিককে এভাবে মরুভূমির ক্যাম্পে ফেলে রাখা যায় না। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই মামলার একটি চূড়ান্ত রায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি প্রমাণিত হয় যে শামীমা মানবপাচারের শিকার হয়েছিলেন, তবে ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব বাতিলের সেই আদেশ অবৈধ হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য হয়েই শামীমাকে লন্ডনে ফিরিয়ে এনে ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করতে হবে।

অভিবাসী সমাজে শঙ্কা

শামীমার মামলাটি ব্রিটেনের বিশেষত লাখো নাগরিকের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের পারিবারিক সম্পর্ককে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে যদি একজন ব্রিটিশ নাগরিকের অধিকার হরণ করা যায়, তবে ব্রিটিশবাংলাদেশিসহ লাখো মুসলিম অভিবাসীর নিরাপত্তা ও পরিচয়ের ভিত্তি নড়বড়ে হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

২০২৬ সালে এসে মানবাধিকার কর্মীরা সোচ্চার হয়ে বলছেন, নাগরিকত্ব কোনও রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, বরং একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। সিলেটের সুনামগঞ্জ থেকে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস—এই সুদীর্ঘ আইনি ও আবেগীয় টানাপোড়েনের অবসান হয়তো এই বছরই হতে যাচ্ছে। শামীমার ফেরার পথ এখন রাজনীতির গোলকধাঁধায় নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের সঠিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন

২০২৬ সালেই কি লন্ডনে ফিরছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শামীমা?

আপডেট সময় : ০১:৫৩:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৬ সালের শুরুতেই এক চরম আইনি ও রাজনৈতিক নাটকীয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতর (হোম অফিস)। গত সাত বছর ধরে শামীমা বেগমকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার যে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা, তা এখন আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (ইসিএইচআর) এমন কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা ব্রিটিশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। টাওয়ার হ্যামলেটসের সেই স্কুলছাত্রীর মামলাটি এখন কেবল জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি লাখো অভিবাসী নাগরিকের নাগরিকত্বের অধিকার রক্ষার এক অগ্নিপরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

নাগরিকত্ব হরণে ‘বাংলাদেশি শেকড়’ ব্যবহার

শামীমা বেগমের এই দীর্ঘ নির্বাসনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে তার পৈতৃক পরিচয়। পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে বেড়ে ওঠা শামীমা ছিলেন বেথনাল গ্রিন অ্যাকাডেমির (বর্তমান মালবেরি অ্যাকাডেমি শোরডিচ) ছাত্রী। তার শৈশবকৈশোর কেটেছে লন্ডনের আলোবাতাসে। কিন্তু ২০১৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ যখন তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেন, তখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল শামীমার পারিবারিক ইতিহাসকে।

শামীমার বাবার বাড়ি বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়। ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি ছিল, যেহেতু তার মাবাবা বাংলাদেশি, তাই শামীমা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের দাবিদার। এই ‘সুনামগঞ্জ কানেকশন’ ব্যবহার করেই তাকে রাষ্ট্রহীন করার দায় এড়াতে চেয়েছিল ব্রিটেন। কার্যত, একটি ব্রিটিশ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের দায়ভার বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার এই চতুর কৌশল শুরু থেকেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত ও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে, শামীমা কখনোই বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না এবং তাকে দেশে ঢুকতে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

২০২৬ সালে আইনি মোড়: অপরাধী নাকি পাচারের শিকার?

দীর্ঘ সাত বছর সিরিয়ার আলরোজ ক্যাম্পে বন্দি থাকা শামীমার বয়স এখন ২৬। পাকিস্তানি অভিবাসী পরিবারের সন্তান ও বর্তমান ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই নির্বাসনকে ‘দৃঢ়ভাবে’ সমর্থন করলেও, ২০২৬ সালে এসে আন্তর্জাতিক আইনি হাওয়া ভিন্ন দিকে বইতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এখন খতিয়ে দেখছে যে, ১৫ বছরের একটি শিশুকে যখন আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র প্রলোভন দেখিয়ে সিরিয়ায় নিয়ে গেলো, তখন ব্রিটিশ রাষ্ট্র কেন তাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলো?

আইনজীবীদের মতে, শুধু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে একজন জন্মগত ব্রিটিশ নাগরিককে এভাবে মরুভূমির ক্যাম্পে ফেলে রাখা যায় না। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই মামলার একটি চূড়ান্ত রায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি প্রমাণিত হয় যে শামীমা মানবপাচারের শিকার হয়েছিলেন, তবে ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব বাতিলের সেই আদেশ অবৈধ হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য হয়েই শামীমাকে লন্ডনে ফিরিয়ে এনে ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করতে হবে।

অভিবাসী সমাজে শঙ্কা

শামীমার মামলাটি ব্রিটেনের বিশেষত লাখো নাগরিকের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের পারিবারিক সম্পর্ককে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে যদি একজন ব্রিটিশ নাগরিকের অধিকার হরণ করা যায়, তবে ব্রিটিশবাংলাদেশিসহ লাখো মুসলিম অভিবাসীর নিরাপত্তা ও পরিচয়ের ভিত্তি নড়বড়ে হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

২০২৬ সালে এসে মানবাধিকার কর্মীরা সোচ্চার হয়ে বলছেন, নাগরিকত্ব কোনও রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, বরং একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। সিলেটের সুনামগঞ্জ থেকে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস—এই সুদীর্ঘ আইনি ও আবেগীয় টানাপোড়েনের অবসান হয়তো এই বছরই হতে যাচ্ছে। শামীমার ফেরার পথ এখন রাজনীতির গোলকধাঁধায় নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের সঠিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে।