ঢাকা ০৯:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

খালেদা-হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির চার দশকের একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। গত বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় সাধারণ মানুষের যে বিশাল ঢল নেমেছিল, তা কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং তাঁর প্রতি জনগণের গভীর সহানুভূতি ও শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ কারাবাস এবং অসুস্থতার কারণে রাজনীতির মঞ্চ থেকে তাঁর বিদায় সাধারণ মানুষের মনে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দলমত নির্বিশেষে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জানাজার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল চড়াই-উতরাইয়ে পূর্ণ। ১৯৮২ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিপর্যস্ত বিএনপির হাল ধরেন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে তাঁর উত্থান এবং পরবর্তীকালে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা তাঁকে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। তবে তাঁর এই লম্বা সময়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এই ‘দুই নেত্রীর’ বৈরিতামূলক সম্পর্কই গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল গতিপথ নির্ধারণ করেছে। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দুই নেত্রীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও পরবর্তীতে তা চরম তিক্ততা ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর।

বেগম জিয়ার শাসনামল নিয়ে যেমন সমালোচনা রয়েছে, তেমনি তাঁর উত্তরসূরি শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী মত দমনের তীব্র অভিযোগও রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অপারেশন ক্লিনহার্ট ও র‍্যাব গঠন নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে মামলা-হামলায় পর্যুদস্ত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালে কারাবরণ করতে হয়। বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রতিহিংসার রাজনীতির এক চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, যা শেষ পর্যন্ত চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর শাসনের অবসান ঘটায়। তবে খালেদা জিয়া তাঁর মার্জিত আচরণ ও সহনশীলতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দ্বিদলীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন আবির্ভূত হয়েছে তাদের একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো আবারও দুই ধারায় বিভক্ত হচ্ছে। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, খালেদা জিয়া যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, তাঁর সেই আদর্শই ভবিষ্যতে দলটিকে পথ দেখাবে। একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দীর্ঘকাল অম্লান থাকবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আবারও সরকারি ছুটি ফিরছে ৭ নভেম্বর: পালিত হবে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’

খালেদা-হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি

আপডেট সময় : ০১:২৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির চার দশকের একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। গত বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় সাধারণ মানুষের যে বিশাল ঢল নেমেছিল, তা কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং তাঁর প্রতি জনগণের গভীর সহানুভূতি ও শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ কারাবাস এবং অসুস্থতার কারণে রাজনীতির মঞ্চ থেকে তাঁর বিদায় সাধারণ মানুষের মনে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দলমত নির্বিশেষে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জানাজার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল চড়াই-উতরাইয়ে পূর্ণ। ১৯৮২ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিপর্যস্ত বিএনপির হাল ধরেন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে তাঁর উত্থান এবং পরবর্তীকালে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা তাঁকে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। তবে তাঁর এই লম্বা সময়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এই ‘দুই নেত্রীর’ বৈরিতামূলক সম্পর্কই গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল গতিপথ নির্ধারণ করেছে। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দুই নেত্রীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও পরবর্তীতে তা চরম তিক্ততা ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর।

বেগম জিয়ার শাসনামল নিয়ে যেমন সমালোচনা রয়েছে, তেমনি তাঁর উত্তরসূরি শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী মত দমনের তীব্র অভিযোগও রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অপারেশন ক্লিনহার্ট ও র‍্যাব গঠন নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে মামলা-হামলায় পর্যুদস্ত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালে কারাবরণ করতে হয়। বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রতিহিংসার রাজনীতির এক চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, যা শেষ পর্যন্ত চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর শাসনের অবসান ঘটায়। তবে খালেদা জিয়া তাঁর মার্জিত আচরণ ও সহনশীলতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে একটি স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দ্বিদলীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন আবির্ভূত হয়েছে তাদের একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো আবারও দুই ধারায় বিভক্ত হচ্ছে। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, খালেদা জিয়া যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, তাঁর সেই আদর্শই ভবিষ্যতে দলটিকে পথ দেখাবে। একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দীর্ঘকাল অম্লান থাকবে।