সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও’র একটা সিনেমা মুক্তি পায়। সিনেমার নাম ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’। যেখানে একজন মানুষের গল্প বলা হয়েছে, প্রতিনিয়ত যাকে একটার পর একটা সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
গাজা উপত্যকার সানা ইসা হয়তো জানেন না, তার মতো অসংখ্য গাজাবাসীর জীবনের সঙ্গে মিলে যায় এমন একটা গল্প নিয়ে একটা সিনেমা তৈরি হয়েছে, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও সেই সিনেমায় অভিনয়ও করেছেন। তিনি যখন তার তাঁবুতে বসে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার দুর্ভিক্ষে বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছেন, তখন হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে কেউ তার জীবনের নির্মম বাস্তবতা উপভোগ করছে।
সানা যখন আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলছেন, ওই সময় তিনি মূলত শরণার্থী শিবিরের একটা তাঁবুতে বৃষ্টিতে ভেজা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত হলেও নতুন বছরের প্রাক্কালে সানার কণ্ঠে তেমন আশাবাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে না।
তিনি হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন, ‘একদিকে শীত, আরেক দিকে যুদ্ধ। অন্যদিকে দৈনন্দিন ক্ষুধা, কোনটার জন্য কাকে দোষ দেবো, বুঝি না। আমরা যেন এক সংকট থেকে মুক্ত হয়ে অন্য কোনও সংকটে পড়ছি। সংকট আর শেষ হচ্ছে না।’
যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পর যখন ফিলিস্তিনিদের নতুন করে তাদের জীবন পুনর্গঠন ও উন্নততর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, ক্রমবর্ধমান মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে তারা এখন শুধুই বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। তাদের মূল চাহিদা এখন খাদ্য, পানি, মাথা গোজার স্থায়ী আবাস, চিকিৎসা ও ক্রমাগত বোমা হামলার মধ্যে একটু নিরাপত্তার ঠাই।
যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া সানা। ছবি: আল-জাজিরা
সাত সন্তানের মা সানা (৪১) ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইসরায়েলি হামলায় তার স্বামীকে হারান। তার পর থেকেই তার প্রধান সংগ্রাম হয়ে ওঠে প্রতিদিন এক কেজি ময়দা সংগ্রহ করা। প্রতিদিনের জন্য এক টুকরো রুটি সন্তানদের মুখে তুলে দিতে পারাই হয়ে ওঠে তার জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। একসময় তাকে মার্কিন ত্রাণ সহায়তা কেন্দ্র জিএইচএফে মৃত্যু ঝুঁকি মাথায় নিয়েই যাওয়া শুরু করতে হয়। এই সহায়তাকেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সানা ও তার মেয়েও একবার আহত হন। পরে তিনি একাই যেতে শুরু করেন। কারণ এত ঝুঁকি সত্ত্বেও ক্ষুধার কষ্ট নিবারণ তাকে করতেই হতো। কখনও কখনও যখন কয়েক কেজি ময়দা পান, তখন সেটাই হয়ে ওঠে উৎসবের উপলক্ষ।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে যে ৭১ হাজার ২৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, সানার স্বামী ছিলেন তাদের একজন। ২০ বছর বয়সী বাতুল আল শয়িশের ঘটনা আরও করুণ। তিনিও একই যুদ্ধের ভুক্তভোগী, যিনি তার বাবা, মা, দুই ভাই এবং দুই বোনসহ পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন।
ঘটনাটা ঘটেছে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই, একেবারে বছরের শেষদিকে। তারা পূর্বের বাড়ি থেকে পালিয়ে নুসেইরাত শরণার্থী ক্যাম্পের যে বাড়িটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটি হঠাৎ বোমাবর্ষণের শিকার হয়।
সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বাতুল বলেছেন, তিনি তখন দুই বোনের সঙ্গে বসেছিলেন। তার বাবা বাইরে থেকে ফিরেছেন, মা রান্না করছিলেন। হঠাৎ সবকিছু অন্ধকার আর ধূলোয় ঢেকে যায়। তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে ছিলেন এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন।
হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তার মা ও ভাইবোনেরা বেঁচে নেই। বাবা ছিলেন আইসিইউতে। তিনি প্রতিদিন বাবার কানে ফিসফিস করে ডাকতেন, জেগে ওঠার অনুরোধ করতেন। কিন্তু তিন দিন পর বাবাও মারা যান।
বাতুল বলেন, ‘আমার বাবা-মা আর ভাইবোনেরা ছিলেন আমার পৃথিবী। তারা একে অপরকে খুব ভালোবাসতেন। আমরা যুদ্ধের মধ্যেও একসঙ্গে হাসতাম, গল্প করতাম, একে অপরকে শক্তি দিতাম।’
তার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও কেন তাদের বাড়ি লক্ষ্যবস্তু হলো? এটা কি ধরণের যুদ্ধবিরতি? আমরা ভেবেছিলাম বেঁচে গেছি, যুদ্ধ শেষ। কিন্তু তারা আমার পরিবারকেই কেড়ে নিলো।
বাতুল এখন চাচার সঙ্গে থাকেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া বিষয় নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। শেষের দিকে তিনি বলেন, ‘পরিবার ছাড়া বেঁচে থাকা মূলত ভগ্ন হৃদয়ে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার মতোই, যা এখন অনেক ফিলিস্তিনিদের জন্যই বাস্তবতা।’
আল-জাজিরা অবলম্বনে।
রিপোর্টারের নাম 
























