ঢাকা ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অস্থিরতা সত্ত্বেও আশার আলো দেখিয়েছে রেমিট্যান্স

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২৩:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে
২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ছিল সংস্কার ও সংকটের এক জটিল আবর্তে। একদিকে নজিরবিহীন খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে নেওয়া হয়েছে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

২০২৫ সাল বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সংঘাতময় ও পরিবর্তনশীল বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে ব্যাংক দখল, ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থপাচারের মতো বিষয়গুলো জনসমক্ষে আসতে শুরু করে। ব্যাংকিং খাতের এই ভঙ্গুর দশা কাটাতে এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বছরজুড়ে নানা কঠোর ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ ও গ্রাহক অসন্তোষ:
বিগত সরকারের আমলে লুটপাটের শিকার হওয়া শরিয়াভিত্তিক পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়। এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। তবে এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে বছরজুড়েই বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা ফেরত না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। পাশাপাশি আইনি জটিলতায় শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজি শূন্য হয়ে পড়ায় তারা রাজপথে আন্দোলনে নামেন, যা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

খেলাপি ঋণের বিশ্ব রেকর্ড ও প্রকৃত চিত্র:
২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে খেলাপি ঋণের আকাশচুম্বী পরিমাণ। বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ। অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেওয়া অনিয়মিত ঋণগুলোকে এখন আর কৃত্রিমভাবে নিয়মিত দেখানোর সুযোগ না থাকায় ঋণের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

রেমিট্যান্সে গতি ও ডলার বাজারের স্থিতিশীলতা ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলার বিপরীতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স ছিল অর্থনীতির জন্য একমাত্র স্বস্তির খবর। ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬.৭ শতাংশ বেশি। এই ইতিবাচক প্রবাহের কারণে ডলারের বাজার ১২২-১২৩ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। বছরের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া অর্থনীতির অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও নতুন আইনি সংস্কার:
দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং উচ্চ সুদহারের কৌশল অবলম্বন করে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমে এলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় খুব একটা সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। এদিকে, গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ’ পাস করা হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে বিমা সুবিধার আওতায় গ্রাহক এখন ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন, যা আগে ছিল ১ লাখ টাকা। এছাড়া ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণের সময়সীমা ৯০ দিন নির্ধারণের মাধ্যমে তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস ইরানের

২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অস্থিরতা সত্ত্বেও আশার আলো দেখিয়েছে রেমিট্যান্স

আপডেট সময় : ০১:২৩:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ছিল সংস্কার ও সংকটের এক জটিল আবর্তে। একদিকে নজিরবিহীন খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে নেওয়া হয়েছে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

২০২৫ সাল বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সংঘাতময় ও পরিবর্তনশীল বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে ব্যাংক দখল, ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থপাচারের মতো বিষয়গুলো জনসমক্ষে আসতে শুরু করে। ব্যাংকিং খাতের এই ভঙ্গুর দশা কাটাতে এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বছরজুড়ে নানা কঠোর ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ ও গ্রাহক অসন্তোষ:
বিগত সরকারের আমলে লুটপাটের শিকার হওয়া শরিয়াভিত্তিক পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়। এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। তবে এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে বছরজুড়েই বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা ফেরত না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। পাশাপাশি আইনি জটিলতায় শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজি শূন্য হয়ে পড়ায় তারা রাজপথে আন্দোলনে নামেন, যা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

খেলাপি ঋণের বিশ্ব রেকর্ড ও প্রকৃত চিত্র:
২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে খেলাপি ঋণের আকাশচুম্বী পরিমাণ। বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ। অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেওয়া অনিয়মিত ঋণগুলোকে এখন আর কৃত্রিমভাবে নিয়মিত দেখানোর সুযোগ না থাকায় ঋণের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

রেমিট্যান্সে গতি ও ডলার বাজারের স্থিতিশীলতা ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলার বিপরীতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স ছিল অর্থনীতির জন্য একমাত্র স্বস্তির খবর। ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬.৭ শতাংশ বেশি। এই ইতিবাচক প্রবাহের কারণে ডলারের বাজার ১২২-১২৩ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। বছরের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া অর্থনীতির অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও নতুন আইনি সংস্কার:
দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং উচ্চ সুদহারের কৌশল অবলম্বন করে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমে এলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় খুব একটা সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। এদিকে, গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ’ পাস করা হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে বিমা সুবিধার আওতায় গ্রাহক এখন ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন, যা আগে ছিল ১ লাখ টাকা। এছাড়া ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণের সময়সীমা ৯০ দিন নির্ধারণের মাধ্যমে তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।