ঢাকা ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যে ঘৃণার চাষবাস চলছেই

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:২৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

দীপু দাসের হত‍্যার হয়ে গেল এক সপ্তাহ’র বেশি। এর মাঝে হাদি হত‍্যা, কয়েকটি মিডিয়া হাউস, ছায়ানট, নালন্দা এবং উদীচীতে আগুন দেওয়া, তছনছ করাসহ অনেক কিছুই হয়েছে। বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো হয়ে ওঠছে আতঙ্কপুরী। বিশেষ করে নির্বাচিত ডাকসু, রাকসু সদস‍্যরা করছে একের পর এক তাণ্ডব। সবকিছু মিলে দীপু হত‍্যার বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে ছিল।

বলতে হবে, এটিকে আড়াল করা হয়েছে। কারণ দীপু একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ‍্যালঘু। তবে এই হত‍্যাকাণ্ডটির ধরন এবং পরবর্তীতে যা করা হয়েছে সেটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখবো? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ‘একদল উন্মত্ত লোক তাকে পিটিয়ে হত্যা করে তার বিবস্ত্র লাশটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। ‘ একবার ভেবে দেখুন শুধু তাকে পিটিয়ে হত‍্যা করেই তার প্রতি ক্ষোভ, আক্রোশ শেষ হয়নি। তাকে গাছে বাধা হয়েছে। তাতেও মিটেনি ক্রোধ। তারপর তার দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

এই হত‍্যা কেন খুব বেশি আলোচনায় আসেনি? রাষ্ট্র থেকে সমাজ- খুব অল্প সংখ‍্যক মানুষ এর বিচার চেয়েছেন, প্রতিক্রয়া জানিয়েছেন। দীপু হত‍্যার পেছনে কারণ দেখানো হয়েছে যে দীপু ধর্ম অবমাননা করেছেন। সুতরাং দীপুর মৃত‍্যুর ‘বৈধতা’তৈরি হয়ে গেছে। তাই এটি নিয়ে কোনও ধরনের হৈচৈ করা যাবে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনও সত্যতা পায়নি পুলিশ। যদিও পুলিশ ও র‍্যাব এ ঘটনায় ১০ জনকে আটক করেছে।

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে। সেটি হলো এই ‘ধর্ম অবমাননার’ সুর তুলে সংখ‍্যালঘুর ওপর আক্রমণ, হত‍্যা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা গত এক দশক ধরে বাংলাদেশে মোটামুটি আসন গেঁড়েছে। একই কায়দায় এই ধরনের বয়ানেই ব‍্যবহৃত হচ্ছে। দীপুর মতো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের বয়ানের কোনও সত‍্যতা পাওয়া যায় না, তাহলে এই ধরনের ‘ধর্ম অবমাননা’র মতো অস্তিত্বহীন কেচ্ছা কেন বারবার একেকজনের প্রাণ নিচ্ছে, হামলার ছুতা হয়ে ওঠছে? বিভিন্ন সরকারই এগুলো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি, তাহলে কীভাবে একটা বড় সময় ধরে এই ‘কারণ’ সামনে এনে এভাবে সংখ‍্যালঘুর ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে?

সরকার এই ঝোঁকের বিরুদ্ধে পাকা-পোক্ত ব‍্যবস্থা নিচ্ছেন না। সব সরকারই জানেন এবং জানতেন, কারা এগুলো করাচ্ছে এবং কেন করাচ্ছে? কিন্তু আসল কথা হলো সব সরকারই এগুলো ঘটতে দিয়েছেন এবং এখনও দিচ্ছেন।

হিসেবগুলো পরিষ্কার। বারবার কেন ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ সংখ‍্যালঘুর বিরুদ্ধে আনা হয়। এর স্পষ্ট কারণ হলো যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাষাবাদ আমরা বহুদিন করে আসছি, এখন সেগুলো ফসল হয়েই আসছে।

সংখ‍্যালঘুদের চাপের মধ‍্যে, ভয়ের মধ‍্যে রাখা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের দেশত‍্যাগে বাধ‍্য করা। এর পেছনের উদ্দেশ‍্য জমি দখল। জমির মালিকানা না থাকলেও পুরো সম্প্রদায়কে ভয়-ভীতির মধ‍্য দিয়ে রাখতে পারলে কাদের লাভ সেই হিসেবটি কষলেই কারা এগুলো বিরামহীনভাবে করছে তাদের পরিচয় এবং আদর্শ শনাক্ত করা কঠিন নয়। এখানে আরও মনে রাখা দরকার যে, শুধু নামই নয়, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, আদর্শ এবং এর পিছনের রাজনীতিটাও বোঝা খুব জরুরি।

যেভাবে দীপু হত‍্যা হাজির করা হয়েছে, সেই হিসেবে মনে হতে পারে এটি একটি অরাজনৈতিক এবং হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা। কিন্তু এটি একেবারেই রাজনৈতিক ঘটনা। এ রাজনীতি বাংলাদেশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা সংখ‍্যালঘুর ওপর সংখ‍্যাগুরুর ক্ষমতা জাহির এবং প্রদর্শনের রাজনীতি। কীভাবে এই রাজনীতির ডালপালা মেলছে? সরকার কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

আমরা ভুলে যাইনি যে গত বছর আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় যখন সংখ‍্যালঘুর ওপর নির্যাতন হয়েছিল তখন সরকারের ভেতর থাকা একাধিক ব্যক্তি সেটিকে সংখ‍্যালঘুর ওপর নিপীড়ন নয় বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন এটি রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে হেনস্থা। এই সব যুক্তি নিপীড়নকে সামাজিকভাবে ‘সহনীয়’ করে তুলেছে।

কিন্তু আমি সরকারকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই কোনও যুক্তি দিয়েই নিপীড়নকে বৈধ করা যায় না, এবং এর পক্ষে অবস্থান নেওয়া যায় না।

দীপু দাসের হত‍্যা নিয়ে ইতোমধ‍্যেই অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রথম বিষয় হলো কারখানাতেই যদি দীপু দাস মারধরের শিকান হন তাহলে মালিকপক্ষ পুলিশ ডাকলেন না কেন? তাকে কেন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘উত্তেজিত জনতা’র হাতে ছড়ে দেওয়া হলো? বাইরের মব কে সংগঠিত করলো? ভিতরের শ্রমিক এবং বাইরের মবের সঙ্গে সমন্বয়কারী কে? আর কীভাবে এত দ্রুত এটি সমন্বিত হলো? তার মানেই হলো এটি হয়তো পূর্ব পরিকল্পিত ছিল।

এখানে আরও কিছু বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার প্রথমে দীপু দাসের হত‍্যাকে যথাযথভাবে আমলে নেয়নি। তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে অন‍্য আরেকটি হত‍্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া হাদীকে নিয়েই সকলেই ব‍্যস্ত ছিলেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম এটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তখন সরকার কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। তারপরে ভারতে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ শুরু হলে তখন সরকার এই বিষয়ে ফিরে তাকান। দেরিতে হলেও দীপু দাসের বাড়িতে গিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টাসহ সরকারের কয়েকজন। কথা বলেছেন তার পরিবারের সদস‍্যদের সঙ্গে। আশ্বাস দিয়েছেন দীপু দাসের সন্তান এবং পরিবারের দায়িত্ব সরকারের।

কিন্তু যেটি করা গেলো না এখন পর্যন্ত সেটি হলো প্রায় দেড় যুগেরও অধিক সময়জুড়ে দাপুটে অবস্থান নিয়ে চলতে থাকা একই কায়দায় সংখ‍্যালঘুর ওপর আক্রমণের কৌশল। তবে ক্ষতি হচ্ছে দেশের। সবাই ভীত হচ্ছেন। তবে বেশি হচ্ছেন সংখ‍্যালঘুরা। কারণ তারা জেনে গেছেন, বুঝে গেছেন এই ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগের জাল থেকে তাদের মুক্তি ঘটছে না। তাই শঙ্কা, ভয় আর তটস্থতায় আছে সবাই। জানলেও কেউ যেন কিছুই জানছে না, বুঝলেও কেউই আর কিছু বুঝবে না।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়।

ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

যে ঘৃণার চাষবাস চলছেই

আপডেট সময় : ০৬:২৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

দীপু দাসের হত‍্যার হয়ে গেল এক সপ্তাহ’র বেশি। এর মাঝে হাদি হত‍্যা, কয়েকটি মিডিয়া হাউস, ছায়ানট, নালন্দা এবং উদীচীতে আগুন দেওয়া, তছনছ করাসহ অনেক কিছুই হয়েছে। বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো হয়ে ওঠছে আতঙ্কপুরী। বিশেষ করে নির্বাচিত ডাকসু, রাকসু সদস‍্যরা করছে একের পর এক তাণ্ডব। সবকিছু মিলে দীপু হত‍্যার বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে ছিল।

বলতে হবে, এটিকে আড়াল করা হয়েছে। কারণ দীপু একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ‍্যালঘু। তবে এই হত‍্যাকাণ্ডটির ধরন এবং পরবর্তীতে যা করা হয়েছে সেটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখবো? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ‘একদল উন্মত্ত লোক তাকে পিটিয়ে হত্যা করে তার বিবস্ত্র লাশটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। ‘ একবার ভেবে দেখুন শুধু তাকে পিটিয়ে হত‍্যা করেই তার প্রতি ক্ষোভ, আক্রোশ শেষ হয়নি। তাকে গাছে বাধা হয়েছে। তাতেও মিটেনি ক্রোধ। তারপর তার দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

এই হত‍্যা কেন খুব বেশি আলোচনায় আসেনি? রাষ্ট্র থেকে সমাজ- খুব অল্প সংখ‍্যক মানুষ এর বিচার চেয়েছেন, প্রতিক্রয়া জানিয়েছেন। দীপু হত‍্যার পেছনে কারণ দেখানো হয়েছে যে দীপু ধর্ম অবমাননা করেছেন। সুতরাং দীপুর মৃত‍্যুর ‘বৈধতা’তৈরি হয়ে গেছে। তাই এটি নিয়ে কোনও ধরনের হৈচৈ করা যাবে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনও সত্যতা পায়নি পুলিশ। যদিও পুলিশ ও র‍্যাব এ ঘটনায় ১০ জনকে আটক করেছে।

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে। সেটি হলো এই ‘ধর্ম অবমাননার’ সুর তুলে সংখ‍্যালঘুর ওপর আক্রমণ, হত‍্যা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা গত এক দশক ধরে বাংলাদেশে মোটামুটি আসন গেঁড়েছে। একই কায়দায় এই ধরনের বয়ানেই ব‍্যবহৃত হচ্ছে। দীপুর মতো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের বয়ানের কোনও সত‍্যতা পাওয়া যায় না, তাহলে এই ধরনের ‘ধর্ম অবমাননা’র মতো অস্তিত্বহীন কেচ্ছা কেন বারবার একেকজনের প্রাণ নিচ্ছে, হামলার ছুতা হয়ে ওঠছে? বিভিন্ন সরকারই এগুলো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি, তাহলে কীভাবে একটা বড় সময় ধরে এই ‘কারণ’ সামনে এনে এভাবে সংখ‍্যালঘুর ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে?

সরকার এই ঝোঁকের বিরুদ্ধে পাকা-পোক্ত ব‍্যবস্থা নিচ্ছেন না। সব সরকারই জানেন এবং জানতেন, কারা এগুলো করাচ্ছে এবং কেন করাচ্ছে? কিন্তু আসল কথা হলো সব সরকারই এগুলো ঘটতে দিয়েছেন এবং এখনও দিচ্ছেন।

হিসেবগুলো পরিষ্কার। বারবার কেন ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ সংখ‍্যালঘুর বিরুদ্ধে আনা হয়। এর স্পষ্ট কারণ হলো যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাষাবাদ আমরা বহুদিন করে আসছি, এখন সেগুলো ফসল হয়েই আসছে।

সংখ‍্যালঘুদের চাপের মধ‍্যে, ভয়ের মধ‍্যে রাখা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের দেশত‍্যাগে বাধ‍্য করা। এর পেছনের উদ্দেশ‍্য জমি দখল। জমির মালিকানা না থাকলেও পুরো সম্প্রদায়কে ভয়-ভীতির মধ‍্য দিয়ে রাখতে পারলে কাদের লাভ সেই হিসেবটি কষলেই কারা এগুলো বিরামহীনভাবে করছে তাদের পরিচয় এবং আদর্শ শনাক্ত করা কঠিন নয়। এখানে আরও মনে রাখা দরকার যে, শুধু নামই নয়, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, আদর্শ এবং এর পিছনের রাজনীতিটাও বোঝা খুব জরুরি।

যেভাবে দীপু হত‍্যা হাজির করা হয়েছে, সেই হিসেবে মনে হতে পারে এটি একটি অরাজনৈতিক এবং হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা। কিন্তু এটি একেবারেই রাজনৈতিক ঘটনা। এ রাজনীতি বাংলাদেশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা সংখ‍্যালঘুর ওপর সংখ‍্যাগুরুর ক্ষমতা জাহির এবং প্রদর্শনের রাজনীতি। কীভাবে এই রাজনীতির ডালপালা মেলছে? সরকার কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

আমরা ভুলে যাইনি যে গত বছর আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় যখন সংখ‍্যালঘুর ওপর নির্যাতন হয়েছিল তখন সরকারের ভেতর থাকা একাধিক ব্যক্তি সেটিকে সংখ‍্যালঘুর ওপর নিপীড়ন নয় বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন এটি রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে হেনস্থা। এই সব যুক্তি নিপীড়নকে সামাজিকভাবে ‘সহনীয়’ করে তুলেছে।

কিন্তু আমি সরকারকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই কোনও যুক্তি দিয়েই নিপীড়নকে বৈধ করা যায় না, এবং এর পক্ষে অবস্থান নেওয়া যায় না।

দীপু দাসের হত‍্যা নিয়ে ইতোমধ‍্যেই অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রথম বিষয় হলো কারখানাতেই যদি দীপু দাস মারধরের শিকান হন তাহলে মালিকপক্ষ পুলিশ ডাকলেন না কেন? তাকে কেন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘উত্তেজিত জনতা’র হাতে ছড়ে দেওয়া হলো? বাইরের মব কে সংগঠিত করলো? ভিতরের শ্রমিক এবং বাইরের মবের সঙ্গে সমন্বয়কারী কে? আর কীভাবে এত দ্রুত এটি সমন্বিত হলো? তার মানেই হলো এটি হয়তো পূর্ব পরিকল্পিত ছিল।

এখানে আরও কিছু বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার প্রথমে দীপু দাসের হত‍্যাকে যথাযথভাবে আমলে নেয়নি। তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে অন‍্য আরেকটি হত‍্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া হাদীকে নিয়েই সকলেই ব‍্যস্ত ছিলেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম এটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তখন সরকার কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। তারপরে ভারতে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ শুরু হলে তখন সরকার এই বিষয়ে ফিরে তাকান। দেরিতে হলেও দীপু দাসের বাড়িতে গিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টাসহ সরকারের কয়েকজন। কথা বলেছেন তার পরিবারের সদস‍্যদের সঙ্গে। আশ্বাস দিয়েছেন দীপু দাসের সন্তান এবং পরিবারের দায়িত্ব সরকারের।

কিন্তু যেটি করা গেলো না এখন পর্যন্ত সেটি হলো প্রায় দেড় যুগেরও অধিক সময়জুড়ে দাপুটে অবস্থান নিয়ে চলতে থাকা একই কায়দায় সংখ‍্যালঘুর ওপর আক্রমণের কৌশল। তবে ক্ষতি হচ্ছে দেশের। সবাই ভীত হচ্ছেন। তবে বেশি হচ্ছেন সংখ‍্যালঘুরা। কারণ তারা জেনে গেছেন, বুঝে গেছেন এই ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগের জাল থেকে তাদের মুক্তি ঘটছে না। তাই শঙ্কা, ভয় আর তটস্থতায় আছে সবাই। জানলেও কেউ যেন কিছুই জানছে না, বুঝলেও কেউই আর কিছু বুঝবে না।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়।

ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com