ঢাকা ০৫:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সৎ সম্পর্ক: স্বীকৃতির ভান, অস্বীকারের রাজনীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২০:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

সমাজে সম্পর্কের অনেক নাম থাকলেও সব সম্পর্কের ভেতরে সমান অনুভূতির গভীরতা থাকে না। কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে রক্তের টানে, কিছু গড়ে ওঠে পরিস্থিতির চাপে, সামাজিকতার ভারে কিংবা নিছক বাধ্যবাধকতায়। সৎ মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক সেই দ্বিতীয় শ্রেণির সম্পর্কেরই এক বাস্তব উদাহরণ।

পরিস্থিতি, সামাজিকতা ও পারিবারিক কাঠামোর কারণে সৎ মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে হয়, তাকে সম্মান দেখাতে হয়, তার উপস্থিতিকে মেনে নেওয়ার ভান করতে হয়। কিন্তু এই স্বীকৃতি অনেক সময়ই থাকে বাহ্যিক, অন্তরের গভীরে তাকে প্রকৃত মা হিসেবে গ্রহণ করার জায়গাটি তৈরি হয় না। এই দ্বৈততা —বাইরের স্বীকৃতি আর ভেতরের অস্বস্তি— ধীরে ধীরে পরিবারে এক ধরনের নীরব টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। সেই টানাপোড়েনের দায়ভার যখন সরাসরি সৎ মায়ের ওপর চাপানো কঠিন হয়, তখন অনেক সময় ঘুরেফিরে বাবাকেই দোষারোপ করা হয়। বাবার সিদ্ধান্ত, বাবার পুনর্বিবাহ, বাবার “ভুল”— এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে সন্তান নিজের ভেতরের ক্ষোভ, কষ্ট আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা প্রকাশের একটা সহজ পথ খুঁজে পায়।

এই মানসিক কাঠামোটি শুধু পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ইতিহাসের ক্ষেত্রেও আমরা প্রায় একই ধরনের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন দেখতে পাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে, বিশেষ করে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক আদর্শের ধারক বা সমর্থক, তাদের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এই সৎ মায়ের উপমাটি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, ইতিহাসের এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

সময়ের প্রবাহে এমনকি স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরাও আর প্রকাশ্যে বলতে পারে না যে স্বাধীন হওয়াই উচিত ছিল না। ফলে তারা পরিস্থিতি ও বাস্তবতার চাপে স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়ার ভান করে, ঠিক যেমন সন্তানেরা সামাজিকতা ও বাধ্যবাধকতায় সৎ মাকে ‘মা’ বলে ডাকে। কিন্তু এই মেনে নেওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর থেকে নয়; বরং এটি এক ধরনের কৌশলগত স্বীকৃতি, যা তাদের আদর্শিক অবস্থানকে পুরোপুরি বদলে দেয় না।

ইদানীং লক্ষ্য করা যায়, এই ধারার রাজনীতি ও চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন একটি নতুন ভাষ্য নির্মাণের চেষ্টা করছে। তারা বলছে, মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য ছিল, এটি ছিল সময়ের দাবি, এটি ছিল একটি বাস্তবতা। এই কথাগুলো শুনলে মনে হতে পারে, তারা বুঝি ইতিহাসের সঙ্গে আপস করে ফেলেছে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখা যায়, এই স্বীকৃতির আড়ালে লুকিয়ে আছে পুরনো অস্বস্তি, পুরনো অস্বীকার আর পুরনো দায় এড়ানোর প্রবণতা। যেমনটি ঘটে সৎ মায়ের ক্ষেত্রে—মুখে ‘মা’ বলা হলেও অন্তরের দূরত্ব অটুট থাকে—ঠিক তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে “অনিবার্য বাস্তবতা” বলা হলেও তার আত্মত্যাগ, তার মূল্য এবং তার নৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি স্বীকার করা হয় না।

এই অস্বীকারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ হয়েছেন—এই প্রশ্নটি ইতিহাস, গবেষণা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে বহুবার আলোচিত হয়েছে। তবুও একটি নির্দিষ্ট মহল বারবার এই সংখ্যাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। তারা বলে, সংখ্যা ঠিক নয়, অতিরঞ্জিত, আবেগপ্রবণ। এই প্রশ্ন তোলার ভেতরে নিছক গবেষণার আগ্রহের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। কারণ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি, ভয়াবহতা ও নৃশংসতার মাত্রাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। আর সেটি করা গেলে স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়।

এখানেই বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল—এটি ইতিহাসের এক নির্মম সত্য। কিন্তু স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী চিন্তাধারার মানুষজন এই সত্যকে স্বীকার করতে আজও অস্বস্তি বোধ করে। তারা সরাসরি দায় স্বীকার না করে নানা রকম ভাষাগত কৌশল ব্যবহার করে। কখনো বলে, ‘এরা’ করেছে, কখনো বলে, ‘ওরা’ করেছে। এই ‘এরা-ওরা’র খেলায় আসল অপরাধী, আসল পরিকল্পনাকারী আর আসল সহযোগীদের নাম ঝাপসা হয়ে যায়। দায় যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়, ইতিহাস যেন নিজেই নিজের দায় বহন করে নেয়।

এই প্রবণতাটি আসলে সেই বাবাকে দোষারোপ করার মানসিকতারই রাজনৈতিক রূপ। সৎ মায়ের উপস্থিতি যেমন সন্তানের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের মনে এক ধরনের আদর্শিক অস্বস্তি তৈরি করে। সেই অস্বস্তির দায় তারা সরাসরি নিজেদের অবস্থানের ওপর নিতে চায় না।

ফলে তারা ইতিহাসকে একটু বাঁকিয়ে, একটু ঘুরিয়ে, একটু প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি খোঁজে। তারা বলতে চায়, স্বাধীনতা তো হয়ে গেছে, আমরা সেটাকে মেনে নিচ্ছি; কিন্তু সব দায়, সব অপরাধ, সব রক্তের হিসাব যেন এতটা স্পষ্ট না হয়।

একটি জাতির ইতিহাস শুধু ঘটনাপঞ্জি নয়; এটি স্মৃতি, আবেগ, আত্মপরিচয় ও নৈতিক অবস্থানের সমষ্টি। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল অস্তিত্বের লড়াই, ভাষা ও সংস্কৃতির লড়াই, মানবিক মর্যাদার লড়াই। এই লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যে আত্মত্যাগ, যে বেদনা আর যে রক্তপাতের ইতিহাস তৈরি হয়েছে, সেটিকে খণ্ডিত করে দেখার চেষ্টা মানে সেই আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত হানা। কিন্তু এই আঘাত অনেক সময় সরাসরি করা হয় না; বরং নরম ভাষায়, আপাত নিরপেক্ষ প্রশ্নের আড়ালে, তথাকথিত বাস্তবতার দোহাই দিয়ে তা করা হয়।

এই জায়গায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার কাজ শুধু খবর পরিবেশন করা নয়; ইতিহাসের বিকৃতি, বিভ্রান্তি ও অর্ধসত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা। যখন কেউ বলে, মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য ছিল কিন্তু শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় আছে, তখন সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ নিরপেক্ষতার নামে যদি বিভ্রান্তিকে জায়গা দেওয়া হয়, তবে সেটি ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হয়।

বাংলাদেশের সমাজে এখনও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ প্রবল, আবার একই সঙ্গে বিভ্রান্তির জায়গাও তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে জানছে পাঠ্যবই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা খণ্ডিত আলোচনার মাধ্যমে। এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা আরও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। কারণ যারা সরাসরি যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে না, তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ভাষ্য সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ঠিক যেমন একটি শিশু ধীরে ধীরে বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে শুনে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তার সব কষ্টের জন্য বাবাই দায়ী।

অথচ বাস্তবতা হলো, ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা কোনও জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে না। সৎ মাকে সত্যিকারের মা হিসেবে গ্রহণ না করার ভেতরে যেমন একটি পরিবারে স্থায়ী দূরত্ব থেকে যায়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণ সত্যকে মেনে না নেওয়ার ভেতরে জাতির আত্মপরিচয়ে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। স্বাধীনতাকে শুধু “অনিবার্য বাস্তবতা” বলে স্বীকার করা যথেষ্ট নয়; তার মূল্য, তার আত্মত্যাগ, তার অপরাধ ও অপরাধীদের নামও স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হয়।

ইতিহাসের সঙ্গে এই সৎ সম্পর্ক স্থাপন করা না গেলে বারবার একই প্রশ্ন, একই বিভ্রান্তি আর একই দায় এড়ানোর প্রবণতা ফিরে আসবে। আজ যেমন শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, কাল হয়তো মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র নিয়েই নতুন প্রশ্ন তোলা হবে। এই ধারাবাহিকতা থামাতে হলে প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান, নৈতিক দৃঢ়তা এবং ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকার সাহস। কারণ ইতিহাস কোনও সৎ মা নয়, যাকে পরিস্থিতির চাপে ‘মা’ বলে ডাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ইতিহাস একটি জীবন্ত সত্য, যার সঙ্গে সম্পর্ক হয় স্বীকারের, উপলব্ধির এবং দায় নেওয়ার। এই দায় এড়াতে গেলেই বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, আর সেই বিভ্রান্তির খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সৎ সম্পর্ক: স্বীকৃতির ভান, অস্বীকারের রাজনীতি

আপডেট সময় : ০৩:২০:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫

সমাজে সম্পর্কের অনেক নাম থাকলেও সব সম্পর্কের ভেতরে সমান অনুভূতির গভীরতা থাকে না। কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে রক্তের টানে, কিছু গড়ে ওঠে পরিস্থিতির চাপে, সামাজিকতার ভারে কিংবা নিছক বাধ্যবাধকতায়। সৎ মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক সেই দ্বিতীয় শ্রেণির সম্পর্কেরই এক বাস্তব উদাহরণ।

পরিস্থিতি, সামাজিকতা ও পারিবারিক কাঠামোর কারণে সৎ মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে হয়, তাকে সম্মান দেখাতে হয়, তার উপস্থিতিকে মেনে নেওয়ার ভান করতে হয়। কিন্তু এই স্বীকৃতি অনেক সময়ই থাকে বাহ্যিক, অন্তরের গভীরে তাকে প্রকৃত মা হিসেবে গ্রহণ করার জায়গাটি তৈরি হয় না। এই দ্বৈততা —বাইরের স্বীকৃতি আর ভেতরের অস্বস্তি— ধীরে ধীরে পরিবারে এক ধরনের নীরব টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। সেই টানাপোড়েনের দায়ভার যখন সরাসরি সৎ মায়ের ওপর চাপানো কঠিন হয়, তখন অনেক সময় ঘুরেফিরে বাবাকেই দোষারোপ করা হয়। বাবার সিদ্ধান্ত, বাবার পুনর্বিবাহ, বাবার “ভুল”— এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে সন্তান নিজের ভেতরের ক্ষোভ, কষ্ট আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা প্রকাশের একটা সহজ পথ খুঁজে পায়।

এই মানসিক কাঠামোটি শুধু পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ইতিহাসের ক্ষেত্রেও আমরা প্রায় একই ধরনের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন দেখতে পাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে, বিশেষ করে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক আদর্শের ধারক বা সমর্থক, তাদের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এই সৎ মায়ের উপমাটি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, ইতিহাসের এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

সময়ের প্রবাহে এমনকি স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরাও আর প্রকাশ্যে বলতে পারে না যে স্বাধীন হওয়াই উচিত ছিল না। ফলে তারা পরিস্থিতি ও বাস্তবতার চাপে স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়ার ভান করে, ঠিক যেমন সন্তানেরা সামাজিকতা ও বাধ্যবাধকতায় সৎ মাকে ‘মা’ বলে ডাকে। কিন্তু এই মেনে নেওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর থেকে নয়; বরং এটি এক ধরনের কৌশলগত স্বীকৃতি, যা তাদের আদর্শিক অবস্থানকে পুরোপুরি বদলে দেয় না।

ইদানীং লক্ষ্য করা যায়, এই ধারার রাজনীতি ও চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন একটি নতুন ভাষ্য নির্মাণের চেষ্টা করছে। তারা বলছে, মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য ছিল, এটি ছিল সময়ের দাবি, এটি ছিল একটি বাস্তবতা। এই কথাগুলো শুনলে মনে হতে পারে, তারা বুঝি ইতিহাসের সঙ্গে আপস করে ফেলেছে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখা যায়, এই স্বীকৃতির আড়ালে লুকিয়ে আছে পুরনো অস্বস্তি, পুরনো অস্বীকার আর পুরনো দায় এড়ানোর প্রবণতা। যেমনটি ঘটে সৎ মায়ের ক্ষেত্রে—মুখে ‘মা’ বলা হলেও অন্তরের দূরত্ব অটুট থাকে—ঠিক তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে “অনিবার্য বাস্তবতা” বলা হলেও তার আত্মত্যাগ, তার মূল্য এবং তার নৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি স্বীকার করা হয় না।

এই অস্বীকারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ হয়েছেন—এই প্রশ্নটি ইতিহাস, গবেষণা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে বহুবার আলোচিত হয়েছে। তবুও একটি নির্দিষ্ট মহল বারবার এই সংখ্যাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। তারা বলে, সংখ্যা ঠিক নয়, অতিরঞ্জিত, আবেগপ্রবণ। এই প্রশ্ন তোলার ভেতরে নিছক গবেষণার আগ্রহের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। কারণ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি, ভয়াবহতা ও নৃশংসতার মাত্রাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। আর সেটি করা গেলে স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়।

এখানেই বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল—এটি ইতিহাসের এক নির্মম সত্য। কিন্তু স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী চিন্তাধারার মানুষজন এই সত্যকে স্বীকার করতে আজও অস্বস্তি বোধ করে। তারা সরাসরি দায় স্বীকার না করে নানা রকম ভাষাগত কৌশল ব্যবহার করে। কখনো বলে, ‘এরা’ করেছে, কখনো বলে, ‘ওরা’ করেছে। এই ‘এরা-ওরা’র খেলায় আসল অপরাধী, আসল পরিকল্পনাকারী আর আসল সহযোগীদের নাম ঝাপসা হয়ে যায়। দায় যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়, ইতিহাস যেন নিজেই নিজের দায় বহন করে নেয়।

এই প্রবণতাটি আসলে সেই বাবাকে দোষারোপ করার মানসিকতারই রাজনৈতিক রূপ। সৎ মায়ের উপস্থিতি যেমন সন্তানের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের মনে এক ধরনের আদর্শিক অস্বস্তি তৈরি করে। সেই অস্বস্তির দায় তারা সরাসরি নিজেদের অবস্থানের ওপর নিতে চায় না।

ফলে তারা ইতিহাসকে একটু বাঁকিয়ে, একটু ঘুরিয়ে, একটু প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি খোঁজে। তারা বলতে চায়, স্বাধীনতা তো হয়ে গেছে, আমরা সেটাকে মেনে নিচ্ছি; কিন্তু সব দায়, সব অপরাধ, সব রক্তের হিসাব যেন এতটা স্পষ্ট না হয়।

একটি জাতির ইতিহাস শুধু ঘটনাপঞ্জি নয়; এটি স্মৃতি, আবেগ, আত্মপরিচয় ও নৈতিক অবস্থানের সমষ্টি। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল অস্তিত্বের লড়াই, ভাষা ও সংস্কৃতির লড়াই, মানবিক মর্যাদার লড়াই। এই লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যে আত্মত্যাগ, যে বেদনা আর যে রক্তপাতের ইতিহাস তৈরি হয়েছে, সেটিকে খণ্ডিত করে দেখার চেষ্টা মানে সেই আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত হানা। কিন্তু এই আঘাত অনেক সময় সরাসরি করা হয় না; বরং নরম ভাষায়, আপাত নিরপেক্ষ প্রশ্নের আড়ালে, তথাকথিত বাস্তবতার দোহাই দিয়ে তা করা হয়।

এই জায়গায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার কাজ শুধু খবর পরিবেশন করা নয়; ইতিহাসের বিকৃতি, বিভ্রান্তি ও অর্ধসত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা। যখন কেউ বলে, মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য ছিল কিন্তু শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় আছে, তখন সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ নিরপেক্ষতার নামে যদি বিভ্রান্তিকে জায়গা দেওয়া হয়, তবে সেটি ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হয়।

বাংলাদেশের সমাজে এখনও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ প্রবল, আবার একই সঙ্গে বিভ্রান্তির জায়গাও তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে জানছে পাঠ্যবই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা খণ্ডিত আলোচনার মাধ্যমে। এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা আরও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। কারণ যারা সরাসরি যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে না, তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ভাষ্য সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ঠিক যেমন একটি শিশু ধীরে ধীরে বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে শুনে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তার সব কষ্টের জন্য বাবাই দায়ী।

অথচ বাস্তবতা হলো, ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা কোনও জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে না। সৎ মাকে সত্যিকারের মা হিসেবে গ্রহণ না করার ভেতরে যেমন একটি পরিবারে স্থায়ী দূরত্ব থেকে যায়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণ সত্যকে মেনে না নেওয়ার ভেতরে জাতির আত্মপরিচয়ে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। স্বাধীনতাকে শুধু “অনিবার্য বাস্তবতা” বলে স্বীকার করা যথেষ্ট নয়; তার মূল্য, তার আত্মত্যাগ, তার অপরাধ ও অপরাধীদের নামও স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হয়।

ইতিহাসের সঙ্গে এই সৎ সম্পর্ক স্থাপন করা না গেলে বারবার একই প্রশ্ন, একই বিভ্রান্তি আর একই দায় এড়ানোর প্রবণতা ফিরে আসবে। আজ যেমন শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, কাল হয়তো মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র নিয়েই নতুন প্রশ্ন তোলা হবে। এই ধারাবাহিকতা থামাতে হলে প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান, নৈতিক দৃঢ়তা এবং ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকার সাহস। কারণ ইতিহাস কোনও সৎ মা নয়, যাকে পরিস্থিতির চাপে ‘মা’ বলে ডাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ইতিহাস একটি জীবন্ত সত্য, যার সঙ্গে সম্পর্ক হয় স্বীকারের, উপলব্ধির এবং দায় নেওয়ার। এই দায় এড়াতে গেলেই বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, আর সেই বিভ্রান্তির খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকে।