সতেরো বছরের বেশি সময়ের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান নিজ দেশে ফিরে এসেছেন। তার এই দেশে ফেরার খবর পরিবেশন করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের তারেক রহমান আগামীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাসন থেকে নিজ দেশে ফিরছেন।
এটা সত্য বিএনপি তাকে ’আগামীর প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেই দেখছে। দেশের অনেক মানুষও বিশ্বাস করেন- ঠিকঠাক মতো নির্বাচন হলে বিএনপি জয়ী হবে এবং তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। অন্তত তাঁকে ঘিরে অনেক মানুষই প্রত্যাশার পারদটাকে অনেক উঁচুতে উঠিয়ে রেখেছেন।
বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে আশাহত মানুষের মনে তাকে ঘিরে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সেই প্রত্যাশা তিনি কতটা পূরণ করতে পারবেন- সেটা বলার জন্য অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।
তারেক রহমান পরিবর্তিত এক বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। যে বাংলাদেশ থেকে তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন- সেই বাংলাদেশের ছিটেফোঁটাও এখন আর নেই।
তাছাড়া তিনি যখন দেশ ছাড়েন, তার আগে তিনি ছিলেন ক্ষমতায়। রাজকীয় প্রোটোকলে কেটেছে তার জীবন। এবার দেশে ফিরে তিনি ‘রাজকীয় নিরাপত্তা’ পাচ্ছেন বটে, বাস্তবতা হচ্ছে তিনি ক্ষমতায় নেই। রাষ্ট্রের নিরংকুশ ক্ষমতাধর হিসেবে তিনি দেশে ফিরেননি। তিনি যখন দেশে ফিরেছেন আর যে সময়টায় ফিরছেন- তখন দেশ শাসন করছে অন্তর্বর্তী সরকার, যেই সরকারের অস্তিত্ব তেমন একটা টের পাওয়া যায় না।
জীবন-যাপনে অনিশ্চয়তা ডুবু ডুবু করা নাগরিকরা ভোট দিয়ে গণতন্ত্রে ফেরার অপেক্ষায়।
সেই অপেক্ষার তারেক রহমান নিজেও একজন সঙ্গী। তার দল ক্ষমতায় যেতে চায়, তিনি নিজেও নির্বাচন করবেন।
যদিও নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে কিনা তা নিয়ে মানুষের মনে সংশয় আছে, প্রশ্নহীন নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দের সরকার গঠনের মানুষের যে প্রত্যাশা- সেই প্রত্যাশা পূরণে তারেক রহমানের ভূমিকার দিকে মানুষ তাকিয়ে থাকবে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা- নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে মানুষকে বেশ খানিকটা আশাবাদী করেছে।
মানুষের এই আশাবাদ, প্রত্যাশাকে তারেক রহমান কতটা মূল্যায়ন করতে পারবেন- সেটা সময় বলে দেবে। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তারেক রহমানের যে নানারকম চ্যালেঞ্জ আছে- সেটি সম্পর্কে তিনি অবশ্যই ওয়াকিবহাল। মনোনয়নকে ঘিরেই কেবল নয়, দলের ভেতরকার নানা কোন্দল, গ্রুপিং তাকে সরাসরি, সামনাসামনি হ্যান্ডল করতে হবে। এতদিন তিনি লন্ডনে বসে দল পরিচালনা করেছেন- এবার তাকে সামনাসামনি সবকিছু দেখভাল করতে হবে। কোন্দল, গ্রুপিং নিরসন করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চ্যালেঞ্জ তাকে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত রাজনীতির মাঠে জামায়াতে ইসলামীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির এতদিনের সম্পর্ক ছিল মৈত্রীত্বের, তারেক রহমান নিজেই একদা জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরকে ছাত্রদলের আপন ভাই বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। জামায়াত এখন রাজনীতির মাঠে বিএনপির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি। কেবল ভোটের মাঠের প্রতিযোগিতাই নয়, বিএনপির ভেতর কী পরিমাণ জামায়াতের ঘাপটি মারা কর্মী আছে- সেটা পরিষ্কার নয়।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক আদর্শের দুটি দলের মধ্যে বিভাজন করে নিজেদের সমর্থন বাড়ানো অবশ্যই চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।
তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ- দেশের সেক্যুলার ভোটার- যারা সেক্যুলার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন- তাদের জন্য রাজনীতিতে কোনও স্পেস করে দেওয়ার ব্যাপারে তারেক রহমান কতটা উদ্যোগী হবেন। এই প্রশ্নটা ফেব্রুয়ারির ভোটের আগেই সামনে আসবে এবং বিএনপিকে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অবশ্য ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া আর বিচার করা – এই দুইয়ের ফয়সালাও তারেক রহমানকে করতে হবে। তবে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেওয়ার অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকারের বহাল রাখা কঠিন হবে বলেই মনে হয়।
ভোটে নির্বাচিত হলে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তাকে হতে হবে- সেগুলো নিয়ে আপাতত আলোচনায় না হয় নাই বা গেলাম। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনার মতো কঠিন কাজ তাকে করতে হবে।
থানা থেকে লুট করা অস্ত্র ছাড়াও উগ্রপন্থীদের কাছে থাকা অস্ত্র উদ্ধারও একটি বড় দায়িত্ব হবে তারেক রহমানের। কিন্তু এই মুহূর্তে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এবং চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঘোষিত তারিখেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করা এবং সেই নির্বাচনে যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে নিজেদের ভোটটা নিজেরা দিতে পারে- সেই পরিবেশ নিশ্চিত করায় ভূমিকা রাখা।
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক
রিপোর্টারের নাম 

























