দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার মামলায় দাঙ্গা সৃষ্টি করে অবৈধভাবে কার্যালয়ে ঢুকে লুটপাট, ক্ষতি করা, হত্যার উদ্দেশ্যে অগ্নিসংযোগ, ভয় দেখানো, অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ করা হয়েছে। এরই মধ্যে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা ও বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তবে প্রকাশ্যে এত বড় হামলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকরা। এদিকে এই হামলাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পত্রিকা দুটির কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলার এজাহারেও এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এটি শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়— বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও ভিন্নমত দমনের এক গভীর সতর্কবার্তা। এই হামলার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রথম আলো ভবনে গত ১৮ ডিসেম্বর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রবিবার (২১ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার পর তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়। প্রথম আলোর হেড অব সিকিউরিটি মেজর (অব.) মো. সাজ্জাদুল কবির বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় আরেকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
মামলা ও ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ নিয়ে সতর্কতা
দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। রবিবার (২১ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলা করা হয়। এটি করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে।
মামলায় বিপুল সংখ্যক ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জায়মা ইসলাম। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার পর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অতীতে এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহারের নজির রয়েছে। নিরপরাধ কেউ যেন গ্রেফতার না হয় এবং গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে আইনসম্মত আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রমাণ ছাড়া কোনও গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল তুলবেন না। যতটুকু প্রমাণ পাবেন, ঠিক ততটুকুই প্রকাশ করবেন।’
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি পরিকল্পিত?
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যে হামলা চালিয়েছে, তা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, সম্পাদকদের সংগঠন ‘নোয়াব’, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন— এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে স্বাধীন মতপ্রকাশকে রুদ্ধ করতেই এই সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ঘটনায় ওসমান হাদির ওপর আক্রমণ থেকে তার মৃত্যু সংবাদ আসা পর্যন্ত অনেকগুলো ডট যদি আমরা একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে দেখি, তাহলে এর পেছনের কারণ বা ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত কিনা, তা বের করতে পারবো বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘‘আমরা আমাদের জনগণের বিরাট অংশকে শিক্ষিত করতে পারিনি। ফলে যারা সমাজে নানা মাধ্যমে প্রভাব রাখতে পারে, তারা এই জনগোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে, নিজেদের ব্যক্তিগত ভালো লাগা বা না লাগার ওপর ভিত্তি করে। আপাতদৃষ্টিতে কাকতালীয় মনে হলেও তা যে না— সেটা বুঝতে পারা যাবে যদি আমরা ওসমান হাদির ওপর আক্রমণ থেকে তার মৃত্যু সংবাদ আসা পর্যন্ত ঘটে চলা ও ‘উসকানিগুলোর’ ধরন মিলাতে পারি।’’
পুলিশের ভূমিকা ও ব্যাখ্যা
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত সোয়া ১১টার দিকে ২০ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, দাহ্য পদার্থ নিয়ে মিছিল করে কাওরান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে এসে হামলার চেষ্টা চালায়। পুলিশ বাধা দিলে তারা বেআইনিভাবে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে সমবেত হয়ে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্লোগান দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তারা লোক জড়ো করে। প্রথম আলোতে হামলার জন্য উসকানিমূলক পোস্ট দিতে থাকে। মামলায় প্রথম আলো পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ ও অফিসের কাজে বাধা দিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, অনলাইনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেওয়া ও অন্তর্ঘাতমূলক কাজের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেসময় পুলিশ কাদের ঠেকিয়েছে— তা দৃশ্যমান নয় কেন এ নিয়েও প্রশ্ন তুলে মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশ্লেষক রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, ‘‘এ জায়গায় দেখা দরকার মব সহিংসতা কেমন করে গঠিত হলো, কারা এর পেছনে ছিল। এখন অনেকের নাম আমরা বলছি, কিন্তু আদৌ তাদের সম্পৃক্ততা ছিল কিনা বা তাদের কী ধরনের উসকানি ছিল, সেটা পরিষ্কার না। এভাবে সন্দেহভাজন আটক করে আসলে উসকানি যারা দিয়েছে, পরিকল্পনা করতে যারা সাহায্য করেছে— তা আদৌ বের হবে কিনা সেটা আমার সন্দেহ। যে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন এবং সময়মতো দায়িত্বপালন করেননি, বা কতটুকু করেছেন, সেটাও নির্ণয় করা দরকার।’’
তবে হামলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও পুলিশের দাবি, তাদের তৎপরতায় কোনও ঘাটতি ছিল না। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘‘ওই সময় পুলিশ সরাসরি অ্যাকশনে (গুলি) গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি ছিল এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারতো। পুলিশ সদস্যদের ওপরও পাল্টা আক্রমণের শঙ্কা ছিল।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মাত্র এক বছর আগে পুলিশ একটি বড় ট্রমা পার করে এসেছে। সামনে নির্বাচন— এমন প্রেক্ষাপটে আবারও পুলিশ হতাহত হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতো। কোনও প্রাণহানি না হওয়াকে পুলিশ একটি অর্জন হিসেবে দেখছে। এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিরাপত্তা জোরদার ও সরকারের অবস্থান
হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুই সম্পাদকের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকদের জন্য গানম্যান নিয়োগের পাশাপাশি তাদের বাসভবনের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।
অপরদিকে, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘‘গণতন্ত্রে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু সহিংসতা বা অগ্নিসংযোগ করে কোনও মতের জবাব দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’’ তবে রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও ভুক্তভোগীর ওপর দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমের মধ্যে বিভাজনের সময় এটা না উল্লেখ করে লেনিন বলেন, ‘‘ হামলার পরে একপক্ষ বলছে একই ঘটনা সংবাদ ও নয়া দিগন্তের সঙ্গে আগের সময়ে হয়েছে এবং একইসঙ্গে কেউ কেউ কার থেকে কে বেশি আক্রান্ত হয়েছে, সেই তুললা আনছেন। বেশি-কম আক্রান্তের তুলনা এনে কর্তৃপক্ষ ও সংবাদকর্মীরা ভুক্তভোগীর ওপরে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিভাজিত করছে। এ ধরনের বিভক্তিমূলক সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম নিয়ে ভাবার দরকার আছে।’’
রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের ক্ষোভ
সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াব আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘আজ শুধু গণমাধ্যমের ওপর নয়, গণতন্ত্রের ওপর আঘাত এসেছে। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’’ একই সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তাদের স্লোগান ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, ‘‘সরকারের ভেতরের একটি অংশের মদদ ও রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া এত বড় সাহস কেউ দেখাতে পারতো না।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা, ছায়ানটে হামলা এবং ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা— সবই মুক্তচিন্তা ও ভিন্নমত দমনের পরিকল্পিত চিত্র।” তিনি বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকার এই দায় এড়াতে পারে না।”
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের যে হামলা ও তার পরবর্তীকালে সংবাদকর্মীদের যে উদ্ধার তৎপরতা, তার পুরো ঘটনাটা বিরল না, কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশ্লেষক বেজাউর রহমান লেনিন বলেন, ‘‘মব সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে মানবাধিকার হরণের যে চেষ্টা হয়েছে, তা নিন্দনীয়। ৯৬ ঘণ্টা পার হওয়ার পরেও মামলার অগ্রগতি ব্যাপকমাত্রায় হয়েছে বলা যাবে না। তার পরিপ্রেক্ষিতে দীপুর ঘটনাও দেখেছি। এধরনের মব সহিংসতার বিরুদ্ধে যে মামলা পুলিশের দিক থেকে করা হচ্ছে, তার মাঝে দেখা যাচ্ছে সন্দেহভাজন গ্রেফতার। কিন্তু এই সন্দেহভাজন গ্রেফতার আসলে কার্যকর কিছু না। এ সন্দেহভাজন গ্রেফতারের মানে হলো, বিনা বিচারে ব্যাপক সংখ্যক ব্যক্তিবর্গের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং একইসঙ্গে এসব মামলাকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য করা।”
রিপোর্টারের নাম 





















