ঢাকা ১১:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

নিবন্ধনহীন মানুষ রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

লালমনিরহাটের রেজিয়া বেগম এবং তার মেয়ে শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয়নি। রাষ্ট্রের চোখে তারা অদৃশ্য, যার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার সুরক্ষায়। বাংলাদেশে এখনও প্রায় অর্ধেক মানুষের জন্মনিবন্ধন নেই, মৃত্যুনিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশের। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান ইতোমধ্যে প্রায় শতভাগ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত করেছে। জন্মনিবন্ধনের বৈশ্বিক গড় হার বর্তমানে প্রায় ৭৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের বস্তি এলাকায় বসবাসরত ৩২.৯ শতাংশ পরিবারের কোনও শিশুরই জন্মসনদ নেই বলে সম্প্রতি কারিতাস বাংলাদেশের এক জরিপে উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ শতাংশেরই জন্মসনদ নেই। ফলে শিক্ষার অধিকারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।

জন্মনিবন্ধন না থাকার প্রভাব বহুমাত্রিক। বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জন্মসনদকে বয়স যাচাইয়ের প্রধান দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং নিবন্ধনহীন শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশে বাধার মুখে পড়ে।

জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বা দারিদ্র্যভিত্তিক সেবা —সবকিছুতেই পরিচয় প্রমাণ অপরিহার্য। নিবন্ধন না থাকলে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও মানবপাচার শনাক্ত করাও জটিল হয়ে পড়ে, কারণ বয়স যাচাইয়ের আইনি ভিত্তি থাকে না।

বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো আইনগত সীমাবদ্ধতা। ২০০৪ সালের আইনে নিবন্ধনের প্রধান দায়িত্ব পরিবারকে দেওয়া হয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে নয়। অথচ দেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর জন্ম হয় হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে। জন্মের মুহূর্তেই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে লাখো শিশুকে সহজেই নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশ এভাবেই প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পেরেছে। এছাড়া নিবন্ধনের ভুল সংশোধনে অতিরিক্ত ফি, প্রযুক্তিগত জটিলতা, জনবল ঘাটতি ও দুর্বল সমন্বয় প্রভৃতি সাধারণ মানুষকে সেবা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস‘ তৈরির বাধ্যবাধকতা না থাকায় নীতিনির্ধারণীতে ঘাটতি থেকে যায়।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক-এসকাপ ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, বাংলাদেশও এটি অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এসডিজির ১৬.৯ লক্ষ্য অনুযায়ী ‘‘সবার জন্য বৈধ পরিচয়“ নিশ্চিত করতে হলে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতেই হবে। শিক্ষা (এসডিজি ৪), স্বাস্থ্য (এসডিজি ৩), বৈষম্য-হ্রাস (এসডিজি ১০) এবং দারিদ্র্য বিমোচন (এসডিজি ১)-এসব লক্ষ্য অর্জনেও জন্মনিবন্ধনের পরিসংখ্যান অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আইনি সংস্কার এবং আইনের কঠোর বাস্তবায়ন। সকল হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদান করা। জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে ভুল তথ্য সংশোধনের ফি মওকুফ করা, যাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। নিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস তৈরির বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। একইসাথে মাঠপর্যায়ে জনবল, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ উন্নত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সম্পদ, প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির ন্যায্য ভাগিদার। কোনও মানুষই যেন অদৃশ্য না থাকে, কোনও জীবন যেন গণনার বাইরে না পড়ে। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। এখনই সময় প্রতিটি শিশুকে রাষ্ট্রের চোখে দৃশ্যমান করার।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)

basharzubair@hotmail.com

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

নিবন্ধনহীন মানুষ রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য

আপডেট সময় : ০৮:২৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

লালমনিরহাটের রেজিয়া বেগম এবং তার মেয়ে শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয়নি। রাষ্ট্রের চোখে তারা অদৃশ্য, যার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার সুরক্ষায়। বাংলাদেশে এখনও প্রায় অর্ধেক মানুষের জন্মনিবন্ধন নেই, মৃত্যুনিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশের। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান ইতোমধ্যে প্রায় শতভাগ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত করেছে। জন্মনিবন্ধনের বৈশ্বিক গড় হার বর্তমানে প্রায় ৭৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের বস্তি এলাকায় বসবাসরত ৩২.৯ শতাংশ পরিবারের কোনও শিশুরই জন্মসনদ নেই বলে সম্প্রতি কারিতাস বাংলাদেশের এক জরিপে উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ শতাংশেরই জন্মসনদ নেই। ফলে শিক্ষার অধিকারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।

জন্মনিবন্ধন না থাকার প্রভাব বহুমাত্রিক। বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জন্মসনদকে বয়স যাচাইয়ের প্রধান দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং নিবন্ধনহীন শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশে বাধার মুখে পড়ে।

জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বা দারিদ্র্যভিত্তিক সেবা —সবকিছুতেই পরিচয় প্রমাণ অপরিহার্য। নিবন্ধন না থাকলে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও মানবপাচার শনাক্ত করাও জটিল হয়ে পড়ে, কারণ বয়স যাচাইয়ের আইনি ভিত্তি থাকে না।

বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো আইনগত সীমাবদ্ধতা। ২০০৪ সালের আইনে নিবন্ধনের প্রধান দায়িত্ব পরিবারকে দেওয়া হয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে নয়। অথচ দেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর জন্ম হয় হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে। জন্মের মুহূর্তেই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে লাখো শিশুকে সহজেই নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশ এভাবেই প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পেরেছে। এছাড়া নিবন্ধনের ভুল সংশোধনে অতিরিক্ত ফি, প্রযুক্তিগত জটিলতা, জনবল ঘাটতি ও দুর্বল সমন্বয় প্রভৃতি সাধারণ মানুষকে সেবা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস‘ তৈরির বাধ্যবাধকতা না থাকায় নীতিনির্ধারণীতে ঘাটতি থেকে যায়।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক-এসকাপ ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, বাংলাদেশও এটি অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এসডিজির ১৬.৯ লক্ষ্য অনুযায়ী ‘‘সবার জন্য বৈধ পরিচয়“ নিশ্চিত করতে হলে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতেই হবে। শিক্ষা (এসডিজি ৪), স্বাস্থ্য (এসডিজি ৩), বৈষম্য-হ্রাস (এসডিজি ১০) এবং দারিদ্র্য বিমোচন (এসডিজি ১)-এসব লক্ষ্য অর্জনেও জন্মনিবন্ধনের পরিসংখ্যান অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আইনি সংস্কার এবং আইনের কঠোর বাস্তবায়ন। সকল হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদান করা। জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে ভুল তথ্য সংশোধনের ফি মওকুফ করা, যাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। নিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস তৈরির বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। একইসাথে মাঠপর্যায়ে জনবল, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ উন্নত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সম্পদ, প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির ন্যায্য ভাগিদার। কোনও মানুষই যেন অদৃশ্য না থাকে, কোনও জীবন যেন গণনার বাইরে না পড়ে। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। এখনই সময় প্রতিটি শিশুকে রাষ্ট্রের চোখে দৃশ্যমান করার।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)

basharzubair@hotmail.com