অ্যাফোরিজম ও কবিতার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। দুটোই সংক্ষিপ্ত, তীব্র চিত্রকল্পের ব্যবহারের পাশাপাশি রয়েছে একধরনের টুইস্ট— এক ধরনের হঠাৎ দংশন, যা পাঠককে চমকে দেয়। এজরা পাউন্ড এক্ষেত্রে নিখুঁত উদাহরণ।
তার ‘ইন এ স্টেশন অব দ্য মেট্রো’-এর “The apparition of these faces in the crowd: /Petals on a wet, black bough.” পঙ্ক্তির সাথে তার “The book should be a ball of light in one’s hand”-এর মধ্যে কী এমন পার্থক্য আছে যে একটি কবিতা এবং অন্যটি অ্যাফোরিজম হিসেবে গণ্য হয়?
কিছু কবি এমন ছন্দ লেখেন যা একই সঙ্গে কবিতা আবার অ্যাফোরিজমও। যেমন : এমিলি ডিকিনসনের—
“Who goes to dine must take his Feast
Or find the Banquet mean—
The Table is not laid without
Till it is laid within.”
চতুর্দশপদীর বিন্যাসে লেখা একটি ছন্দবদ্ধ অ্যাফোরিজমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আবার কে রায়ানের ‘ড্রাই থিংস’ও ছন্দবদ্ধ অ্যাফোরিজম, যেটা কিনা রূপায়িত হয়েছে এক প্রকার রূপকধর্মী উপকথা হিসেবে—
The water level
comes up when
you throw in
stones, bricks,
anything that
sinks. It’s a
miracle when
that works,
don’t you think?
Dry things letting us
drink?
কবিতা ও অ্যাফোরিজমের মতো ভিন্ন দুটি অঞ্চলকে দক্ষিণ কোরিয়ার কবি লি সং-বক এমন এক পরিসরে তার লেখায় একসূত্রে গেঁথেছেন যা বিস্ময়করভাবে নতুন রূপকের সঙ্গে দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও নন্দনতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টিকে হাজির করে।
কবিতা কীভাবে এবং কেন লেখা উচিত তা নিয়ে একগুচ্ছ অ্যাফোরিজমের সংকলন লি-এর “ইনডিটারমিনেট ইনফ্লোরেসেন্স : লেকচারস অন পোয়েট্রি’ বইটি। এতে এমন এক আদর্শ ও মেনিফেস্টো রয়েছে যা এই দুই ফর্মের জন্য অত্যাবশ্যক— যখন কিনা জেনারেটিভ এআই প্রোগ্রাম যেমন চ্যাটজিপিটি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আমাদের হয়ে আমাদের সব লেখা-পড়া করে দেবে এবং আমাদের দৈনন্দিন ফিড ভরে যাচ্ছে অহেতুক কথাবার্তা, রিলস আর বাইট-আকারের ক্ষুব্ধ উক্তিতে।
লি বলেন “আমার চিন্তা সাধারণত দুটি অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘোরে : রূপক আর অ্যাফোরিজম। আমি এগুলোকে বিপরীত হলেও পরস্পর-পরিপূরক বলে দেখি। বাস্তব চাঁদের অদৃশ্য পিঠের মতো, চিরকাল যেন অদেখা। এই কারণেই আমাদের রূপক ও সাহিত্য দরকার : এগুলো অনুপস্থিতির সংকেত দেয়, ঠিক সমুদ্রে ভাসমান বয়ার মতো।”
লি বহু বছর ধরে ফরাসি সাহিত্য ও ক্রিয়েট্রিভ রাইটিংয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ২০১২ সালে অবসর যাওয়ার পরে, তার নেওয়া ক্লাসের নোট সাবেক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে সংগ্রহ করে ইনডিটারমিনেট ইনফ্লোরেসেন্স সংকলনটি করেন।
লি-এর অ্যাফোরিজমগুলো প্রায়ই প্রাচীন কোরিয়ান কাব্যরীতি সিজো-এর মতো রূপ নেয় অনেকটা। এগুলো তিনটি পঙ্ক্তি নিয়ে গঠিত, সব মিলিয়ে পঁয়তাল্লিশটি অক্ষরের সমান। সিজো অনেকটা এক প্রকার ছন্দমাত্রায় কিছুটা বেশি বিস্তৃত হাইকুর মতো।
সিজোর প্রথম পঙ্ক্তি কবিতার মূল ভাবনা হাজির করে; দ্বিতীয় পঙ্ক্তি সেই ভাবনাকে বিস্তার বা অলংকরণ করে; এবং তৃতীয় পঙ্ক্তি পরিচয় করায় একধরনের চমক-এর সাথে যা অ্যাফোরিজমকে সক্রিয় করে, তারপরে কবিতাকে সম্পূর্ণ করে। এই চমক হতে পারে হঠাৎ কোনো বিস্ময়সূচক শব্দ। যেমন ‘আহ!’ বা হঠাৎ চিত্রকল্প বা সুরের পরিবর্তন। লি-এর এক সিজো-সদৃশ তিন-লাইনের অ্যাফোরিজম হলো :
“বারান্দা কেমন হতো কড়ি ছাড়া ভাবো তো।
কেবল কড়িই আমাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়।
লেখা হলো এই কড়িকে সরিয়ে ফেলা।”
ইনডিটারমিনেট ইনফ্লোরেসেন্স বইটি ‘পোয়েট্রি’, ‘রাইটিং’ এবং ‘লাইফ’ তিন অধ্যায়ে বিভক্ত। লি-এর কাব্যচিন্তা ও তার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা নয়: “জীবনযাপন, দেখা আর লেখা একই জিনিস। আমাদের কবিতা-লেখা যন্ত্র হয়ে উঠতে হবে।”
অবশ্য, বাস্তব যন্ত্র তো ইতোমধ্যেই দক্ষতার সঙ্গে কবিতা ও অ্যাফোরিজম লিখতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ নির্দেশনা পেলেই চ্যাটজিপিটি অনায়াসে ম্যাক্সিম, সনেট, হাইকু, এমনকি গ্রহণযোগ্য মানের সিজোও লিখে ফেলতে পারে ইংরেজি, কোরিয়ান বা যেকোনো ভাষায়।
এই এআই সিস্টেমগুলো কয়েক সেকেন্ডেই সেই সব ছন্দবদ্ধ কারিগরি কাজ সম্পন্ন করে, যেমন ভিলানেল-এর জটিল অন্ত্যমিল এবং পুনরাবৃত্তির স্কিম মেনে চলা শিখতে মানব কবির পুরো জীবন লেগে যেতে পারে। এ ধরনের সিস্টেম, যেগুলো কপিরাইটকৃত বইয়ের পাইরেটেড সংস্করণ এবং বিরাট ইন্টারনেট অ্যান্থলজির ওপর প্রশিক্ষিত, একজন মানুষের পক্ষে যত পড়া সম্ভব তার বহু গুণ বেশি পাঠসামগ্রী আত্মস্থ করে।
আর কিছু এআই-নির্মিত লেখালেখি যদি খারাপ হয়ও, তা কি মানুষের খারাপ লেখালেখির চেয়ে খারাপ? যদিও জেনারেটিভ এআই-এর সাহিত্যিক ফলাফল মানুষের লেখার সঙ্গে ক্রমশই কাছাকাছি চলে এসেছে, কিন্তু সাহিত্যিক প্রক্রিয়া মোটেই এক নয়। লি লেখেন, আমাদের “কবিতা-লেখার যন্ত্রে পরিণত হতে হবে” এবং “হয়ে ওঠা” এমন এক প্রক্রিয়া যা কিনা কোনো কম্পিউটারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কোনো অ্যাফোরিজম বা কবিতার ইনপুট হলো লেখকের বেঁচে-থাকার অভিজ্ঞতা, যা অনুকরণ করা সম্ভব নয়। সাধারণীকৃত বাণী তুচ্ছ লাগে, কারণ সেগুলো জেনেরিক। অ্যাফোরিজম ও কবিতা সবসময়ই স্বতন্ত্র।
লি পুরোনো সাংবাদিকতার বাণী “দেখাও, বলো না”—এই নীতিকে অ্যাফোরিজম ও কবিতা রচনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন, যেগুলো, অন্তত আমার কাছে, সবসময় ননফিকশনের কাতারেই থাকবে। লি-র কথায় : “বাতাস কী, তা বলা কঠিন, কিন্তু আমরা সেটি দেখাতে পারি। বিস্তারিত এমনই। অনুভূতি প্রকাশের সর্বোৎকৃষ্ট উপকরণ হলো বিস্তারিত। একটি বিস্তারিত কত শব্দের জায়গা নিতে পারে। যেমন ধরো, বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিনে ভোজের পাশে খেলা করা পাঁচ বছরের একটি ছেলেকে, যে মোমবাতি নিভিয়ে দিচ্ছে, তাকে তুমি কী বলবে?”
অ্যাফোরিজম আর কবিতা জ্ঞানীয় পরিশ্রমকে উপভোগ করে; এরা এআই-এর মতো একে কমিয়ে দিতে চায় না। এরা সচেতনভাবে কিছু না-বলা, অর্ধেক-বলা বা শুধুই ইঙ্গিত দেওয়ার জায়গা রেখে যায়। অ্যাফোরিজম ও কবিতা অদ্ভুত বা বিস্ময়কর কিছুর দিকে আঙুল তোলে, কিন্তু পাঠককে সেই জিনিসটি নিজে দেখে নিতে হয়। এই কারণেই এসব প্রায়ই দুরূহ রূপের পাঠ মানসিকভাবে এত রোমাঞ্চকর: নিজে বুঝে ফেলার আনন্দই আসল! তাই লি-র লেখকদের উদ্দেশে উপদেশ : “একটি ভাব যতই দারুণ হোক, সেটি কবিতায় প্রকাশ করো না। বরং পাঠককে এমনভাবে প্ররোচিত করো যাতে সে কবিতা পড়ে নিজেই সেই দারুণ ভাবটি অনুভব করে।”
অ্যাফোরিজম জীবন ও কবিতার সূত্রগুলো অনুসন্ধানের জন্য একটি প্রোব বা কম্পাসের ভূমিকা পালন করে। লি বলেন, “কবিতা ও অ্যাফোরিজম একই সঙ্গে থাকে কিন্তু ভিন্নও থাকে। তারা একে অপরকে সঙ্গ দেয়, কারণ দুটোই একই চিন্তার স্রোতে ভাসে। কিন্তু তারা আলাদা, কারণ অ্যাফোরিজম কবিতাকে স্ফটিকায়িত করে, যেন কোনো মৃত মানুষের ছাই থেকে তৈরি অলংকার, এটি কবিতার ‘মমি’।”
লি তার দেখা-শোনা-লেখার প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেছেন “জীবনে যা মূল্যবান ও প্রিয়, সেইসব জিনিস খুঁজে ফেরা, যা পুড়ে যাওয়া ঘরের ছাইয়ের নিচেও টিকে থাকে।” “Your pain won’t make even a single leaf turn green” নামে আরেকটি বইয়ে, যেটা এখনো ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি, লি লিখেছেন, “নৈরাশ্যের সঙ্গে লড়তে হলে নিজের তৈরি এক কৃত্রিম নৈরাশ্য সৃষ্টি করতে হয়। এটা যেন দাবানলের আগুন থামাতে, নিয়ন্ত্রিত আগুন জ্বালানোর মতো : নিজের দেহে আগুন ধরিয়ে বিশ্বজনীন শরীরকে অর্জন করা।”
বৌদ্ধধর্মে শরীরা হলো এমন মুক্তো-সদৃশ বস্তু যা আধ্যাত্মিক গুরুর দাহশেষে পাওয়া যায় এবং যেগুলো আশীর্বাদ বয়ে আনে বলে বিশ্বাস করা হয়। শরীর তাই অ্যাফোরিজম ও কবিতার এক যথাযথ রূপক, সংকুচিত, স্ফটিকময় স্মারক, যা লেখকের বুদ্ধির ভস্ম থেকে উত্থিত হয়ে পাঠককে জ্ঞান দেয়।
চাঁদের কলস বা মুন জার আরেকটি স্বতন্ত্র কোরিয়ান শিল্পরীতি। এই দুধসাদা চীনামাটির পাত্রগুলো, যেগুলো মূলত ফুল বা মদ রাখার জন্য তৈরি হতো। এমন নামের কারণ এগুলো বড়ো, গোল আর সাদা, একেবারে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। আকারের কারণে এগুলো দুই ভাগে তৈরি হয়। আর ভেজা মাটির ভারের জন্য পুড়তে গেলে দু’ভাগই কিছুটা বসে যায়।
ফলে চাঁদের কলস কখনো নিখুঁত গোল হয় না, আর যেখানে দুইভাগ মিলেছে সেই সেলাই-রেখা সবসময় হালকা দৃশ্যমান থাকে, এই অসম্পূর্ণতাই চাঁদের কলসের সৌন্দর্যের অপরিহার্য অংশ। লি-এর অ্যাফোরিজমগুলোতেও দেখা যায় সেই একই সেলাই-রেখা, সেই “হয়ে ওঠা”-এর চিহ্ন। বোঝা যায়, নিখুঁত নয়, বরং উপাদানগুলো একত্র করার প্রক্রিয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতই অপূর্ণ হোক না কেন। তিনি লেখেন, “কবিতা হলো খুঁটিনাটির মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণতার পুনরুদ্ধার। একে ভাবো কোনো ক্ষণস্থায়ী দেখা মুখাবয়ব হিসেবে। যেমন ভাঙা খুলি বা ভাঙা মাটির পাত্র একত্র করা হয়, কবিতা ঠিক তেমনই সেই টুকরোগুলো তৈরি করে যা মূল টুকরোগুলোর অনুপস্থিত জায়গাগুলোকে পূরণ করে।”
মূল: লিটহাভ ডট কম
রিপোর্টারের নাম 

























