ঢাকা ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

বিজয়, শহীদ এবং বিতর্কের অন্তহীন যুদ্ধ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩৮:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির কথা, বিজয়ের কথা, যদি বলা হয় তবে তা হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধে বিজয় অর্জনের দিনটি।

আজ থেকে ৫৪ বছর আগে সেদিন যারা শিশু ছিল আজ তারা পৌঁছে গেছে ৬০-এর কোঠায়। একটা স্বাধীন দেশ পাওয়ার গৌরব নিশ্চয়ই তারা বোঝে। সহজ কথা হলো মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের চাইতে বড় কোনো প্রাপ্তি নেই এই বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় জীবনে। যারা বলেন, ‘আমরা একাত্তর দেখি নাই, চব্বিশ দেখেছি’–তারা সত্য কথা বলেন বটে। নিশ্চয়ই তারা একাত্তর দেখেননি, কিন্তু যখন একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশকে তুলনা করেন, সেটা ধৃষ্টতা হয়ে যায়। ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতা, এই মানচিত্র, এই পতাকা–অন্য কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়; হতে পারে না। তাই ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরকে প্রতিস্থাপিত করা যায় না।

৩০ লাখ শহীদের প্রসঙ্গ এলেই একদল মানুষ সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ে পড়েন। সর্বশেষ আমরা দেখলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খান বললেন, বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করেছে, এটা অবান্তর। তার ভাষায়, “যে সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করছে, সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে; আমি মনে করি এটি রীতিমত অবান্তর। কারণ, ওই সময় তারা তাদের জীবন শঙ্কায় ছিলেন।”

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একেবারে নতুন বয়ান হাজির করেছেন। তিনি একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ’ বলে দাবি করেছেন।

এই সব নতুন সব বয়ানকে তারা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে নতুন প্রজন্ম সংশয়ে পড়ে যাচ্ছে। অবশ্য নতুনদের অনেকে আবার ইতিহাস অনুসন্ধানে ব্রতী হয়ে প্রতিবাদও করছে। শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখের কম হলে যেন পাকিস্তানিদের এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের অপরাধের মাত্রা কিছু কম হয়ে যাবে।

১৯৮১ সালের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৩৩তম বছর উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যা স্বল্পতম সময়ে সর্ববৃহৎ। সেই সময় প্রতিদিন গড় প্রাণহানির সংখ্যা ছয় থেকে ১২ হাজার। পৃথিবীর গণহত্যার ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ গড়।

পৃথিবীর কোনো গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা তালিকা ধরে গণনা করে নির্ণয় করা হয়নি। বাস্তবে তা সম্ভবও ছিল না। গণহত্যার পরিসংখ্যান করার সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রুডলফ যোসেফ রুমেল। ‘এস্টিমেটিং ডেমোসাইড: মেথডস অ্যান্ড প্রোসিডিওরস’ নিবন্ধে তিনি এই পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। এক কথায় এই পদ্ধতিটি এমন যে, গণহত্যার সময় প্রতিদিন নিহতের গড় সংখ্যাকে যতদিন গণহত্যা চলেছে সেই সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে মোট গণহত্যার সংখ্যাটি পাওয়া যায়। রুমেল রচিত ‘স্ট্যাটিসটিক্স অব ডেমোসাইড’ গ্রন্থটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে– ‘স্ট্যাটিসটিক্স অব পাকিস্তান ডেমোসাইড, স্টিমেটস ক্যালকুলেশন অ্যান্ড সোর্সেস’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ। যেখানে তিনি তার আবিষ্কৃত গণহত্যার পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ১৯৭১ সালের গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ তিন হাজার।

গত কিছুদিন ধরে দেখছি, সংখ্যার রাজনীতি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই উপ-উপাচার্য ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের মতো যারা পাকিস্তানিদের দায় মুক্তি দিতে চান, তারা আসলে তাদের পূর্বসূরিদের, তাদের দলের সাবেক নেতাদের অপরাধও কমাতে চাইছেন। বুঝতে পারছেন না, এতে তাদের অপরাধের পাল্লা আরও ভারী হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য বলছেন, ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা পালানোর চেষ্টা করছিল বলে দাবি করেন। অথচ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী এক সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার করে বলেছেন, ভারতীয়দের সঙ্গে তার যোগাযোগই শুরু হয় ১৪ ডিসেম্বর, মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে।

১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। নিয়াজীর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছে ‘পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর’ নামের বইয়ে।

খোদ পাকিস্তান যখন একাত্তরের হত্যাযজ্ঞের জন্য তাদের সেনাবাহিনীকে সমালোচনা করছে, তখন বাংলাদেশে নতুন করে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানে বেলুচ রাজনীতিবিদ ও নারী অধিকারকর্মী নায়লা কাদরি বলেছেন, “ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান সমগ্র বিশ্বে সবচাইতে বেশি মুসলিম হত্যা করেছে। বাংলাদেশে ৩০ লাখ, আফগানিস্তানে চার লাখ, বেলুচিস্তানে দুই লাখ।”

পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও বাংলাদেশে তাদের দ্বারা সংগঠিত গণহত্যা নিয়ে একই ধরণের কথা উচ্চারণ করেছেন জনসমক্ষে। কাজেই ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক নেহায়েত কুতর্ক বৈ কিছু নয়।

শুধু ৩০ লাখ শহীদই নয় আরো দুই লাখ নারীর ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন-সম্ভ্রমহানি, পরবর্তীতে গর্ভপাত এবং যুদ্ধশিশুর জন্ম। যাদের খবর কেউ জানে না। কিন্তু আজকাল দেখছি, কতিপয় ইউটিবার মাঠে নেমেছেন, এটা প্রমাণ করতে যে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধারা মিছেমিছি পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা যেন স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয় স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসে আমরা নিজেদের শৃঙ্খলাবোধও ভুলে যাই। রাষ্ট্রকর্তৃক বিরুদ্ধ মতের দমনপীড়ন বাংলাদেশের জন্ম থেকেই আমাদের বৈশিষ্ট্য। দুর্নীতি, আইন অমান্য করার প্রবণতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যায়। সবাই বা সবকিছু তো এক রকম নয়। সর্বকালে সবখানে অনেক ভালো মানুষ থাকে। অন্তত আপাত ভালো–‘ওরা কাজ করে নগরে বন্দরে’। অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও সময়ের সঙ্গে দেশও এগোয়। এই এগোনো মাঝে মাঝে তৈলাক্ত বাঁশ ও বানরের মতো–কয় ফুট উঠল, কয় ফুট নামল–সে এক জটিল সমীকরণ।

৫৪ বছরে আমাদের দেশের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন থেকে ভিন্নতরভাবে লেখা হয়েছে অন্তত চারবার। আমাদের শিশুদের ইতিহাস জানবার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নয় মাসের যুদ্ধে পরিণত করা হয়েছে। তা-ও মন্দের ভালো। আগামী দিনে ‘পাকিস্তানিরা বুদ্ধিজীবী হত্যা করেনি’ বলে আওয়াজ তুলেছেন যারা, তারা আরেকটু ক্ষমতাবান হলে হয়তো বলবেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু হয়নি।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একটি সুষ্ঠুধারার রাজনীতির সূচনা হয়েছিল মাত্র। কিন্তু তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এদেশে কোনো নির্বাচিত সরকার বা রাজনৈতিক সরকার কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারেনি। এভাবেই আমরা দুর্নীতিতে প্রথম দ্বিতীয় হতে লাগলাম। আমাদের একবার বলা হলো তোমরা এখন ‘ডিজিটাল’। তারপর বলা হলো এখন তোমরা ‘স্মার্ট’ হয়ে গেছ। আমরা ভুলে গেলাম স্মার্ট শব্দের অর্থ চৌকশ। আর বিষয়টা ভেতর থেকে আসতে হয়, আরোপ করা যায় না। আমাদের পদ্মাসেতু হলো। আমাদের মেট্রোরেল চালু হলো। কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল হলো (বঙ্গবন্ধু টানেল)। এখন আবার বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়ার ওপরে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আমাদের আবার বোল পাল্টে পাল্টে অভ্যাস হয়ে গেছে। একেক সময় একেক গোষ্ঠীর প্রতি বলতে হবে ‘আমি তোমারই গান গাই’।

প্রায় দুই দশক কাল যে কথা বলা হতো না বলা যেত না সেই নাম গান স্তুতি গাইতে গাইতে বেগমপাড়ায় বাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে। সুইসব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বর্ধিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায়। বে-নজির হয়ে ‘হাউন আঙ্কেল’ ভাতের হোটেল চালু করেন। গুম-খুন-দমন-পীড়ন চলে সামান্য বিরুদ্ধাচরণে রাজাকার শব্দের যথেচ্ছো ব্যবহার, ট্যাগিং একটা একটা রীতি হয়ে গিয়েছিল। ফ্যাসিবাদ ১৭ বছর ধরে ইটালি থেকে হেঁটে হেঁটে চলে আসল আমাদের দেশে। ফ্যাসিবাদের কেন্দ্রে একজন থাকে একনায়ক। প্রচণ্ড অহঙ্কারী হয় সে। আর অহঙ্কার পতন ঘটায়। মেধাবীরা নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে পরিচয় দেয় রাজপথে।

আবার মৃত্যু আর মৃত্যু। একমাস সময়ের মধ্যে চৌদ্দশ’ মানুষ নিহত হয়। কেউ কি বলতে পারে আর কত প্রাণের বিনিময়ে শান্তি অন্তত স্বস্তি আসতে পারে আমাদের জাতীয় জীবনে। প্রথমে কেউ কেউ বলতে চাইছিল এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা। কেউ বললো এটা বিপ্লব। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান যে ঘটেছে এটা অনস্বীকার্য। কোনো দল বা গোষ্ঠী কোনো দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে তখন তা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সেই আন্দোলনে যখন সাধারণ মানুষ সমর্থন দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে তখন তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে, হয় কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার নজির নেই বললেই চলে।

মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায় অভ্যুত্থান ঘটায়। কিন্তু অনেক রক্তক্ষয়ের পরও নেতিবাচক পরিণতি পরিলক্ষিত হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, হতাশ হয়ে পড়ে। চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলনের পর আমরা মগের মুল্লুক থেকে ‘মবের মুল্লুকে’ প্রবেশ করি। প্রতিনিয়ত দেখা যেতে থাকে একদল মানুষ লাঠি হাতে মারমুখি হয়ে ছুটছে এবং মারছে, ভাঙছে, আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। নিজেদেরকে তারা ‘তৌহিদী জনতা’ অভিহিত করেছে। আদতে তৌহিদী জনতার নামে বাংলাদেশে কি কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠী আছে? বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির একটা অংশ এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী যখন কোথাও ভাঙচুর লুটতরাজ করতে চায় তখন তারা মাদ্রাসার ছাত্র বেকার যুবক ভাড়াটে লোক জড়ো করে এবং নাম দেওয়া হয় তৌহিদী জনতা। এই তৌহিদী জনতা মাজার ভেঙেছে, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্মৃতিস্তম্ভ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বাউল গানের আসরে হামলা করা হয়েছে। বাউলদের মারধর করা হচ্ছে, জোরপূর্বক চুল-দাড়ি কেটে দেওয়ার নজির চলমান। কবর থেকে লাশ তুলে জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের কথা প্রকাশ হতে থাকে নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’। মেটিকুলাস শব্দের অর্থ ‘অত্যন্ত যত্মবান’। ছাত্রলীগের পদপদবিধারী গুপ্ত শিবির বের হয়ে এসে বলে, তারা বিপ্লব ত্বরান্বিত করেছে। মেধাবীদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশ নিয়ে কথায় এবং কাজে অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়। কেউবা চাঁদাবাজি করে ধরাও পড়ে। আবার কেউ পূর্বপুরুষের জমিদারি খুঁজে পায়। মহাড়ম্বরে তরুণ মেধাবীরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। দাতাদের নিরাপত্তার স্বার্থে দলের তহবিলের উৎস গোপন রাখা হয়। অর্থাভাবে চলা মেধাবী নেতাদের দামি গাড়ি ব্যবহার করতে দেখা যায়। যারা রাস্তায় স্লোগান দিয়েছিল ‘কোটা না মেধা/মেধা মেধা’ তারাই অঘোষিত কোটা সংরক্ষণ-বিতরণ করতে থাকে। এমনকি জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও বেশুমার কথাবার্তা চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার, গণভোট, পিআর পদ্ধতি, উচ্চকক্ষ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মানুষ এক গোলকধাঁধাঁয় পড়ে যায়। জুলাই শহীদদের প্রাণের বিনিময়ে জুলাইযোদ্ধাদের অঙ্গহানির বিনিময়ে তারা আইন-সংবিধান সবকিছু নিজেদের সুবিধামতো করে সাজাতে চায় এবং এজন্য বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করেও আনা হয়। জুলাই আন্দোলনে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দ্বারা অশালীন ভাষায় সমালোচিত হয়। অতঃপর তা দূরে সরিয়ে রাখা হয়। নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের দিন মঞ্চের পাদদেশে শহীদ আবু সাঈদের বীরোচিত ছবিটি ব্যবহার করা হয়। চব্বিশের আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট শহীদ আবু সাঈদ কি তা দেখতে পায়? মুগ্ধ কিংবা রুদ্র অথবা সেই তরুণ যে প্রাণ হারিয়েছে রাষ্ট্র অথবা জনতার দ্বারা যার নাম কেউ স্মরণ করে না–তারা সবাই কি এমনটা চেয়েছিল? জানবার কোনো উপায় নেই। শহীদেরা যে কখনো কথা বলে না, বলতে পারে না। শহীদেরা মহান হয়। আর যারা বেঁচে থাকে তারা কি লোভী হয়ে ওঠে এবং বিপথে যায়?

গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার থেকে ইসলামপন্থী দলগুলো এমন একটা ভাব প্রকাশ করতে থাকে যেন দেশে একটা ইসলামি বিপ্লব ঘটে গেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর স্বীয় চরিত্র প্রকট হতে থাকে। তারা কখনো ভোটের বিনিময়ে বেহেশতের টিকিট বিক্রি করে, কখনো প্রশাসনকে তাদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য করার কথা বলে। বিভিন্ন প্যাঁচ কষে তারা বলে যে, কেন তারা এদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্মৃতি, স্মারক সবই তারা মুছে দিতে চায়। যা আদতে কখনো সম্ভব নয়। জামায়াত ইসলামী তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের অংশ ছিল। তাদের তিন জন মন্ত্রী ছিল সেই সময়ে। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামের বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে শুধু সহযোগিতাই করেনি নিজেরাও যাবতীয় অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল। পাকিস্তানের দোসর জামায়াতে ইসলামী এখন বাংলাদেশে শুধু রাজনীতিই করছে না তারা যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ারও পাঁয়তারা করছে। শামসুর রাহমানের ‘উদ্ভট উট’ এখন আরো উদ্ভটতর হয়েছে, তাদের হাতে পড়ে।

কিছু সংখ্যক মানুষ এদেশে জিন্নাহ্‌র জন্মদিন পালন করেছে। ২০২৫-এর বিজয় দিবসের আগে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানও শোনা গেছে বাংলাদেশের মাটিতে। এক জামায়াত নেতা বিজয় দিবসকে কালো দিবস বলতে চেয়েছেন–তাও আবার সিরাজ সিকদারের বরাত দিয়ে।

৪৭ তম বিসিএস-এর ‘বাংলাদেশ বিষয়াবলি’ বিষয়ের প্রশ্নপত্রে মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পরিবর্তে ‘দখলদার বাহিনী’ লেখা কী ধরণের মনোভাব প্রকাশ করে? বিজয়ের মাসের শুরুতেই সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে যা প্রধান উপাদেষ্টার দাপ্তরিক পেইজ থেকেও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে লেখা আছে ‘যতোবার বাঁধতে চাইবে পরাধীনতার শেকলে/ ততোবার জন্ম নিবে আবরার, আবু সাঈদেরা। বিজয়ের মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি ২৪-এর প্রজন্মের দৃপ্ত এই অঙ্গীকার।’ এই অন্তবর্তীকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাসের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের কথা উল্লেখ করছে না, কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম নিচ্ছে না। সেই ফটোকার্ডে আরো লেখা আছে ‘৭১ স্পন্দিত হয় ২৪-এ’। একাত্তরকে চব্বিশে প্রতিস্থাপন করার হীনপ্রয়াস কি দেখতে পায় বদি, রুমি, আজাদেরা অথবা সেই নাম না জানা কিশোর কিংবা তরুণ যার রক্তে সবুজ জমিনের মাঝে আঁকা হয়েছে লাল বৃত্ত? ইতিহাস যখন কুতর্কে ঢেকে যায়, শহীদেরা তখন আরও একবার মারা যান।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বৈরুতে ভয়াবহ বিমান হামলা: ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে লেবাননের নালিশ

বিজয়, শহীদ এবং বিতর্কের অন্তহীন যুদ্ধ

আপডেট সময় : ১২:৩৮:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির কথা, বিজয়ের কথা, যদি বলা হয় তবে তা হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধে বিজয় অর্জনের দিনটি।

আজ থেকে ৫৪ বছর আগে সেদিন যারা শিশু ছিল আজ তারা পৌঁছে গেছে ৬০-এর কোঠায়। একটা স্বাধীন দেশ পাওয়ার গৌরব নিশ্চয়ই তারা বোঝে। সহজ কথা হলো মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের চাইতে বড় কোনো প্রাপ্তি নেই এই বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় জীবনে। যারা বলেন, ‘আমরা একাত্তর দেখি নাই, চব্বিশ দেখেছি’–তারা সত্য কথা বলেন বটে। নিশ্চয়ই তারা একাত্তর দেখেননি, কিন্তু যখন একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশকে তুলনা করেন, সেটা ধৃষ্টতা হয়ে যায়। ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতা, এই মানচিত্র, এই পতাকা–অন্য কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়; হতে পারে না। তাই ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরকে প্রতিস্থাপিত করা যায় না।

৩০ লাখ শহীদের প্রসঙ্গ এলেই একদল মানুষ সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ে পড়েন। সর্বশেষ আমরা দেখলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খান বললেন, বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করেছে, এটা অবান্তর। তার ভাষায়, “যে সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করছে, সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে; আমি মনে করি এটি রীতিমত অবান্তর। কারণ, ওই সময় তারা তাদের জীবন শঙ্কায় ছিলেন।”

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একেবারে নতুন বয়ান হাজির করেছেন। তিনি একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ’ বলে দাবি করেছেন।

এই সব নতুন সব বয়ানকে তারা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে নতুন প্রজন্ম সংশয়ে পড়ে যাচ্ছে। অবশ্য নতুনদের অনেকে আবার ইতিহাস অনুসন্ধানে ব্রতী হয়ে প্রতিবাদও করছে। শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখের কম হলে যেন পাকিস্তানিদের এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের অপরাধের মাত্রা কিছু কম হয়ে যাবে।

১৯৮১ সালের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৩৩তম বছর উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যা স্বল্পতম সময়ে সর্ববৃহৎ। সেই সময় প্রতিদিন গড় প্রাণহানির সংখ্যা ছয় থেকে ১২ হাজার। পৃথিবীর গণহত্যার ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ গড়।

পৃথিবীর কোনো গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা তালিকা ধরে গণনা করে নির্ণয় করা হয়নি। বাস্তবে তা সম্ভবও ছিল না। গণহত্যার পরিসংখ্যান করার সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রুডলফ যোসেফ রুমেল। ‘এস্টিমেটিং ডেমোসাইড: মেথডস অ্যান্ড প্রোসিডিওরস’ নিবন্ধে তিনি এই পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। এক কথায় এই পদ্ধতিটি এমন যে, গণহত্যার সময় প্রতিদিন নিহতের গড় সংখ্যাকে যতদিন গণহত্যা চলেছে সেই সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে মোট গণহত্যার সংখ্যাটি পাওয়া যায়। রুমেল রচিত ‘স্ট্যাটিসটিক্স অব ডেমোসাইড’ গ্রন্থটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে– ‘স্ট্যাটিসটিক্স অব পাকিস্তান ডেমোসাইড, স্টিমেটস ক্যালকুলেশন অ্যান্ড সোর্সেস’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ। যেখানে তিনি তার আবিষ্কৃত গণহত্যার পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ১৯৭১ সালের গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ তিন হাজার।

গত কিছুদিন ধরে দেখছি, সংখ্যার রাজনীতি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই উপ-উপাচার্য ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের মতো যারা পাকিস্তানিদের দায় মুক্তি দিতে চান, তারা আসলে তাদের পূর্বসূরিদের, তাদের দলের সাবেক নেতাদের অপরাধও কমাতে চাইছেন। বুঝতে পারছেন না, এতে তাদের অপরাধের পাল্লা আরও ভারী হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য বলছেন, ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা পালানোর চেষ্টা করছিল বলে দাবি করেন। অথচ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী এক সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার করে বলেছেন, ভারতীয়দের সঙ্গে তার যোগাযোগই শুরু হয় ১৪ ডিসেম্বর, মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে।

১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। নিয়াজীর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছে ‘পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর’ নামের বইয়ে।

খোদ পাকিস্তান যখন একাত্তরের হত্যাযজ্ঞের জন্য তাদের সেনাবাহিনীকে সমালোচনা করছে, তখন বাংলাদেশে নতুন করে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানে বেলুচ রাজনীতিবিদ ও নারী অধিকারকর্মী নায়লা কাদরি বলেছেন, “ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান সমগ্র বিশ্বে সবচাইতে বেশি মুসলিম হত্যা করেছে। বাংলাদেশে ৩০ লাখ, আফগানিস্তানে চার লাখ, বেলুচিস্তানে দুই লাখ।”

পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও বাংলাদেশে তাদের দ্বারা সংগঠিত গণহত্যা নিয়ে একই ধরণের কথা উচ্চারণ করেছেন জনসমক্ষে। কাজেই ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক নেহায়েত কুতর্ক বৈ কিছু নয়।

শুধু ৩০ লাখ শহীদই নয় আরো দুই লাখ নারীর ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন-সম্ভ্রমহানি, পরবর্তীতে গর্ভপাত এবং যুদ্ধশিশুর জন্ম। যাদের খবর কেউ জানে না। কিন্তু আজকাল দেখছি, কতিপয় ইউটিবার মাঠে নেমেছেন, এটা প্রমাণ করতে যে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধারা মিছেমিছি পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা যেন স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয় স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসে আমরা নিজেদের শৃঙ্খলাবোধও ভুলে যাই। রাষ্ট্রকর্তৃক বিরুদ্ধ মতের দমনপীড়ন বাংলাদেশের জন্ম থেকেই আমাদের বৈশিষ্ট্য। দুর্নীতি, আইন অমান্য করার প্রবণতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যায়। সবাই বা সবকিছু তো এক রকম নয়। সর্বকালে সবখানে অনেক ভালো মানুষ থাকে। অন্তত আপাত ভালো–‘ওরা কাজ করে নগরে বন্দরে’। অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও সময়ের সঙ্গে দেশও এগোয়। এই এগোনো মাঝে মাঝে তৈলাক্ত বাঁশ ও বানরের মতো–কয় ফুট উঠল, কয় ফুট নামল–সে এক জটিল সমীকরণ।

৫৪ বছরে আমাদের দেশের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন থেকে ভিন্নতরভাবে লেখা হয়েছে অন্তত চারবার। আমাদের শিশুদের ইতিহাস জানবার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নয় মাসের যুদ্ধে পরিণত করা হয়েছে। তা-ও মন্দের ভালো। আগামী দিনে ‘পাকিস্তানিরা বুদ্ধিজীবী হত্যা করেনি’ বলে আওয়াজ তুলেছেন যারা, তারা আরেকটু ক্ষমতাবান হলে হয়তো বলবেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু হয়নি।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একটি সুষ্ঠুধারার রাজনীতির সূচনা হয়েছিল মাত্র। কিন্তু তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এদেশে কোনো নির্বাচিত সরকার বা রাজনৈতিক সরকার কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারেনি। এভাবেই আমরা দুর্নীতিতে প্রথম দ্বিতীয় হতে লাগলাম। আমাদের একবার বলা হলো তোমরা এখন ‘ডিজিটাল’। তারপর বলা হলো এখন তোমরা ‘স্মার্ট’ হয়ে গেছ। আমরা ভুলে গেলাম স্মার্ট শব্দের অর্থ চৌকশ। আর বিষয়টা ভেতর থেকে আসতে হয়, আরোপ করা যায় না। আমাদের পদ্মাসেতু হলো। আমাদের মেট্রোরেল চালু হলো। কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল হলো (বঙ্গবন্ধু টানেল)। এখন আবার বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়ার ওপরে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আমাদের আবার বোল পাল্টে পাল্টে অভ্যাস হয়ে গেছে। একেক সময় একেক গোষ্ঠীর প্রতি বলতে হবে ‘আমি তোমারই গান গাই’।

প্রায় দুই দশক কাল যে কথা বলা হতো না বলা যেত না সেই নাম গান স্তুতি গাইতে গাইতে বেগমপাড়ায় বাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে। সুইসব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বর্ধিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায়। বে-নজির হয়ে ‘হাউন আঙ্কেল’ ভাতের হোটেল চালু করেন। গুম-খুন-দমন-পীড়ন চলে সামান্য বিরুদ্ধাচরণে রাজাকার শব্দের যথেচ্ছো ব্যবহার, ট্যাগিং একটা একটা রীতি হয়ে গিয়েছিল। ফ্যাসিবাদ ১৭ বছর ধরে ইটালি থেকে হেঁটে হেঁটে চলে আসল আমাদের দেশে। ফ্যাসিবাদের কেন্দ্রে একজন থাকে একনায়ক। প্রচণ্ড অহঙ্কারী হয় সে। আর অহঙ্কার পতন ঘটায়। মেধাবীরা নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে পরিচয় দেয় রাজপথে।

আবার মৃত্যু আর মৃত্যু। একমাস সময়ের মধ্যে চৌদ্দশ’ মানুষ নিহত হয়। কেউ কি বলতে পারে আর কত প্রাণের বিনিময়ে শান্তি অন্তত স্বস্তি আসতে পারে আমাদের জাতীয় জীবনে। প্রথমে কেউ কেউ বলতে চাইছিল এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা। কেউ বললো এটা বিপ্লব। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান যে ঘটেছে এটা অনস্বীকার্য। কোনো দল বা গোষ্ঠী কোনো দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে তখন তা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সেই আন্দোলনে যখন সাধারণ মানুষ সমর্থন দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে তখন তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে, হয় কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার নজির নেই বললেই চলে।

মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায় অভ্যুত্থান ঘটায়। কিন্তু অনেক রক্তক্ষয়ের পরও নেতিবাচক পরিণতি পরিলক্ষিত হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, হতাশ হয়ে পড়ে। চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলনের পর আমরা মগের মুল্লুক থেকে ‘মবের মুল্লুকে’ প্রবেশ করি। প্রতিনিয়ত দেখা যেতে থাকে একদল মানুষ লাঠি হাতে মারমুখি হয়ে ছুটছে এবং মারছে, ভাঙছে, আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। নিজেদেরকে তারা ‘তৌহিদী জনতা’ অভিহিত করেছে। আদতে তৌহিদী জনতার নামে বাংলাদেশে কি কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠী আছে? বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির একটা অংশ এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী যখন কোথাও ভাঙচুর লুটতরাজ করতে চায় তখন তারা মাদ্রাসার ছাত্র বেকার যুবক ভাড়াটে লোক জড়ো করে এবং নাম দেওয়া হয় তৌহিদী জনতা। এই তৌহিদী জনতা মাজার ভেঙেছে, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্মৃতিস্তম্ভ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বাউল গানের আসরে হামলা করা হয়েছে। বাউলদের মারধর করা হচ্ছে, জোরপূর্বক চুল-দাড়ি কেটে দেওয়ার নজির চলমান। কবর থেকে লাশ তুলে জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের কথা প্রকাশ হতে থাকে নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’। মেটিকুলাস শব্দের অর্থ ‘অত্যন্ত যত্মবান’। ছাত্রলীগের পদপদবিধারী গুপ্ত শিবির বের হয়ে এসে বলে, তারা বিপ্লব ত্বরান্বিত করেছে। মেধাবীদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশ নিয়ে কথায় এবং কাজে অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়। কেউবা চাঁদাবাজি করে ধরাও পড়ে। আবার কেউ পূর্বপুরুষের জমিদারি খুঁজে পায়। মহাড়ম্বরে তরুণ মেধাবীরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। দাতাদের নিরাপত্তার স্বার্থে দলের তহবিলের উৎস গোপন রাখা হয়। অর্থাভাবে চলা মেধাবী নেতাদের দামি গাড়ি ব্যবহার করতে দেখা যায়। যারা রাস্তায় স্লোগান দিয়েছিল ‘কোটা না মেধা/মেধা মেধা’ তারাই অঘোষিত কোটা সংরক্ষণ-বিতরণ করতে থাকে। এমনকি জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও বেশুমার কথাবার্তা চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার, গণভোট, পিআর পদ্ধতি, উচ্চকক্ষ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মানুষ এক গোলকধাঁধাঁয় পড়ে যায়। জুলাই শহীদদের প্রাণের বিনিময়ে জুলাইযোদ্ধাদের অঙ্গহানির বিনিময়ে তারা আইন-সংবিধান সবকিছু নিজেদের সুবিধামতো করে সাজাতে চায় এবং এজন্য বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করেও আনা হয়। জুলাই আন্দোলনে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দ্বারা অশালীন ভাষায় সমালোচিত হয়। অতঃপর তা দূরে সরিয়ে রাখা হয়। নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের দিন মঞ্চের পাদদেশে শহীদ আবু সাঈদের বীরোচিত ছবিটি ব্যবহার করা হয়। চব্বিশের আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট শহীদ আবু সাঈদ কি তা দেখতে পায়? মুগ্ধ কিংবা রুদ্র অথবা সেই তরুণ যে প্রাণ হারিয়েছে রাষ্ট্র অথবা জনতার দ্বারা যার নাম কেউ স্মরণ করে না–তারা সবাই কি এমনটা চেয়েছিল? জানবার কোনো উপায় নেই। শহীদেরা যে কখনো কথা বলে না, বলতে পারে না। শহীদেরা মহান হয়। আর যারা বেঁচে থাকে তারা কি লোভী হয়ে ওঠে এবং বিপথে যায়?

গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার থেকে ইসলামপন্থী দলগুলো এমন একটা ভাব প্রকাশ করতে থাকে যেন দেশে একটা ইসলামি বিপ্লব ঘটে গেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর স্বীয় চরিত্র প্রকট হতে থাকে। তারা কখনো ভোটের বিনিময়ে বেহেশতের টিকিট বিক্রি করে, কখনো প্রশাসনকে তাদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য করার কথা বলে। বিভিন্ন প্যাঁচ কষে তারা বলে যে, কেন তারা এদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্মৃতি, স্মারক সবই তারা মুছে দিতে চায়। যা আদতে কখনো সম্ভব নয়। জামায়াত ইসলামী তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের অংশ ছিল। তাদের তিন জন মন্ত্রী ছিল সেই সময়ে। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামের বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে শুধু সহযোগিতাই করেনি নিজেরাও যাবতীয় অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল। পাকিস্তানের দোসর জামায়াতে ইসলামী এখন বাংলাদেশে শুধু রাজনীতিই করছে না তারা যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ারও পাঁয়তারা করছে। শামসুর রাহমানের ‘উদ্ভট উট’ এখন আরো উদ্ভটতর হয়েছে, তাদের হাতে পড়ে।

কিছু সংখ্যক মানুষ এদেশে জিন্নাহ্‌র জন্মদিন পালন করেছে। ২০২৫-এর বিজয় দিবসের আগে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানও শোনা গেছে বাংলাদেশের মাটিতে। এক জামায়াত নেতা বিজয় দিবসকে কালো দিবস বলতে চেয়েছেন–তাও আবার সিরাজ সিকদারের বরাত দিয়ে।

৪৭ তম বিসিএস-এর ‘বাংলাদেশ বিষয়াবলি’ বিষয়ের প্রশ্নপত্রে মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পরিবর্তে ‘দখলদার বাহিনী’ লেখা কী ধরণের মনোভাব প্রকাশ করে? বিজয়ের মাসের শুরুতেই সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে যা প্রধান উপাদেষ্টার দাপ্তরিক পেইজ থেকেও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে লেখা আছে ‘যতোবার বাঁধতে চাইবে পরাধীনতার শেকলে/ ততোবার জন্ম নিবে আবরার, আবু সাঈদেরা। বিজয়ের মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি ২৪-এর প্রজন্মের দৃপ্ত এই অঙ্গীকার।’ এই অন্তবর্তীকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাসের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের কথা উল্লেখ করছে না, কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম নিচ্ছে না। সেই ফটোকার্ডে আরো লেখা আছে ‘৭১ স্পন্দিত হয় ২৪-এ’। একাত্তরকে চব্বিশে প্রতিস্থাপন করার হীনপ্রয়াস কি দেখতে পায় বদি, রুমি, আজাদেরা অথবা সেই নাম না জানা কিশোর কিংবা তরুণ যার রক্তে সবুজ জমিনের মাঝে আঁকা হয়েছে লাল বৃত্ত? ইতিহাস যখন কুতর্কে ঢেকে যায়, শহীদেরা তখন আরও একবার মারা যান।