ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে মন্তব্য করার পরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও এই হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ দেখছেন না। ভোটের আগে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কাছ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ দেখতে চেয়েছেন তারা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম মনে করেন, এমন ঘটনা চলতে থাকলে তা এবারের ভিন্ন পরিস্থিতিতে তরুণ ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সোমবার সকালে করা সিইসির এ বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য এবং বিভিন্ন জনের সমালোচনার মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, সিইসি ওই দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার রাখেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর পক্ষ থেকে এ মন্তব্য প্রত্যাহার করার দাবি তোলা হয়েছে।
সিইসি কী বলেছিলেন?
রাজধানীর গুলশানে সোমবার সকালে এক অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনশৃঙ্খলার অবনতি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা কি না, এমন জিজ্ঞাসায় সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন:
“আইনশৃঙ্খলার অবনতি হল কোথায়? একটু মাঝেমধ্যে দুই একটা খুন-খারাবি হয়। এই যে হাদীর একটা ঘটনা হয়েছে। আমরা এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করি। এ ধরনের ঘটনা তো সবসময় ছিল। আগে কি আহসানউল্লাহ মাস্টার খুন হয় নাই? এরকম তো অনেক আগেও হয়েছে, ঘটনা তো অনেক আছে। আমাদের কিবরিয়া সাহেব যে ফরমার ফরেন মিনিস্টার (সাবেক অর্থমন্ত্রী), কিবরিয়া সাহেব খুন হন নাই? নির্বাচন আসলে এ ধরনের ঘটনা হয়। বাংলাদেশে এগুলো নতুন কিছু না। সুতরাং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বরং উন্নতি হয়েছে।”
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসা আততায়ীর গুলিতে মাথায় আঘাত পান। এ ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে করা বক্তব্যে সিইসি নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই বলেও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যাই আসুক না কেন, যত ধরনের দুশ্চিন্তা আপনাদের মাথায় আসুক না কেন, দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন, আপনারা সবাই মিলে যাতে একটা সুন্দর নির্বাচন আমরা করতে পারি।”
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা
এ নিয়ে নানা মহলের নানা কথার মধ্যে রাতে হাদিকে নিয়ে সিইসির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সিইসি বক্তব্যে বোঝাতে চেয়েছেন, ওসমান হাদির উপর সন্ত্রাসী হামলা আসন্ন নির্বাচনকে বাধাগ্রস্থ করতে পারবে না। কমিশন তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে এবং তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। সিইসির বক্তব্যের বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবসানও হবে বলে আশা করছে কমিশন।
‘এগুলো প্রভাব ফেলতে পারে’
তফসিল হতে না হতেই সম্ভাব্য প্রার্থী হাদির ওপর হামলার ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেখছেন না নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “তার আগে আরও কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে। বরিশালে ফুয়াদের ওপর যে ঘটনাটা হয়েছে, নোয়াখালীতে তানিয়া রবের ওপর যা হয়েছে, সিরাজগঞ্জে জামায়াতের প্রার্থীর ওপরে যা হয়েছে। এ ঘটনাগুলো থেমে যায় তাহলে বিচ্ছিন্ন, যদি অব্যাহত থাকে তাহলে বিচ্ছিন্ন বলে দেখার সুযোগ নেই।”
চব্বিশের আন্দোলনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে অবশ্যই নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনটা একটু অন্যরকম। গত তিনটি নির্বাচনের পর এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোটার ভোট দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগই তরুণ ভোটার। তাই এ ধরনের ঘটনা তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ সাব্বির আহমেদ সিইসির এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটা নিয়ে এখনো কোনো তদন্ত হয়নি। কোনরকম তদন্ত ছাড়াই উনি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দিলেন? তার মানে এটা বলার মধ্য দিয়ে তিনি ঘটনার বিষয়টা তিনি একেবারে হালকা করে দিয়েছেন না? এটা তিনি বলতে পারেন না। এইটা তো খুবই একটা অশোভন কথা হল…।” তিনি আরও বলেন, “আপনি তদন্ত ছাড়া এটাকে বলতে পারেন না। কারণ এটার সাথে অনেক নেটওয়ার্ক জড়িত থাকতে পারে। উনি (সিইসি) কি বোঝেন না বিষয়টা; একটা লোক গুলি করে একেবারে সবার সামনে দিয়ে চলে গেল দেশ ছেড়ে। এটাকে উনি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেন, এটার মধ্যে যদি কোনো বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র না থাকে।”
অন্যদিকে, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা মন্তব্য করেছেন যে তদন্তকারী ছাড়া অন্যদের ধারণা জনস্বার্থে কোনো কাজে আসে না। তিনি বলেন, “এটা এখনতো তদন্ত যারা করে তারা বলতে পারবে। সিইসির কাছে হয়তো কোনো তথ্য আছে, যার জন্য উনি বলেছেন যে এইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।” তিনি বলেন, “তদন্ত যারা করে যারা আশেপাশে দেখছে বা গোয়েন্দা যারা দেখছে এগুলো আশেপাশে, তারা তো বলে নাই (এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা)।” নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো বিপরীতমুখী হতেই পারে মন্তব্য করে তিনি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির জন্য সরকারকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
রিপোর্টারের নাম 

























