ঢাকা ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

‘হয়তো আমরা যোগ্য নই, তাই স্বাধীনতা পদক দেয়নি’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৪:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলা দল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পতাকাতলে ফুটবলাররা ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার ও বারাণসীসহ বিভিন্ন শহরে ১৭টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে জনমত গড়েছিল। সেই দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। যিনি ফুটবল ও হকিতে সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। খেলেছেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ জাতীয় দলেও। দেশের ৫৪তম বিজয় দিবসে ৮৩ বছর বয়সে এসে স্মৃতিচারণ করলেন। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে নতুন করে যেন অর্গল খুলে দিলেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: দেখতে দেখতে জাতি আজ ৫৪তম মহান বিজয় দিবস পালন করছে। এই বয়সে এসে আপনার অনুভূতি কেমন। এখনও কী স্বাধীনতার সেই দিনগুলোর কথা পরিষ্কার মনে পড়ে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: বিজয় দিবস মানেই অন্য রকম অনুভূতি। এই দিনটা আমার কাছে বিশেষ কিছুই। আমরা পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়েছিল। আমরা বিজয় দেখতে পেয়েছিলাম। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে থাকবো। এখনও সব কিছুই আগের মতো স্মৃতিতে উজ্জ্বল আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আজকের দিনটি কীভাবে পালন করছেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: সবসময় আমি যা করে থাকি। এবারও মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে আমার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। সেখানে সকালে যাচ্ছি। দিনব্যাপী সবার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করবো, আনন্দ করবো। উৎসবের মেজাজে সময় কাটাবো।

বাংলা ট্রিবিউন: পেছনে ফিরে যাই। আপনার তো সরাসরি অস্ত্র নিয়ে মাঠে-ময়দানে যুদ্ধ করার কথা ছিল?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: হ্যাঁ, তা করার কথা ছিল। সেই সময় আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলাম। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিল। তা জেনে তখনকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী আমাকে রণাঙ্গনের যুদ্ধে যোগ দিতে নিবৃত্ত করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে যোগ দিয়ে দেশের জন্য জনমত গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ঢাকার বাসা তো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল…

প্রতাপ শংকর হাজরা: ২৬ মার্চ আমার আরমানিটোলার বাড়িটা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে বাড়িতে ঢোকার পর অনেকেই বলছিল আমার বাসায় নাকি অস্ত্র পাওয়া গেছে! পাড়া-প্রতিবেশী অনেকের আচরণে মনে হচ্ছিল তারা আমাকে বাড়িতেই থাকতে দিতে চায় না। আমরাও ওখানে থাকলাম না। ফরিদপুরের মোহন মিয়া সাহেবের ছেলে আকমল ও হকির সাদেক (আব্দুস সাদেক) আমাকে নিয়ে গেলেন আকমলের দুলাভাইয়ের বাসায়। সেখানে দুদিন থাকলাম। তবে সেই জায়গাটাও আমাদের জন্য নিরাপদ ছিল না। একপর্যায়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কিছু দিন ছিলাম।

সেখানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমির (শাফি ইমাম রুমী) সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমরা আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি ২৬ এপ্রিল। পরে চলে যাই কলকাতায়।

বাংলা ট্রিবিউন: তখন আপনি মোহামেডান ও পাকিস্তান দলে খেলেন। ফুটবল ও হকিতে বেশ নাম-ডাক। কলকাতায় যাওয়ার পর স্বাধীন বাংলা দলের খোঁজ পেলেন কী করে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: শুরুতে আগরতলায় গিয়ে দেখি আমাদের দেশের অনেকেই সেখানে খেলছে। এর মধ্যে এনায়েত, নওশের, কায়কোবাদসহ ১৮-২০ জন রয়েছে। তাদের সঙ্গে একপর্যায়ে চলে যাই কলকাতায়। সেখানে কয়েকজন নিয়মিত আড্ডা দিতাম থিয়েটার রোডে। একদিন একটা ছেলে এসে বললো শামসুল হক এমপি আমাকে দেখা করতে বলেছেন। তখনই তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। অনেক কথার পর তার কাছ থেকেই জানলাম, ভারতের মুসলিম সমাজের একটা ভুল ধারণা ভারত সরকার হিন্দুদের নিয়ে একটা চক্রান্ত করছে পাকিস্তান ভেঙে দেওয়ার জন্য। এই ধারণাটার পরিবর্তন আনতে কিছু করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতি একটা অনুরোধ এসেছে। এ জন্যই শামসুল হক সাহেবের নেতৃত্বে একটা কমিটি গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি নামে। সেই সমিতির দ্বিতীয় সভায় আমাকে যেতে বলা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যে ফুটবল দলটা গড়া হবে তার দায়িত্ব নিতে হবে। তখন শামসুল হক সাহেব আমাকে, পিন্টু ভাইকে (স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু) ও ননী বসাককে (দলের কোচ) সেই কমিটির সদস্য করে নেন। সিদ্ধান্ত হয় একটা বাজেট তৈরি করতে হবে। আমি বললাম আগরতলা থেকে খেলোয়াড় আনতে হবে। উনি রাজি হলেন। আগরতলা থেকে সেই খেলোয়াড়দের আনতে গিয়ে একটা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে হয়েছিল। আমরা খেলেছি ‘জয় বাংলা একাদশ’ নামে আগরতলা একাদশের বিপক্ষে। ম্যাচটা ২-০ গোলে হেরেছিলাম আমরা। সেখান থেকে কলকাতা এসে পার্ক সার্কাস মাঠে ট্রেনিং শুরু হয়। কিছু দিন পর সেটাও স্থানীয়দের বাধায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমরা কোনও সময় রবীন্দ্র সরোবর মাঠসহ বিভিন্ন মাঠে ট্রেনিং করেছে। এরপর তো ইতিহাস মোটামুটি সবার জানা। আমরা প্রথম ম্যাচ খেলতে যাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম। সবাই মিলে সোনার বাংলা গান গাইলাম।

আসলে আমরা সবাই সত্যিকার অর্থে দেশের স্বাধীনতার জন্য খেলেছিলাম। হিন্দু-মুসলমানসহ সবাই স্বাধীনতার জন্য একাট্টা। এর বড় প্রমাণ হলো স্বাধীন বাংলা দলে তখন তিন জন হিন্দু খেলোয়াড় ছিলেন। বাকিরা সবাই মুসলমান। আমরা সবাই এক হয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে নেমেছি, যেন ভারতে কেউ ভুল তথ্য না পায়।

হকি আম্পায়ারদের মাঝে প্রতাপ। বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে স্বাধীন বাংলা দলের অবদান কম নয়। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: আমরা সবাই মাতৃভূমির জন্য ফুটবল খেলে জনমত গঠন করার চেষ্টা করছি। আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। যদিও রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। তখন জানতাম না আদৌ দেশ স্বাধীন হবে কিনা, কতদিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারবো। যখন ১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় বসে রেডিওতে দেশের বিজয়ের কথা শুনলাম, সবার মধ্যে আনন্দের রঙ ছিল দেখার মতো। সবাই আমরা উৎফুল্ল ছিলাম।  

বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বে ফুটবল খেলে স্বাধীনতা সংগ্রামে কেউ বা কোনও দল অংশ নিয়েছে বলে শোনা যায়নি। স্বাধীন বাংলা দল ব্যতিক্রম। আপনাদের দলটি এখনও স্বাধীনতা পদক পায়নি । বিষয়টি কতটুকু পীড়া দেয়?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: আমাদের অনেকেই বেঁচে নেই। অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু ভাইও গত হয়েছেন। বেঁচে আছি আমরা ক’জন। আমার কাছে মনে হয় কোনও সরকারই হয়তো আমাদের যোগ্য মনে করেনি, তাই স্বাধীনতা পদক দেয়নি। এ নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপ নেই। পিন্টু ভাই বেঁচে থাকতে বারবারই বলেছিলাম, চেয়ে বা আবেদন করে এই পদক নেওয়ার কিছু নেই। যোগ্য মনে করলে দেবে, না দিলে মন খারাপের কিছু নেই। হয়তো আমরা যোগ্য নই। তাই স্বাধীনতা পদক দেয়নি। এতদিন হলো পাইনি- এটাই তো সত্যি!

বাংলা ট্রিবিউন: এ নিয়ে আপনার মনে কখনও আক্ষেপ ছিল না?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: না, তা হবে কেন। আমি সরাসরি কথা বলে থাকি। আমার কোনও আক্ষেপ বা হতাশা  নেই। আমাদের পিন্টু ভাই ও কাজী সালাউদ্দিন তো ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছে। আমার মতো অনেকেই তো পায়নি। তাই বলে মন খারাপের কিছু নেই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সার্টিফিকেট মিলেছে, ভাতা পাচ্ছি- এতেই খুশি বলতে পারেন। আদতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর তো কিছু নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রয়াত জাকারিয়া পিন্টুর কথা বললেন। আপনি ও পিন্টু ভাই তো মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে হরিহর আত্মা ছিলেন। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি স্বাধীন বাংলা দলের অধিনায়ক আর আপনি সহ-অধিনায়ক। পিন্টু ভাই না থাকায় এখন তো অধিনায়কের সব দায়িত্ব আপনার কাঁধে?
 
প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: পিন্টু ভাই বেঁচে নেই। একসময় আমিও চলে যাবো। তবে পিন্টু ভাই শুরু থেকে অধিনায়ক ছিলেন। থাকবেনও। তবে আমি নিজেকে এখন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মনে করি না। এটা তো এখন আর মাঠের খেলা নয়। আমাদের সাত্তার নামে আরেকজন দলের সদস্য আছে। কিছু দরকার হলে ওই আমাকে বলে করে থাকে।

তবে পিন্টু ভাই না থাকাতে এখন আর আগের মতো বাইরে কম যাই। আগে তার সঙ্গে মোহামেডান ক্লাবে যেতাম। সপ্তাহে দু-একদিন তো নিশ্চিত ছিল। ঘুরতাম আমরা। অনেক গল্প হতো, স্মৃতিচারণ হতো। এখন সবকিছুই অতীত। বেশির ভাগ সময় বাসায় সময় কাটে। তবে পিন্টু ভাই একজন অসাধারণ টিমমেট, বন্ধু এবং একজন সত্যিকারের অধিনায়ককে হারিয়ে একা হয়ে গেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি সাবেক ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক। বিজয়ের ৫৪ বছরে এসে আমরা একটি স্পোর্টিং নেশন হতে পেরেছি কিনা?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: আমরা অনেক খেলাতে সাফল্য পেয়েছি। তবে সত্যিকার অর্থে দেশের খেলাধুলা যেখানে থাকার কথা সেখানে পুরোপুরি নেই। আমরা এখনও অলিম্পিকে দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে খেলে থাকি। শুধু আর্চারি বাদ দিয়ে। হকির কথাই ধরুন, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খেলাটি ঠিকমতো এগোতে পারছে না। ছেলেরা বিশ্বকাপে ভালো করলো। তারপরও ঘরোয়া হকি ঠিক হচ্ছে না। আমার মনে হয় সরকারের এসব দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এখনও দেশের খেলাগুলোতে ‘শিশুসুলভ আচরণ’ করা হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ৮৩ বছর বয়সে শেষ চাওয়া কী?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: এই বয়সে আর কী চাওয়া থাকতে পারে। মাতৃভূমির জন্য বল পায়ে লড়াই করেছিলাম। এই মাটিতেই যেন শেষ নিশ্বাস ছাড়তে পারি। বাবা-মা পরিবার বাদ দিয়ে আমার কাছে প্রিয় জিনিস দুইটি- আমার মাতৃভূমি ও আমার ধর্ম। আমার কাছে সবার ওপরে মাতৃভূমি। কাজেই সেই মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীন দেশে বসবাস করছি। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি তো আর থাকতে পারে না। আর দেশে নানান সমস্যা থাকবে। আমি রাজনীতিবিদ নই, রাজনীতি বুঝিও না। তবে উত্থান-পতন হবে। আবার সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমি আমার দেশ নিয়ে গর্বিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জমি বিরোধে পীরগাছায় বৃদ্ধ খুন, আহত ২

‘হয়তো আমরা যোগ্য নই, তাই স্বাধীনতা পদক দেয়নি’

আপডেট সময় : ০৮:০৪:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলা দল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পতাকাতলে ফুটবলাররা ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার ও বারাণসীসহ বিভিন্ন শহরে ১৭টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে জনমত গড়েছিল। সেই দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। যিনি ফুটবল ও হকিতে সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। খেলেছেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ জাতীয় দলেও। দেশের ৫৪তম বিজয় দিবসে ৮৩ বছর বয়সে এসে স্মৃতিচারণ করলেন। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে নতুন করে যেন অর্গল খুলে দিলেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: দেখতে দেখতে জাতি আজ ৫৪তম মহান বিজয় দিবস পালন করছে। এই বয়সে এসে আপনার অনুভূতি কেমন। এখনও কী স্বাধীনতার সেই দিনগুলোর কথা পরিষ্কার মনে পড়ে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: বিজয় দিবস মানেই অন্য রকম অনুভূতি। এই দিনটা আমার কাছে বিশেষ কিছুই। আমরা পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়েছিল। আমরা বিজয় দেখতে পেয়েছিলাম। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে থাকবো। এখনও সব কিছুই আগের মতো স্মৃতিতে উজ্জ্বল আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আজকের দিনটি কীভাবে পালন করছেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: সবসময় আমি যা করে থাকি। এবারও মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে আমার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। সেখানে সকালে যাচ্ছি। দিনব্যাপী সবার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করবো, আনন্দ করবো। উৎসবের মেজাজে সময় কাটাবো।

বাংলা ট্রিবিউন: পেছনে ফিরে যাই। আপনার তো সরাসরি অস্ত্র নিয়ে মাঠে-ময়দানে যুদ্ধ করার কথা ছিল?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: হ্যাঁ, তা করার কথা ছিল। সেই সময় আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলাম। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিল। তা জেনে তখনকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী আমাকে রণাঙ্গনের যুদ্ধে যোগ দিতে নিবৃত্ত করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে যোগ দিয়ে দেশের জন্য জনমত গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ঢাকার বাসা তো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল…

প্রতাপ শংকর হাজরা: ২৬ মার্চ আমার আরমানিটোলার বাড়িটা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে বাড়িতে ঢোকার পর অনেকেই বলছিল আমার বাসায় নাকি অস্ত্র পাওয়া গেছে! পাড়া-প্রতিবেশী অনেকের আচরণে মনে হচ্ছিল তারা আমাকে বাড়িতেই থাকতে দিতে চায় না। আমরাও ওখানে থাকলাম না। ফরিদপুরের মোহন মিয়া সাহেবের ছেলে আকমল ও হকির সাদেক (আব্দুস সাদেক) আমাকে নিয়ে গেলেন আকমলের দুলাভাইয়ের বাসায়। সেখানে দুদিন থাকলাম। তবে সেই জায়গাটাও আমাদের জন্য নিরাপদ ছিল না। একপর্যায়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কিছু দিন ছিলাম।

সেখানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমির (শাফি ইমাম রুমী) সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমরা আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি ২৬ এপ্রিল। পরে চলে যাই কলকাতায়।

বাংলা ট্রিবিউন: তখন আপনি মোহামেডান ও পাকিস্তান দলে খেলেন। ফুটবল ও হকিতে বেশ নাম-ডাক। কলকাতায় যাওয়ার পর স্বাধীন বাংলা দলের খোঁজ পেলেন কী করে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: শুরুতে আগরতলায় গিয়ে দেখি আমাদের দেশের অনেকেই সেখানে খেলছে। এর মধ্যে এনায়েত, নওশের, কায়কোবাদসহ ১৮-২০ জন রয়েছে। তাদের সঙ্গে একপর্যায়ে চলে যাই কলকাতায়। সেখানে কয়েকজন নিয়মিত আড্ডা দিতাম থিয়েটার রোডে। একদিন একটা ছেলে এসে বললো শামসুল হক এমপি আমাকে দেখা করতে বলেছেন। তখনই তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। অনেক কথার পর তার কাছ থেকেই জানলাম, ভারতের মুসলিম সমাজের একটা ভুল ধারণা ভারত সরকার হিন্দুদের নিয়ে একটা চক্রান্ত করছে পাকিস্তান ভেঙে দেওয়ার জন্য। এই ধারণাটার পরিবর্তন আনতে কিছু করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতি একটা অনুরোধ এসেছে। এ জন্যই শামসুল হক সাহেবের নেতৃত্বে একটা কমিটি গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি নামে। সেই সমিতির দ্বিতীয় সভায় আমাকে যেতে বলা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যে ফুটবল দলটা গড়া হবে তার দায়িত্ব নিতে হবে। তখন শামসুল হক সাহেব আমাকে, পিন্টু ভাইকে (স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু) ও ননী বসাককে (দলের কোচ) সেই কমিটির সদস্য করে নেন। সিদ্ধান্ত হয় একটা বাজেট তৈরি করতে হবে। আমি বললাম আগরতলা থেকে খেলোয়াড় আনতে হবে। উনি রাজি হলেন। আগরতলা থেকে সেই খেলোয়াড়দের আনতে গিয়ে একটা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে হয়েছিল। আমরা খেলেছি ‘জয় বাংলা একাদশ’ নামে আগরতলা একাদশের বিপক্ষে। ম্যাচটা ২-০ গোলে হেরেছিলাম আমরা। সেখান থেকে কলকাতা এসে পার্ক সার্কাস মাঠে ট্রেনিং শুরু হয়। কিছু দিন পর সেটাও স্থানীয়দের বাধায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমরা কোনও সময় রবীন্দ্র সরোবর মাঠসহ বিভিন্ন মাঠে ট্রেনিং করেছে। এরপর তো ইতিহাস মোটামুটি সবার জানা। আমরা প্রথম ম্যাচ খেলতে যাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম। সবাই মিলে সোনার বাংলা গান গাইলাম।

আসলে আমরা সবাই সত্যিকার অর্থে দেশের স্বাধীনতার জন্য খেলেছিলাম। হিন্দু-মুসলমানসহ সবাই স্বাধীনতার জন্য একাট্টা। এর বড় প্রমাণ হলো স্বাধীন বাংলা দলে তখন তিন জন হিন্দু খেলোয়াড় ছিলেন। বাকিরা সবাই মুসলমান। আমরা সবাই এক হয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে নেমেছি, যেন ভারতে কেউ ভুল তথ্য না পায়।

হকি আম্পায়ারদের মাঝে প্রতাপ। বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে স্বাধীন বাংলা দলের অবদান কম নয়। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: আমরা সবাই মাতৃভূমির জন্য ফুটবল খেলে জনমত গঠন করার চেষ্টা করছি। আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। যদিও রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। তখন জানতাম না আদৌ দেশ স্বাধীন হবে কিনা, কতদিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারবো। যখন ১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় বসে রেডিওতে দেশের বিজয়ের কথা শুনলাম, সবার মধ্যে আনন্দের রঙ ছিল দেখার মতো। সবাই আমরা উৎফুল্ল ছিলাম।  

বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বে ফুটবল খেলে স্বাধীনতা সংগ্রামে কেউ বা কোনও দল অংশ নিয়েছে বলে শোনা যায়নি। স্বাধীন বাংলা দল ব্যতিক্রম। আপনাদের দলটি এখনও স্বাধীনতা পদক পায়নি । বিষয়টি কতটুকু পীড়া দেয়?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: আমাদের অনেকেই বেঁচে নেই। অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু ভাইও গত হয়েছেন। বেঁচে আছি আমরা ক’জন। আমার কাছে মনে হয় কোনও সরকারই হয়তো আমাদের যোগ্য মনে করেনি, তাই স্বাধীনতা পদক দেয়নি। এ নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপ নেই। পিন্টু ভাই বেঁচে থাকতে বারবারই বলেছিলাম, চেয়ে বা আবেদন করে এই পদক নেওয়ার কিছু নেই। যোগ্য মনে করলে দেবে, না দিলে মন খারাপের কিছু নেই। হয়তো আমরা যোগ্য নই। তাই স্বাধীনতা পদক দেয়নি। এতদিন হলো পাইনি- এটাই তো সত্যি!

বাংলা ট্রিবিউন: এ নিয়ে আপনার মনে কখনও আক্ষেপ ছিল না?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: না, তা হবে কেন। আমি সরাসরি কথা বলে থাকি। আমার কোনও আক্ষেপ বা হতাশা  নেই। আমাদের পিন্টু ভাই ও কাজী সালাউদ্দিন তো ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছে। আমার মতো অনেকেই তো পায়নি। তাই বলে মন খারাপের কিছু নেই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সার্টিফিকেট মিলেছে, ভাতা পাচ্ছি- এতেই খুশি বলতে পারেন। আদতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর তো কিছু নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রয়াত জাকারিয়া পিন্টুর কথা বললেন। আপনি ও পিন্টু ভাই তো মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে হরিহর আত্মা ছিলেন। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি স্বাধীন বাংলা দলের অধিনায়ক আর আপনি সহ-অধিনায়ক। পিন্টু ভাই না থাকায় এখন তো অধিনায়কের সব দায়িত্ব আপনার কাঁধে?
 
প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: পিন্টু ভাই বেঁচে নেই। একসময় আমিও চলে যাবো। তবে পিন্টু ভাই শুরু থেকে অধিনায়ক ছিলেন। থাকবেনও। তবে আমি নিজেকে এখন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মনে করি না। এটা তো এখন আর মাঠের খেলা নয়। আমাদের সাত্তার নামে আরেকজন দলের সদস্য আছে। কিছু দরকার হলে ওই আমাকে বলে করে থাকে।

তবে পিন্টু ভাই না থাকাতে এখন আর আগের মতো বাইরে কম যাই। আগে তার সঙ্গে মোহামেডান ক্লাবে যেতাম। সপ্তাহে দু-একদিন তো নিশ্চিত ছিল। ঘুরতাম আমরা। অনেক গল্প হতো, স্মৃতিচারণ হতো। এখন সবকিছুই অতীত। বেশির ভাগ সময় বাসায় সময় কাটে। তবে পিন্টু ভাই একজন অসাধারণ টিমমেট, বন্ধু এবং একজন সত্যিকারের অধিনায়ককে হারিয়ে একা হয়ে গেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি সাবেক ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক। বিজয়ের ৫৪ বছরে এসে আমরা একটি স্পোর্টিং নেশন হতে পেরেছি কিনা?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: আমরা অনেক খেলাতে সাফল্য পেয়েছি। তবে সত্যিকার অর্থে দেশের খেলাধুলা যেখানে থাকার কথা সেখানে পুরোপুরি নেই। আমরা এখনও অলিম্পিকে দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে খেলে থাকি। শুধু আর্চারি বাদ দিয়ে। হকির কথাই ধরুন, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খেলাটি ঠিকমতো এগোতে পারছে না। ছেলেরা বিশ্বকাপে ভালো করলো। তারপরও ঘরোয়া হকি ঠিক হচ্ছে না। আমার মনে হয় সরকারের এসব দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এখনও দেশের খেলাগুলোতে ‘শিশুসুলভ আচরণ’ করা হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ৮৩ বছর বয়সে শেষ চাওয়া কী?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: এই বয়সে আর কী চাওয়া থাকতে পারে। মাতৃভূমির জন্য বল পায়ে লড়াই করেছিলাম। এই মাটিতেই যেন শেষ নিশ্বাস ছাড়তে পারি। বাবা-মা পরিবার বাদ দিয়ে আমার কাছে প্রিয় জিনিস দুইটি- আমার মাতৃভূমি ও আমার ধর্ম। আমার কাছে সবার ওপরে মাতৃভূমি। কাজেই সেই মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীন দেশে বসবাস করছি। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি তো আর থাকতে পারে না। আর দেশে নানান সমস্যা থাকবে। আমি রাজনীতিবিদ নই, রাজনীতি বুঝিও না। তবে উত্থান-পতন হবে। আবার সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমি আমার দেশ নিয়ে গর্বিত।