আজ ৯ ডিসেম্বর, বেগম রোকেয়া দিবস। বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হবে। সাধারণত দিনটি পালনের জন্য তার জন্মস্থান রংপুরের পায়রাবন্দে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্তারা এক মাস আগে থেকেই কর্মতৎপর হয়ে ওঠেন। স্মৃতিকেন্দ্র ও বেগম রোকেয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাস্তভিটায় চলে পরিচ্ছন্নতা। তবে এ দুটি স্থাপনা সংস্কারে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নেই।
দীর্ঘদিন পর এবার বাংলা একাডেমী ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে যৌথভাবে আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্মৃতিকেন্দ্রে দুস্থ নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ এবং শিশু–কিশোরদের জন্য আর্ট ও সঙ্গীত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবে বাংলা একাডেমী।
সরেজমিনে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে ঘুরে এলাকাবাসী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকে ধরে রাখা, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের পুনর্বাসন এবং রোকেয়ার জীবন ও রচনাবলি নিয়ে গবেষণার জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর স্মৃতিকেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্মৃতিকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর পর স্মৃতিকেন্দ্র কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকবে তা নিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমীর মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। এ বিষয়ে স্মৃতিকেন্দ্রের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারী হাইকোর্টে রিট করেন। শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ আদালত স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্ব বাংলা একাডেমীকে দেন এবং কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও রাজস্ব খাতে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল জানান, আদালতের রায়ের পর ২০১৮ সালে স্মৃতিকেন্দ্র, বাস্তভিটা ও পুরো কমপ্লেক্সের দায়িত্ব গ্রহণ করে বাংলা একাডেমী। তবে সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “এবার বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপনের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কোনও অর্থ বরাদ্দ দেয়নি, যা দুঃখজনক।”
তিনি আরও বলেন, “রংপুরের মানুষের দাবি, বেগম রোকেয়ার কবর কলকাতা থেকে পায়রাবন্দে এনে সমাধি নির্মাণ করা। এ বিষয়ে সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বহুবার বললেও কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”
এদিকে স্মৃতিকেন্দ্রে একজন কর্মকর্তা ও একজন সহকারী লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দেওয়া ছাড়া আর কোনও অগ্রগতি নেই। লাইব্রেরিতে বই নেই, রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণারও উদ্যোগ নেই। ১৫ বছর আগে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি সংস্কারের অভাবে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে। দৃষ্টিনন্দন অডিটোরিয়াম, মূল ভবন, গেস্ট হাউসসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল দেখা দিয়েছে, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান জিনিসপত্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো কমপ্লেক্সই জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন।
একই অবস্থা বেগম রোকেয়ার বাস্তভিটাতেও। দীর্ঘদিনেও সেখানে কোনও স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়নি। অযত্ন–অবহেলায় বাস্তভিটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা এ অবহেলা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আগে প্রচুর দর্শনার্থী এলেও গত দুই বছরে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ এবং রোকেয়া গবেষক ড. শ্বাশত ভট্টাচার্য বলেন, শুধু ৯ ডিসেম্বর এলেই মাতামাতি করলে চলবে না। বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকে সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
স্মৃতিকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবিদ করিম মুন্না বলেন, “এবার স্মৃতিকেন্দ্রে দুস্থ নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ এবং শিশু-কিশোরদের জন্য আর্ট ও সঙ্গীত শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
রিপোর্টারের নাম 



















