ঢাকা ০৫:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

রাকাব চেয়ারম্যান অনিয়মের কৈফিয়ত চাইলেও জবাব দেননি এমডি

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওয়াহিদা বেগম পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে নিজের খেয়াল খুশিমতো ব্যাংক চালাচ্ছেন। এ ছাড়া তার অদক্ষতা, অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে গত অর্থবছরে ১৩২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে ব্যাংকের। এসব অভিযোগে পরপর দুবার তার কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তলবের ব্যাখ্যা দেওয়া দূরের কথা তিনি কোনও কর্ণপাতই করেননি। এমডির এই কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ পরিচালনা পর্ষদ। 

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ সূত্রে জানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ আউটসোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত করে ৭২১ জন নিরাপত্তাপ্রহরী ও অফিস সহায়কদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ও কমিশনের ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমডি। গত ৩ ও ১২ নভেম্বর দুই দফা এমডিকে কৈফিয়ত তলব করেছেন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আলী। কিন্তু একবারও তার ব্যাখ্যা দেননি।

আউটসোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে জনবল সরবরাহের চুক্তিটি ২০২৩ সালে ১৬ এপ্রিল ৫৬১তম সভায় নবায়ন করে পরিচালনা পর্ষদ। চলতি বছরের ৩১ জুলাই সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আউটসোর্সিং কোম্পানি নিয়োগ করার কথা। কিন্তু তা না করে এমডি বিধি-বহির্ভূতভাবে এই খাতে প্রায় ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। সর্বশেষ পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে গত ২০ নভেম্বর তিনি সীমিত টেন্ডারের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্তির নোটিশ জারি করেন। এ ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের নেওয়া সিদ্ধান্ত এমডি বাস্তবায়ন করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন খোদ ব্যাংকের চেয়ারম্যান।

এমডি ব্যাংকের স্পর্শকাতর ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ডাটা সেন্টারের টেন্ডার সংক্রান্ত যাবতীয় বিল আটকে দিয়েছেন। এ ঘটনায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকের সার্বিক নিরাপত্তা। এ নিয়ে বারবার সতর্ক করার পরও আমলে নিচ্ছেন না এমডি। চেয়ারম্যানের অভিযোগ, এমডির এই আচরণ চরম রহস্যজনক। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তিনি বৈধ বিল পরিশোধে কালক্ষেপণ করছেন।

এমডির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, চলতি বছরের জুন ভিত্তিক পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন তিনি। এতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দ্রুতই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তা আমলে নেননি এমডি। উল্টো চেয়ারম্যানকে না জানিয়ে ২০ জনকে প্রধান কার্যালয় থেকে রংপুর বিভাগে বদলি করেন। এমপির একতরফা ও অযৌক্তিক এই সিদ্ধান্তে ব্যাংকজুড়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের পদ বাঁচাতে উচ্চপদস্থ কতিপয় কর্মকর্তাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আবাসন সুবিধা দেন। আটকে দেন ইসলামি ব্যাংকিং বাস্তবায়ন। এমডির পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নীতি ভেঙে দুই দিনের পরিবর্তে সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন ভোগ করছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে রাকাব এমডি ওয়াহিদা বেগম বলেন, ‘আমাকে চেয়ারম্যান স্যার একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষরিত চিঠি দিয়েছেন। আমি সব চিঠিরই জবাব তাকে দিয়েছি। পাশাপাশি সব টেন্ডারও দেওয়া হয়েছে। আমি এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না। সব চিঠিরই জবাব দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে এটি সঠিক নয়। এখানে যোগদানের পর আগে যা পেয়েছি আমি সেই হিসেবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে নতুন কিছু তো হয়নি। পদোন্নতি সবাই পেয়ে যাচ্ছে, এখানে কোনও অনিয়ম হয়নি।’

এ ব্যাপারে রাকাব চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি কিছু অনিয়ম দেখেই তাকে শোকজ ও চিঠি দিয়েছি। এরপরই তিনি কিছু কাজ করেছেন। কিছু কাজের ঘাটতি আছে। সেগুলো হয়তো কোনোটি এগিয়ে গেছে, কোনোটি পিছিয়ে আছে। এগুলো অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমরা সবগুলো বিবেচনা করে দেখছি।’

প্রসঙ্গত, পদোন্নতি পেয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াহিদা বেগম রাকাবে বদলি হয়ে আসেন। তার আগে তিনি অগ্রণী ব্যাংক পিএলসিতে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়। এই ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ওয়াহিদা বেগমসহ অগ্রণী ব্যাংকের চার কর্মকর্তাকে আদালত আদেশ অমান্য করার দায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। কিন্তু সেই তথ্য গোপন করে কৌশলে রাকাবে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন ওয়াহিদা বেগম। রাকাবে তার এই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ নভেম্বর উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। এ নিয়োগ কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে পরে রুল জারি করেন উচ্চ আদালত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসন, অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনি আটক

রাকাব চেয়ারম্যান অনিয়মের কৈফিয়ত চাইলেও জবাব দেননি এমডি

আপডেট সময় : ০৮:২৫:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওয়াহিদা বেগম পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে নিজের খেয়াল খুশিমতো ব্যাংক চালাচ্ছেন। এ ছাড়া তার অদক্ষতা, অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে গত অর্থবছরে ১৩২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে ব্যাংকের। এসব অভিযোগে পরপর দুবার তার কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তলবের ব্যাখ্যা দেওয়া দূরের কথা তিনি কোনও কর্ণপাতই করেননি। এমডির এই কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ পরিচালনা পর্ষদ। 

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ সূত্রে জানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ আউটসোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত করে ৭২১ জন নিরাপত্তাপ্রহরী ও অফিস সহায়কদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ও কমিশনের ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমডি। গত ৩ ও ১২ নভেম্বর দুই দফা এমডিকে কৈফিয়ত তলব করেছেন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আলী। কিন্তু একবারও তার ব্যাখ্যা দেননি।

আউটসোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে জনবল সরবরাহের চুক্তিটি ২০২৩ সালে ১৬ এপ্রিল ৫৬১তম সভায় নবায়ন করে পরিচালনা পর্ষদ। চলতি বছরের ৩১ জুলাই সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আউটসোর্সিং কোম্পানি নিয়োগ করার কথা। কিন্তু তা না করে এমডি বিধি-বহির্ভূতভাবে এই খাতে প্রায় ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। সর্বশেষ পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে গত ২০ নভেম্বর তিনি সীমিত টেন্ডারের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্তির নোটিশ জারি করেন। এ ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের নেওয়া সিদ্ধান্ত এমডি বাস্তবায়ন করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন খোদ ব্যাংকের চেয়ারম্যান।

এমডি ব্যাংকের স্পর্শকাতর ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ডাটা সেন্টারের টেন্ডার সংক্রান্ত যাবতীয় বিল আটকে দিয়েছেন। এ ঘটনায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকের সার্বিক নিরাপত্তা। এ নিয়ে বারবার সতর্ক করার পরও আমলে নিচ্ছেন না এমডি। চেয়ারম্যানের অভিযোগ, এমডির এই আচরণ চরম রহস্যজনক। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তিনি বৈধ বিল পরিশোধে কালক্ষেপণ করছেন।

এমডির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, চলতি বছরের জুন ভিত্তিক পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন তিনি। এতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দ্রুতই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তা আমলে নেননি এমডি। উল্টো চেয়ারম্যানকে না জানিয়ে ২০ জনকে প্রধান কার্যালয় থেকে রংপুর বিভাগে বদলি করেন। এমপির একতরফা ও অযৌক্তিক এই সিদ্ধান্তে ব্যাংকজুড়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের পদ বাঁচাতে উচ্চপদস্থ কতিপয় কর্মকর্তাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আবাসন সুবিধা দেন। আটকে দেন ইসলামি ব্যাংকিং বাস্তবায়ন। এমডির পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নীতি ভেঙে দুই দিনের পরিবর্তে সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন ভোগ করছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে রাকাব এমডি ওয়াহিদা বেগম বলেন, ‘আমাকে চেয়ারম্যান স্যার একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষরিত চিঠি দিয়েছেন। আমি সব চিঠিরই জবাব তাকে দিয়েছি। পাশাপাশি সব টেন্ডারও দেওয়া হয়েছে। আমি এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না। সব চিঠিরই জবাব দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে এটি সঠিক নয়। এখানে যোগদানের পর আগে যা পেয়েছি আমি সেই হিসেবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে নতুন কিছু তো হয়নি। পদোন্নতি সবাই পেয়ে যাচ্ছে, এখানে কোনও অনিয়ম হয়নি।’

এ ব্যাপারে রাকাব চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি কিছু অনিয়ম দেখেই তাকে শোকজ ও চিঠি দিয়েছি। এরপরই তিনি কিছু কাজ করেছেন। কিছু কাজের ঘাটতি আছে। সেগুলো হয়তো কোনোটি এগিয়ে গেছে, কোনোটি পিছিয়ে আছে। এগুলো অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমরা সবগুলো বিবেচনা করে দেখছি।’

প্রসঙ্গত, পদোন্নতি পেয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াহিদা বেগম রাকাবে বদলি হয়ে আসেন। তার আগে তিনি অগ্রণী ব্যাংক পিএলসিতে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়। এই ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ওয়াহিদা বেগমসহ অগ্রণী ব্যাংকের চার কর্মকর্তাকে আদালত আদেশ অমান্য করার দায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। কিন্তু সেই তথ্য গোপন করে কৌশলে রাকাবে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন ওয়াহিদা বেগম। রাকাবে তার এই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ নভেম্বর উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। এ নিয়োগ কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে পরে রুল জারি করেন উচ্চ আদালত।