ঢাকা ০৯:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

বিভাগীয় বন কর্মকর্তার যোগসাজশে উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বন

দেশের সব সংরক্ষিত বনসহ পাহাড়ের গাছ কাটা ও কাঠ পাচার নিষিদ্ধ। কিন্তু সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই বান্দরবানের লামার মাতামুহুরি, রাইক্ষ্যং সংরক্ষিত বনসহ পাহাড়ি প্রাকৃতিক বন নিধন এবং কাঠ পাচার করে চলেছে চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। চোরাকারবারিদের সঙ্গে বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকায় গহীন বন থেকে গাছ পাচার বন্ধ হচ্ছে না। এজন্য উজাড় হয়ে যাচ্ছে বনের গাছ।

চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন এবং স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতামুহুরি ও বমু বিলছড়ি এই তিনটি সংরক্ষিত বন আছে। এসব বনের গাছ নিধন ও কাঠ পাচার করে যাচ্ছে চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কেটে উজাড় করা হচ্ছে চম্পা, বৈলাম, গর্জন,  কড়ইসহ শতবর্ষী বৃক্ষ। লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে গাছ কেটে পাচার করছে চোরাকারবারিরা। এতে সহ‌যো‌গিতা ক‌রে মোস্তাফিজুর হা‌তি‌য়ে নিচ্ছেন কো‌টি কো‌টি টাকা।

এ ছাড়া বনাঞ্চল রক্ষার পরিব‌র্তে নাইক্ষ্যংছড়ি বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেনকে বদলির ভয় দেখিয়ে চার লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মোজাম্মেল। তিনি বলেন, ‌‘এই টাকা না দিলে আমাকে বান্দরবান বন বিভা‌গের বন আদালতে পাঠানোর হুমকি দি‌য়েছেন। বাধ্য হয়ে চার লাখ টাকা দিয়েছি। এ ছাড়া মাসিক দুই লাখ টাকা চুক্তির বিনিময়ে অতিরিক্ত ১০ মাস রেঞ্জের দায়িত্ব পালন করেছি।’

জেলার দুজন বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান এসব ছাড়াও অবৈধপ‌থে অর্থ উপার্জন ক‌রছেন। গাছ ব্যবসায়ী এবং রেঞ্জ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অ‌বৈধভা‌বে গাছ পাচা‌রে সহ‌যো‌গিতা ক‌রেন। এতে ক‌য়েক লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাঙ্গু সংরক্ষিত বন থেকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অ‌বৈধভা‌বে কাটা হ‌চ্ছে গাছ। এগুলো পাচা‌রের জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তার সহায়তায় ব্যবসায়ী এবং রেঞ্জ কর্মকর্তা‌দের সঙ্গে গড়ে উঠেছে গোপন সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের এক সদস্য রফিকুল ইসলাম জানান, গাছ কাটার পর কিছু গাছ রেঞ্জ কর্মকর্তার মাধ্যমে জব্দ দেখা‌নো হয়। প‌রে তা নিলা‌মে বৈধ করা হয়। এই পদ্ধ‌তি‌তে প্রতি ঘনফুট সেগুন গাছ বৈধ করতে বন কর্মকর্তা‌কে দি‌তে হয় ফুট প্রতি ৫০ টাকা। এ ছাড়া সেগুন গোল গা‌ছের ওভার সাইজ ২২০০ টাকা, আন্ডার হ‌লে ১৮০০ টাকা ও ব‌ল্লি ৭/৮শ টাকার ম‌ধ্যে হওয়ার কথা থাক‌লেও এর অ‌র্ধেকের চে‌য়ে কম দা‌মে তা নিলা‌মে দেওয়ায় সরকার রাজস্ব হারা‌চ্ছে। বি‌নিম‌য়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা গাছ ব্যবসায়ীদের কাছ থে‌কে হা‌তি‌য়ে নি‌চ্ছেন মোটা অং‌কের টাকা।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, থানচি-আলীকদম সড়কের ২১ কিলোমিটার অংশ থেকে থানচি উপজেলার তিন্দু সড়ক হয়ে আলীকদম উপজেলার তৈনফা ও চাইম্প্রা মৌজায় দুটি কাঁচা সড়ক নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে তিন্দু সড়কটি দিয়ে আলীকদমে পাচার করা হ‌চ্ছে বনের গাছ। সড়কটি নির্মা‌ণের পর থে‌কে গাছ পাচার সহজ হ‌য়ে‌ছে। ফ‌লে শতবর্ষী ‌বিলুপ্ত প্রজা‌তির চম্পা, বৈলাম, গর্জন, কড়ই, গোদা, চাপালিশসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ শূন্য হ‌য়ে প‌ড়ে‌ছে মাতামুহুরি বনাঞ্চল।

খোঁজ নি‌য়ে জানা‌ গে‌ছে, আলীদমে বিএনপি নেতা পরিচয়ে আনোয়ার জিহাদ চৌধুরী, ইউনুছ মিয়া, ইউসুফ আলী চক্রটি গাছ পাচা‌রে জ‌ড়িত। তা‌দের পাচা‌রকাজে সহ‌যো‌গিতা কর‌ছেন বন বিভা‌গের কর্মকর্তারাই।  

গাছ কাটার কাজে জড়িত তিন জন শ্রমিক জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর কয়েক দফায় রাইক্ষ্যং সংরক্ষিত বনে ঢুকে বড় বড় গাছ কেটেছেন তারা। প‌রে তা বাঁশের চা‌লির নি‌চে বেঁধে নদীপ‌থে ভা‌সি‌য়ে নি‌য়ে আসা হয় সড়‌কের কাছাকা‌ছি স্থা‌নে। এরপর ট্রা‌কে তু‌লে দে‌শের বি‌ভিন্ন প্রা‌ন্তে পাচার করা হয়।

আলীকদ‌মের গাছ ব্যবসায়ী ইউনুছ মিয়া ব‌লেন, ‘বছর খা‌নেক ধ‌রে গাছ ব্যবসা বন্ধ আছে। আর সংরক্ষিত বন তো ধ্বংস হ‌য়ে‌ গেছে আট থেকে ১০ বছর আগেই। এখন গাছ না থাকায় কাটার‌ তো প্রশ্নই আসে না।’ 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে ব‌লেন, ‘সংরক্ষিত বন থেকে গাছ কাটা ও পাচারের সুযোগ নেই। আগে সাঙ্গু নদী দিয়ে যে গাছগুলো আসতো সেগুলো সম্ভবত জোত পারমিটের গাছ। আমরা খবর পেলে শহরের বিভিন্ন ডিপোতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ গাছ জব্দ করি। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গাছ পাচারের কথাটি সঠিক নয়।’

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগকে কোথাও কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হবে না: চট্টগ্রামে এনসিপি আহ্বায়ক

বিভাগীয় বন কর্মকর্তার যোগসাজশে উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বন

আপডেট সময় : ১১:৩২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশের সব সংরক্ষিত বনসহ পাহাড়ের গাছ কাটা ও কাঠ পাচার নিষিদ্ধ। কিন্তু সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই বান্দরবানের লামার মাতামুহুরি, রাইক্ষ্যং সংরক্ষিত বনসহ পাহাড়ি প্রাকৃতিক বন নিধন এবং কাঠ পাচার করে চলেছে চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। চোরাকারবারিদের সঙ্গে বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকায় গহীন বন থেকে গাছ পাচার বন্ধ হচ্ছে না। এজন্য উজাড় হয়ে যাচ্ছে বনের গাছ।

চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন এবং স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতামুহুরি ও বমু বিলছড়ি এই তিনটি সংরক্ষিত বন আছে। এসব বনের গাছ নিধন ও কাঠ পাচার করে যাচ্ছে চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কেটে উজাড় করা হচ্ছে চম্পা, বৈলাম, গর্জন,  কড়ইসহ শতবর্ষী বৃক্ষ। লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে গাছ কেটে পাচার করছে চোরাকারবারিরা। এতে সহ‌যো‌গিতা ক‌রে মোস্তাফিজুর হা‌তি‌য়ে নিচ্ছেন কো‌টি কো‌টি টাকা।

এ ছাড়া বনাঞ্চল রক্ষার পরিব‌র্তে নাইক্ষ্যংছড়ি বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেনকে বদলির ভয় দেখিয়ে চার লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মোজাম্মেল। তিনি বলেন, ‌‘এই টাকা না দিলে আমাকে বান্দরবান বন বিভা‌গের বন আদালতে পাঠানোর হুমকি দি‌য়েছেন। বাধ্য হয়ে চার লাখ টাকা দিয়েছি। এ ছাড়া মাসিক দুই লাখ টাকা চুক্তির বিনিময়ে অতিরিক্ত ১০ মাস রেঞ্জের দায়িত্ব পালন করেছি।’

জেলার দুজন বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান এসব ছাড়াও অবৈধপ‌থে অর্থ উপার্জন ক‌রছেন। গাছ ব্যবসায়ী এবং রেঞ্জ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অ‌বৈধভা‌বে গাছ পাচা‌রে সহ‌যো‌গিতা ক‌রেন। এতে ক‌য়েক লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাঙ্গু সংরক্ষিত বন থেকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অ‌বৈধভা‌বে কাটা হ‌চ্ছে গাছ। এগুলো পাচা‌রের জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তার সহায়তায় ব্যবসায়ী এবং রেঞ্জ কর্মকর্তা‌দের সঙ্গে গড়ে উঠেছে গোপন সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের এক সদস্য রফিকুল ইসলাম জানান, গাছ কাটার পর কিছু গাছ রেঞ্জ কর্মকর্তার মাধ্যমে জব্দ দেখা‌নো হয়। প‌রে তা নিলা‌মে বৈধ করা হয়। এই পদ্ধ‌তি‌তে প্রতি ঘনফুট সেগুন গাছ বৈধ করতে বন কর্মকর্তা‌কে দি‌তে হয় ফুট প্রতি ৫০ টাকা। এ ছাড়া সেগুন গোল গা‌ছের ওভার সাইজ ২২০০ টাকা, আন্ডার হ‌লে ১৮০০ টাকা ও ব‌ল্লি ৭/৮শ টাকার ম‌ধ্যে হওয়ার কথা থাক‌লেও এর অ‌র্ধেকের চে‌য়ে কম দা‌মে তা নিলা‌মে দেওয়ায় সরকার রাজস্ব হারা‌চ্ছে। বি‌নিম‌য়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা গাছ ব্যবসায়ীদের কাছ থে‌কে হা‌তি‌য়ে নি‌চ্ছেন মোটা অং‌কের টাকা।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, থানচি-আলীকদম সড়কের ২১ কিলোমিটার অংশ থেকে থানচি উপজেলার তিন্দু সড়ক হয়ে আলীকদম উপজেলার তৈনফা ও চাইম্প্রা মৌজায় দুটি কাঁচা সড়ক নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে তিন্দু সড়কটি দিয়ে আলীকদমে পাচার করা হ‌চ্ছে বনের গাছ। সড়কটি নির্মা‌ণের পর থে‌কে গাছ পাচার সহজ হ‌য়ে‌ছে। ফ‌লে শতবর্ষী ‌বিলুপ্ত প্রজা‌তির চম্পা, বৈলাম, গর্জন, কড়ই, গোদা, চাপালিশসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ শূন্য হ‌য়ে প‌ড়ে‌ছে মাতামুহুরি বনাঞ্চল।

খোঁজ নি‌য়ে জানা‌ গে‌ছে, আলীদমে বিএনপি নেতা পরিচয়ে আনোয়ার জিহাদ চৌধুরী, ইউনুছ মিয়া, ইউসুফ আলী চক্রটি গাছ পাচা‌রে জ‌ড়িত। তা‌দের পাচা‌রকাজে সহ‌যো‌গিতা কর‌ছেন বন বিভা‌গের কর্মকর্তারাই।  

গাছ কাটার কাজে জড়িত তিন জন শ্রমিক জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর কয়েক দফায় রাইক্ষ্যং সংরক্ষিত বনে ঢুকে বড় বড় গাছ কেটেছেন তারা। প‌রে তা বাঁশের চা‌লির নি‌চে বেঁধে নদীপ‌থে ভা‌সি‌য়ে নি‌য়ে আসা হয় সড়‌কের কাছাকা‌ছি স্থা‌নে। এরপর ট্রা‌কে তু‌লে দে‌শের বি‌ভিন্ন প্রা‌ন্তে পাচার করা হয়।

আলীকদ‌মের গাছ ব্যবসায়ী ইউনুছ মিয়া ব‌লেন, ‘বছর খা‌নেক ধ‌রে গাছ ব্যবসা বন্ধ আছে। আর সংরক্ষিত বন তো ধ্বংস হ‌য়ে‌ গেছে আট থেকে ১০ বছর আগেই। এখন গাছ না থাকায় কাটার‌ তো প্রশ্নই আসে না।’ 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে ব‌লেন, ‘সংরক্ষিত বন থেকে গাছ কাটা ও পাচারের সুযোগ নেই। আগে সাঙ্গু নদী দিয়ে যে গাছগুলো আসতো সেগুলো সম্ভবত জোত পারমিটের গাছ। আমরা খবর পেলে শহরের বিভিন্ন ডিপোতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ গাছ জব্দ করি। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গাছ পাচারের কথাটি সঠিক নয়।’