বাংলাদেশ অর্থনীতি আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে কিছু মেগা প্রকল্প দেশের উন্নয়নচিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা সরকারের আর্থিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে তুলছে। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রতিদিনই সরকারের প্রতিশ্রুতি বাড়ছে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে শক্তিশালী রাজস্ব ঘাঁটি প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৭.৬ শতাংশ। তুলনায় ভারতের প্রায় ১১–১২ শতাংশ, ভিয়েতনামের ১৬ শতাংশের বেশি, আর OECD দেশগুলোতে এটি গড়ে ২৫–৩০ শতাংশ। CEIC-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ডিসেম্বর ২০২৪-এ কেন্দ্রীয় কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭.৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে FY2024–25-এ এই অনুপাত ৬.৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ প্রক্ষেপণ আর বাস্তবতার মধ্যে ভয়ঙ্কর ফারাক তৈরি হয়েছে।
এমনকি বাজেটে কর-জিডিপি অনুপাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। IDLC রিসার্চ রিপোর্ট অনুযায়ী, FY2024 এর বাজেটে ৯.৬ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাতের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। আবার IMF চুক্তির অংশ হিসেবে ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত অন্তত ০.৫ শতাংশ করে বাড়ানোর শর্ত ছিল। কিন্তু বরং এর বিপরীতে তা আরও কমেছে। এটি প্রমাণ করে, বর্তমান কর কাঠামো টেকসই নয়, বড় সংস্কার ছাড়া রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৬৭ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন। বিপুলসংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নেটের বাইরে রয়ে গেছে। অনেক ধনী নাগরিক বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও রিটার্নে শূন্য বা সামান্য আয় দেখান। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ কর ফাঁকিকে আরও সহজ করে তুলেছে। ফলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, আর ফাঁকিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
এই বাস্তবতায় রাজস্ব বাড়াতে শুধু করহার বৃদ্ধি সমাধান নয়। বরং করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি দমন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নই হলো প্রধান পথ। বিশ্বের অভিজ্ঞতা তাই প্রমাণ করেছে। যেসব দেশ রাজস্ব আহরণে সফল, তারা আগে করদাতার সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং কর প্রশাসনকে স্বচ্ছ করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতভিত্তিক। অথচ এই বিশাল অংশ কার্যত কর কাঠামোর বাইরে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জটিল করপদ্ধতি ও হয়রানির আশঙ্কায় রিটার্ন জমা দেন না। তাদের জন্য সরল করব্যবস্থা চালু করা জরুরি। মাত্র এক শতাংশ হারে সরল ভ্যাট স্কিম চালু করে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এক পাতার রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হলে তারা ধীরে ধীরে করজালে আসতে পারবেন। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ করপদ্ধতি চালু করলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
কিন্তু করজাল সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারও অপরিহার্য। বাংলাদেশে দোকানদাররা প্রায়ই বিক্রির রসিদ দেন না। এতে বিপুল ভ্যাট হারায়। প্রতিটি বিক্রয়ে QR কোড বা ই-পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করলে লেনদেন সরাসরি এনবিআরের সার্ভারে রেকর্ড হবে। ব্যবসায়ীরা আর বিক্রি গোপন করতে পারবেন না, আর ক্রেতার হাতেও থাকবে একটি ডিজিটাল রসিদ। এটি ভবিষ্যতে কর ছাড় বা পণ্যের ওয়ারেন্টির প্রমাণ হিসেবেও কাজে লাগবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন রসিদ নিতে আগ্রহী হবে? আমাদের দেশে রসিদ নেওয়ার অভ্যাস এখনো গড়ে ওঠেনি। এখানেই দরকার প্রণোদনার। ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে চালু হওয়া Nota Fiscal Paulista প্রোগ্রামের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। সেখানে ক্রেতারা রসিদ নেওয়ার বিনিময়ে ক্যাশব্যাক ও লয়্যালটি পয়েন্ট পেতেন। এর ফলে রাজস্ব আয় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। বর্তমানে ব্রাজিলে ২০২৫ সাল থেকে নতুন কর কাঠামো (CBS, IBS) কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে ই-ইনভয়েস সিস্টেমে নতুন ফিল্ড এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়া যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ তারা কর ফাঁকি রোধে আরও কঠোরভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
প্রযুক্তি শুধু স্বচ্ছতা আনতেই নয়, কর ফাঁকি শনাক্ত করতেও কার্যকর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্রস-চেক সিস্টেম চালু করা গেলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, ব্যাংক লেনদেন, জমি বা গাড়ির মালিকানা, বিদেশ ভ্রমণ—এসব তথ্য কর রিটার্নের সঙ্গে মেলানো সম্ভব হবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর এ পদ্ধতিতে সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এআই-ভিত্তিক অডিট কর প্রশাসনের পক্ষপাত ও দুর্নীতি কমিয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।
প্রায়ই দেখা যায়, অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর যোগসাজশে বিপুল রাজস্ব হারিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে সাংগঠনিক পুনর্গঠন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জনআস্থা। মানুষ যদি মনে করে কর দেওয়ার অর্থ কেবল দুর্নীতির পকেট ভরানো, তবে তারা কর দিতে অনাগ্রহী হবেন। আবার যদি তারা দেখতে পান কর রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাজ হচ্ছে, তবে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন। এজন্য রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের তথ্য জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।
সব মিলিয়ে কর আদায়ের টেকসই পথ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। বড় ব্যবসায় ই-ইনভয়েস বাধ্যতামূলক করা, খুচরা লেনদেনে ক্যাশব্যাক চালু করা, কর ছাড়ের ক্ষেত্রে ই-ইনভয়েস শর্ত যুক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ খাত ডিজিটালি অডিট করা, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সরল ভ্যাট চালু করা, বড় কর ফাঁকিবাজদের নাম প্রকাশ করা এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যের সঙ্গে রিটার্ন ক্রস-ম্যাচ করা—এসব বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আহরণ বহুগুণে বাড়বে।
সর্বোপরি, কর আদায় বাড়ানো মানে শুধু রাজস্ব বাড়ানো নয় বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করা। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন জরুরি একটি অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থা। এ পথেই সম্ভব হবে একটি টেকসই উন্নয়নমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা আগামী প্রজন্মের জন্য দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
রিপোর্টারের নাম 























