পৌষের কুয়াশায় মোড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সবুজ ক্যাম্পাসে উৎসবের আবহ। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী—সবার মুখে রঙিন প্রজাপতির আঁকিবুঁকি, হাতে ফেস্টুন, চোখে মুগ্ধতা। উপলক্ষ, ‘প্রজাপতি মেলা’। প্রজাপতি সংরক্ষণ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’ স্লোগানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫তম প্রজাপতি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে শুক্রবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখার আয়োজনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে।
তবে রঙিন এই উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর পরিবেশগত উদ্বেগ—ঢাকার অদূরে মনোরম সবুজে ভরা ক্যাম্পাস, যেখানে প্রতিষ্ঠালগ্নে পরিবেশ ও সৌন্দর্যের দিক থেকে ছিল অনন্য। সেই সময়ে ১১০টির বেশি প্রজাতির প্রজাপতি বিচরণ করতো, এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭২টিতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় সংকট ও আবাসস্থল বিলুপ্তির পাশাপাশি বৈশ্বিকভাবে প্রজাপতির দ্রুত বিলুপ্তি একটি ভয়াবহ প্রবণতার প্রতিচ্ছবি। প্রজাপতি কমে যাওয়া মানেই প্রকৃতি অসুস্থ। বলা যায়, এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রে বড় বিপদের পূর্বাভাস।
হোস্ট প্ল্যান্ট সংকট ও সংকুচিত আবাসস্থলে প্রজাপতির টিকে থাকার লড়াই
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রজাপতি গবেষক ড. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘২০১০ সালে প্রথম মেলা আয়োজনের সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রজাপতির অভয়ারণ্য। ছোট গুল্ম, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় ও ছায়াঘন বনাঞ্চলে ভরা ছিল পুরো ক্যাম্পাস। তখন প্রজাপতির প্রজাতি ছিল ১১০টির মতো। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৭২টিতে। প্রতি ছরই এই সংখ্যা কমছে। যেমন গত বছরের চেয়ে এবার আরও বেশ কিছু কমেছে। কারণ ছোট গাছপালা আর ঝোপঝাড় কমে গেছে। হোস্ট প্ল্যান্টের সংকটে জীবনচক্র ভেঙে পড়ছে। অনেক প্রজাতি ক্যাম্পাস থেকে হারিয়ে গেছে। ঝোপঝাড় নিধন, নির্মাণকাজ, রাস্তা সম্প্রসারণ, গাছ কাটা এবং অতিরিক্ত মশানাশকের ব্যবহার প্রজাপতির আবাসস্থলের গুরুতর ক্ষতি করেছে।’
২০২৫ সালে Asian-Australasian Journal of Bioscience & Biotechnology-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজাপতি বৈচিত্র্য হ্রাসের আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, সম্ভাব্য ১০৭টি হোস্ট প্ল্যান্টের মধ্যে বর্তমানে লার্ভার জন্য কার্যকর রয়েছে ১২টি, তাও বিক্ষিপ্তভাবে—যা সৃষ্টি করেছে ‘হোস্ট প্ল্যান্ট ফ্র্যাগমেন্টেশন”।
গবেষক দলের সদস্য শ্রাবণী দাস, মুনতাহেনা রুহি, মোহাম্মদ সোহেল আবেদিন ও অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন সতর্ক করে বলেন, ‘হোস্ট প্ল্যান্ট ঘাটতি দূর না হলে অবশিষ্ট ৭২ প্রজাতিও টিকে থাকবে না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫তম প্রজাপতি মেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শুক্রবার
কেন কমছে প্রজাপতি?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রজাপতির সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনাটি যেমন স্থানীয় সমস্যা তেমনি এটি বৈশ্বিক সমস্যা–সংকটেরই প্রতিফলনও বটে। আবাসস্থল ধ্বংস, নির্বিচারে ঝোপঝাড় পরিষ্কার, রাস্তা-ভবন নির্মাণে সবুজ এলাকা সংকুচিত হওয়া—এসব মিলে প্রজাপতির স্বাভাবিক ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। হোস্ট প্ল্যান্ট কমে যাওয়ায় ডিম, লার্ভা, পিউপা—একটি ধাপও যথাযথভাবে সম্পূর্ণ হতে পারছে না। মশা দমনে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক স্প্রে শুধু মশাকেই নয়, প্রজাপতির ডিম ও লার্ভাকেও ধ্বংস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর অস্বাভাবিকতা, অতিরিক্ত গরম, ঠান্ডা—সবই প্রজাপতির প্রজননচক্রকে ব্যাহত করছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, রাতের অতিরিক্ত আলো প্রজাপতির নেভিগেশন সিস্টেম নষ্ট করে। তাদের আচরণ পরিবর্তন করে দেয়। দ্রুত নগরায়নের চাপে শহরাঞ্চলে গুল্মনির্ভর প্রজাতিগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই সংকট কেবল জাবির নয়—বিশ্বজুড়েই প্রজাপতির অবস্থান ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। গত তিন দশকে পৃথিবীতে প্রজাপতির সংখ্যা কমেছে ৫০-৭৫ শতাংশ; যুক্তরাজ্যের Big Butterfly Count দেখাচ্ছে, আগে প্রচুর দেখা যেতো এমন সাধারণ প্রজাতিগুলোও এখন বিপন্নের তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্রে বিখ্যাত Monarch Butterfly কমেছে ৮৫-৯০ শতাংশ। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় গুল্মনির্ভর প্রজাতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাই প্রজাপতিকে বলেন, ‘Canary in the Coal Mine’—অর্থাৎ পরিবেশ-বিপদের আগাম বার্তা।
অধ্যাপক মনোয়ারের মতে, এভাবে ধাপে ধাপে হোস্ট প্ল্যান্ট হারানো, রাসায়নিক দূষণ, জলবায়ুর চাপ এবং আবাসস্থল সংকোচনের ফলে প্রজাপতিরা প্রথমে সংখ্যায় কমতে থাকে, এরপর নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের দেখা মেলে না, আর শেষপর্যন্ত হয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, নয়তো বাধ্য হয়ে অন্যত্র সরে যায়। এই নীরব সরে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রের গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়—যা বহু সময় আমাদের টের পেতে দেরি হয়ে যায়।
পরিবেশ, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের অদৃশ্য নায়ক তারা
প্রজাপতি মৌমাছির পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী। ফলে ফল-ফুল-সবজির উৎপাদনে তাদের অবদান বিশাল এবং কৃষি অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এদের উপস্থিতি পরিবেশের স্বাস্থ্য নির্দেশ করে—যেখানে প্রজাপতি বেশি, সেখানে বাস্তুতন্ত্র সাধারণত সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। একই সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রজাপতি অপরিহার্য: তাদের লার্ভা পাখি, ব্যাঙ, টিকটিকি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রধান খাদ্য। ফলে প্রজাপতির সংকট মানে অধিকতর বড় পরিসরে খাদ্য ঘাটতির ঝুঁকি। গাছের বিস্তার, বীজ উৎপাদন ও জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষায়ও প্রজাপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা পুরো জীববৈচিত্র্যের স্থিতি নিশ্চিত করে। পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্য, পরিবেশ-শিক্ষা ও শিশুদের প্রকৃতিবোধ গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করে। তাই তারা শুধু রঙিন ডানা নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের নীরব রক্ষক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখার আয়োজনে প্রজাপতি মেলা অনুষ্ঠিত হবে
কীভাবে পুনরায় ফিরবে?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রজাপতির হারানো বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত হোস্ট প্ল্যান্ট পুনঃরোপণ—মিল্কউইড, ল্যান্টানা, কাসিয়া, ক্যালোট্রোপিস, সাইট্রাসসহ লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির খাদ্য উদ্ভিদ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বিচারে ঝোপঝাড় নিধন বন্ধ করে লার্ভাসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো সুরক্ষিত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ক্যাম্পাস-সংলগ্ন যেকোনো নির্মাণকাজে পরিবেশগত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা এবং ইকো-ফ্রেন্ডলি পরিকল্পনা ছাড়া কোনও সড়ক বা ভবন নির্মাণ না করা। চতুর্থত, মশানাশকে নিয়ন্ত্রণ—বিশেষ করে প্রজাপতি হটস্পটগুলোতে ‘No Chemical Zone’ ঘোষণা করা জরুরি। পঞ্চমত, বিচ্ছিন্ন সবুজ এলাকা ও গুল্মজাতীয় গাছকে সংযুক্ত করে ‘প্রজাপতি সংরক্ষণ করিডর’ তৈরি করতে হবে, যাতে চলাচল ও প্রজনন বাধাহীন হয়। পাশাপাশি প্রজাতিভিত্তিক ডেটা সংগ্রহ, নিয়মিত মনিটরিং এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা জোরদার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সফল উদাহরণগুলো জাবির জন্যও কার্যকর হতে পারে—যেমন যুক্তরাজ্যের Rewilding প্রোগ্রামে ঝোপঝাড়-গুল্ম ফিরিয়ে এনে বিপন্ন প্রজাতি ফিরে এসেছে; যুক্তরাষ্ট্রে মনার্ক প্রজাপতির জন্য ২,৫০০ কিলোমিটার ‘Milkweed Corridor’ তৈরি করা হয়েছে; আর শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর গড়ে তোলা হয়েছে পৃথক ‘Butterfly Forest Reserve’। জাবি চাইলে এসব মডেলের যেকোনো একটি বা সমন্বিত প্রয়োগ করে হারানো প্রজাপতি বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে পারে।
‘প্রজাপতি মেলা’ প্রকৃতি রক্ষায় নতুন আহ্বান
জাবির প্রজাপতি মেলা কেবল উৎসব নয়—এটি প্রকৃতির জন্য সচেতনতার বার্তা। অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন সতর্ক করেন—প্রকৃতিতে প্রজাপতি থাকলে জীবন থাকে। প্রজাপতি হারিয়ে গেলে প্রকৃতিও থমকে যায়। মেলায় থাকে—ছবি আঁকা, প্রজাপতি চেনা, কুইজ, পাপেট শো, ঘুড়ি ওড়ানো, প্রজাপতি সংরক্ষণে বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড, ইয়াং এনথুসিয়াস্ট অ্যাওয়ার্ড। আয়োজকদের মতে, সংরক্ষণ ছাড়া মেলা অর্থহীন—এটি মানুষের মনে প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করে।
একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রজাপতির রাজ্য। কিন্তু সেই রাজ্য দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। হোস্ট প্ল্যান্ট রক্ষা, ঝোপঝাড় সংরক্ষণ ও সবুজ এলাকা সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে—আগামী দশকে প্রজাপতির রঙিন ডানা হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখা যাবে।
রিপোর্টারের নাম 























