ঢাকা ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জেন জেডের রাজনীতি ও মগজের নতুন ‘ফ্রেম’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২৯:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

দিন কয়েক আগে আমার গবেষণা দলের সঙ্গে একটি মিটিং ছিল। উদ্দেশ্য ছিল চলমান কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা। আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করা। মিটিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখি মাত্র দুজন ছাড়া আর কেউ হাজির হননি। এর ফাঁকে বলে রাখি, আমার গবেষণা দলের বেশিরভাগ সদস্যই বয়সে তরুণ। হালের প্রচলিত ভাষা অনুযায়ী তারা ‘জেন জেড’। সেদিন হাজির দুই সদস্যের একজন ‘জেন জেড’। আরেকজন ‘মিলেনিয়েল’। প্রাথমিক কিছু আলাপ সেরে সেই দুজন সদস্যকে বিদায় জানিয়ে উঠবো, ঠিক তখনই মিলেনিয়েল প্রজন্মের সদস্যটি দলের অন্যান্য সদস্য জেন জেডদের সময়বোধ ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে কিছু একটা বলেন। এতে দ্বিতীয়জন প্রবল আপত্তি জানায়।

বয়সের ফেরে আমি মিলেনিয়েলেই পড়ি। তাদের যুক্তিতর্কের কোনও পক্ষ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে থাকি। একপর্যায়ে তাদের আলোচনা দুই প্রজন্মের চিন্তার প্যাটার্ন ও সমাজ মূল্যবোধ থেকে রাজনীতি ও রাজনৈতিক চেতনাবোধে গিয়ে ঠেকে। এই দুই প্রজন্মের চিন্তার আঙ্গিক ও কাঠামো নিয়ে বাদানুবাদ দেখতে বেশ পুলক বোধ করি। কারণ আমার বর্তমান চিন্তা ও কাজের একটা বড় জায়গাজুড়ে আছে সোশ্যাল ও কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবিক যোগাযোগ, আচরণ ও স্বাস্থ্যকে দেখা ও বোঝার চেষ্টা। একপর্যায়ে তারা আমার মতামত ও অবস্থান জানতে চাইলেন। এতে আমি খানিকটা মসিবতে পড়ে যাই।

বর্তমান জেন জেড ও রাজনীতি নিয়ে আমার জানাশোনার সীমাবদ্ধতার কথা বলি। কিছুটা এড়ানোর জন্য বলি এই প্রজন্মের রাজনৈতিক বোধ, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে খুবই সহায়ক স্নায়ুবিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ জর্জ ল্যাকফ এর ‘দ্য পলিটিক্যাল মাইন্ড’ বইটি পড়ার কথা বলি। কিন্তু তারা নাছোড় বান্দা। আমার মতামত তারা জানবেই। যাহোক, আজকের আলোচনাটি মূলত আমার দুই গবেষণা সহকারীকে যা বলেছিলাম তার ভিত্তিতেই।

শুরুতেই আসা যাক জর্জ ল্যাকফ-এর বইটি প্রসঙ্গে। এই বইয়ের একজন জ্ঞানবিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ। ২০০৮ সালে প্রকাশিত বইটির পুরো নাম ‘দ্য পলিটিক্যাল মাইন্ড: এ কগনিটিভ সায়েন্টিস্টস গাইড টু ইয়োর ব্রেইন অ্যান্ড ইটস পলিটিক্স’। কভার পেজের পরের প্রথম পৃষ্ঠায় বইটির শিরোনামের সাথে লেখা আছে ‘কেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মস্তিষ্ক দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি বোঝা সম্ভব নয়’।

আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু এই বাক্যটিতেই। সহজ কথায় আমরা যদি ৩০০ বছর আগের পুরনো চিন্তাধারা (অষ্টাদশ শতাব্দী) দিয়ে আজকের যুগের (একবিংশ শতাব্দী) আধুনিক রাজনীতি বোঝার চেষ্টা করি, তবে আমরা তা বুঝতে পারবো না। কারণ আজকের রাজনীতি বুঝতে হলে মানুষের অবচেতন মন ও স্নায়ুবিজ্ঞান সম্পর্কে নতুন জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে।

সাধারণত আমরা ধরে নিই যে মানুষ খুব যুক্তিবাদী প্রাণী। কিন্তু বাস্তবে তা সত্যি না। আমাদের চিন্তা-ভাবনা বা নীতি-নৈতিকতা শরীরের বাইরে হাওয়ায় ভাসে না। এগুলো এমন না যে আমরা দরকার মতো নিলাম আর কাজে লাগালাম। বরং এগুলো আমাদের মগজের ভেতরেই তৈরি হয়। মগজের মধ্যে এগুলোর একটা বাস্তব শারীরিক কাঠামো আছে। যেমন ধরুন, নাচ বা টাইপ করা শিখলে সেটা আমাদের শরীরের অভ্যাসে পরিণত হয়। ঠিক তেমনি আমাদের মনের মধ্যেও কিছু নির্দিষ্ট ‘গল্প’ বা ‘ধারণা’ তৈরি হয়ে যায়। আমরা নতুন কোনও তথ্য পেলে ওই পুরনো ধারণার ছাঁচেই সেটাকে ফেলতে চাই। একবার একটা ধারণা মনে গেঁথে গেলে তা বদলানো খুব কঠিন। ওই ধারণা বদলে নতুন কিছু ভাবা, নতুন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখার মতোই কষ্টসাধ্য কাজ।

জর্জ ল্যাকফ তাঁর ‘দ্য পলিটিক্যাল মাইন্ড’ বইটিতে বলেছেন যে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসগুলো মূলত তৈরি হয় কিছু অবচেতন গল্প বা ধারণা এবং মানসিক কাঠামোর মাধ্যমে। এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের খুব গভীরে গেঁথে থাকে। আমাদের সংস্কৃতি, উপমা এবং রীতিনীতি থেকেই এই গল্পগুলো গড়ে ওঠে। আমরা কোনও জটিল বিষয় কীভাবে বুঝবো, তাতে আবেগ দিয়ে কীভাবে সাড়া দেবো, কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকবো–তা এই ভেতরের গল্পগুলোই ঠিক করে দেয়।

ল্যাকফ জোর দিয়ে বলেছেন, রাজনীতির বেশিরভাগ চিন্তাই শুধু যুক্তি দিয়ে আসে না। বরং এগুলো চালিত হয় আবেগ, অভ্যাস আর মনের ভেতরে আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকা কাঠামোর মাধ্যমে। গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া আর নানা প্রতীক এই বিশ্বাসগুলোকে আরও মজবুত করে তোলে, ফলে এগুলো সহজে বদলানো যায় না।

যাহোক, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তারা অধৈর্য। কোনও কথা শোনে না। রাজনীতি বুঝে না। তারা কেবল ফেসবুক-টিকটক রাজনীতি করে। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই প্রজন্ম রাজনীতি একেবারে ভিন্নভাবে দেখে। তারা দেশের পুরনো রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণ নিয়ে তাদের মাঝে কোনও আবেগ বহন করে না। তাদের মাথার ভেতর তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ধারণা। এই পরিবর্তন শুধু বৈশ্বিক প্রবণতা নয়; বাংলাদেশের ভোটার বাস্তবতায়ও এর স্পষ্ট প্রভাব আছে।

ভোটের মাঠে হোক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সিদ্ধান্ত ও বিতর্ক–দুটোতেই তাদের প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু এই প্রজন্মের রাজনৈতিক আচরণকে শুধু ‘আবেগ’, ‘অভিজ্ঞতার অভাব’ বা ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমপ্রসূত উত্তেজনা’ বলে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতাকে ছোট করে দেখা হয়। তাদের রাজনৈতিক মনোজগৎ তৈরি হচ্ছে এমন এক পরিবেশে, যা আগের কোনও প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রচলিত ভাষা দিয়ে এই পরিবর্তন বোঝা কঠিন।

আগের প্রজন্ম সংবাদ পেতো গুটিকয়েক টিভি চ্যানেল, রেডিও ও পত্রিকা থেকে। কিন্তু জেন জেড প্রতিদিন শত শত রাজনৈতিক ছবি, ভিডিও, গল্প দেখে। নিউরোসায়েন্স বলে, বারবার যে বিষয় চোখে পড়ে, সেটাই মনের ভেতর ‘ফ্রেম’ হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় নানান লাইভ ভিডিও, লাঠিপেটা, আর্তনাদ, হাজারও দুর্নীতি ও বৈষম্যের চিত্র ও সংবাদ এসব তরুণদের মনে ন্যায্যতাবোধের একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করেছে। আর রাজনীতির প্রতি তাদের অবিশ্বাস বা ক্ষোভের বড় অংশ তৈরি হয়েছে এই অভিজ্ঞতা থেকে।

আমাদের রাজনীতিতে বহুদিন ধরে ‘বড় নেতা, বড় দল, বড় আদর্শ’-এর ওপর ভিত্তি করে চিন্তা গড়ে উঠেছে।  ল্যাকফ এটিকে বলেন ‘স্ট্রিক্ট ফাদার ফ্রেম’। অর্থাৎ, নেতা মানে অভিভাবক। তাঁর কথা মানতেই হবে। কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। জেন জেড এই ভাষা বোঝে না। বোঝার প্রয়োজনও মনে করে না। তাদের কাছে রাজনীতি মানে দায়িত্ব ভাগাভাগি, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা। তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই থেকে হয়নি। হয়েছে ইউটিউবের ইনফ্লয়েন্সারদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনা, জলবায়ু আন্দোলন, আর অনলাইন ভিডিওর মাধ্যমে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে অনেকে অভিহিত করছেন এটি হঠাৎ তরুণদের মাঝে একটি ক্ষোভের বিস্ফোরণ হিসেবে। কিন্তু যোগাযোগ-নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিতে এটি আরও গভীর ঘটনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পুরো প্রজন্ম রাজনীতিকে নতুনভাবে বুঝতে শিখেছে। তাদের মস্তিষ্কে রাজনীতির কাঠামোই বদলে গেছে।

বাংলাদেশে এখন ১৫-২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। এদের সিংহভাগের রাজনৈতিক জ্ঞান গঠিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও, ভাইরাল ক্লিপ, পডকাস্ট, ওয়েব সিরিজ ও বিদেশি কনটেন্টের মাধ্যমে। এটি আগের প্রজন্মের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় তথ্যনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পুরো বিপরীত। নিউরোসায়েন্স জানায়, পুনরাবৃত্তি ও আবেগ উদ্দীপক ছবি-ভিডিও মানুষের মস্তিষ্কে স্থায়ী ‘ফ্রেম’ তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা এখনও ‘উন্নয়ন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’-কে মূল সূচক ধরে চলে। এই ভাষা আসলে এক ধরনের ‘কঠোর পিতা’ ফ্রেমের।  এই ফ্রেমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানেই তারা দেশ ও জাতির অভিভাবক। তাদের কথা মানতেই হবে। বিরোধিতা মানে বেয়াদবি। শৃঙ্খলা ব্যক্তিস্বাধীনতার চেয়ে বড়।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার জনগণকে বলে এসেছে ‘আমরা উন্নয়ন দেবো, তোমরা আনুগত্য দেখাও’। কিন্তু জেনারেশন জেড এই ফ্রেম মানতে চায় না। তাদের বড় হওয়া ভিন্ন পরিবেশে–ইন্টারনেট, বৈশ্বিক সংযোগ, ডিজিটাল স্বাধীনতা ও মানবাধিকার আলোচনার মধ্যে। তাদের মস্তিষ্ক ‘উন্নয়ন’ আর ‘গণতন্ত্র’কে আলাদা করে দেখে না। তাদের কাছে বৈধ সরকার মানে উন্নয়ন ও অধিকার দুটোই একসাথে। তাই যখন সরকার বলে, ‘উন্নয়ন পাচ্ছো, গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করো না’ তখন তরুণদের মধ্যে তীব্র মানসিক বিরোধ তৈরি হয়। কেননা জেন জেডের কাছে রাজনীতি মানে ‘সহযোগিতামূলক প্রকল্প’, যেখানে তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাযোগ্য হবে। আর শাসন হবে অংশগ্রহণভিত্তিক। এটি সম্পূর্ণ আলাদা নৈতিক গঠন। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্ম পুরনো ভাষা আর গ্রহণ করে না। ফলে রাজনৈতিক বার্তা ও তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে মেলবন্ধন হয় না।

ল্যাকফ দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক পছন্দ আসলে নৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তরুণ বাংলাদেশের তিনটি নৈতিক কাঠামো সবচেয়ে স্পষ্ট– ন্যায্যতা, মানবিকতা, ও মর্যাদা। চাকরি, সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা সবকিছুতেই ‘সমান সুযোগ’ তাদের প্রধান দাবি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে তারা তাই প্রশাসনিক নয়, নৈতিক দাবি হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু দুর্যোগ ও নারীর অধিকার এসব বিষয়ে তরুণদের মানবিক সাড়া আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। তাদের রাজনৈতিক বোধ মানবিক প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে দেয় না। আর বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি তাদের কাছে মর্যাদাহানির অনুভূতি। এই অনুভূতি রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেয় দ্রুত।

যুবসমাজের বড় অংশ মনে করে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ‘তাদের জন্য তৈরি নয়’। এই ধারণা কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার বোধের জন্ম দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়মকানুন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠী আপনা-আপনিই সুযোগ-সুবিধা থেকে বাদ পড়ে যায়। এটি ব্যক্তিগত কোনও ঘৃণা নয়। বরং পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই এই বর্জন প্রক্রিয়া বা বৈষম্য গেঁথে থাকে। উদাহরণ– যদি এমন কোনও চাকরির নিয়ম করা হয় যেখানে শুধু ইংরেজি মাধ্যম থেকে আসা ছাত্ররাই আবেদন করতে পারবে, তবে সেখানে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রদের প্রতি ‘কাঠামোগত বর্জন’ করা হলো।  নিউরোসায়েন্স বলে, যখন কোনও গোষ্ঠী বারবার অবহেলার অভিজ্ঞতা পায়, তখন তাদের মস্তিষ্কে শক্তিশালী ‘বঞ্চনা স্কিমা’ তৈরি হয়। এই স্কিমা ভবিষ্যতের ঘটনাকেও পূর্বনির্ধারিত সন্দেহ ও ক্ষোভের চোখে দেখে। বাংলাদেশে তরুণদের রাজনীতিবিরোধী ক্ষোভের কেন্দ্রে তাই কোনও একক ঘটনা নয়। বরং ধারাবাহিক বাদ পড়ার অনুভূতি।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ধরে নেয়– তরুণদের উন্নয়ন সূচক দেখালে তারা সন্তুষ্ট হবে। জাতীয় ইতিহাসের প্রতি আনুগত্য দেখানোই যথেষ্ট। নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করে। কিন্তু জেন জেড এই ভাষায় সাড়া দেয় না। তাদের কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রক্রিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বক্তৃতার চেয়ে স্বচ্ছতা বেশি জরুরি। আনুগত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন-যুক্তির চেয়ে ন্যায্যতা বেশির দরকারি। তাই প্রচলিত দলীয় প্রচার তাদের কাছে অসঙ্গত মনে হয়।

আমি মনে করি জেন জেড-এ এই রাজনৈতিক চেতনা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে দু’ভাবে বদলে দেবে। আর তা হলো দলীয় রাজনীতির পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মানদণ্ড। ব্যক্তিনির্ভর দলীয় কাঠামো তাদের কাছে আকর্ষণীয় নয়। তারা চাইবে নীতিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক দল। আর  রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মানদণ্ডের প্রশ্নে তারা আশা করবে– তথ্য হবে খোলামেলা।  সিদ্ধান্ত হবে ব্যাখ্যাযোগ্য। নেতৃত্ব হবে জবাবদিহিমূলক। আর রাজনৈতিক বিতর্ক হবে তথ্যসমৃদ্ধ।

রাজনীতিতে জেন জেড তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি মূল্য দেবে। আর তা হলো  ন্যায্যতা, মানবিকতা ও সম্মান। তাদের কথা কথা শুনতে হবে। অবমূল্যায়ন করা যাবে না। এই মূল্যবোধগুলো আগের প্রজন্মের রাজনীতির সঙ্গে অনেক সময় সাংঘর্ষিক। ফলে দুই পক্ষের আলোচনায় দূরত্ব তৈরি হয়। যেমনটা হয়েছিল আমার সেই দুই গবেষণা সহকারীর মাঝে।

এছাড়াও আজকের তরুণরা বেকারত্ব, অসমতা, দুর্নীতি, অন্যায় আচরণ- এসবকে কেবল অভিযোগ হিসেবে দেখে না। তারা এগুলোকে দেখে ‘ব্যবস্থার সমস্যা’ হিসেবে। তাই তাদের ক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়। তারা পুরাতন রাজনৈতিক চিন্তার ধরনকেও প্রত্যাখ্যান করছে। তবে জেন জেড কোনও দলবিরোধী নয়। তারা কেবল চায় রাজনীতি যেন ২১ শতকের মানুষের মতো হয়–গতি, ন্যায়, সম্মান আর খোলামেলা আচরণে ভরা। তারা চায় কথার চেয়ে কাজ। নীতির চেয়ে প্রয়োগ। এই প্রজন্ম ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক কথোপকথন বদলে দিয়েছে। সামনে তারা ভোটের মাঠও বদলে দেবে।

রাজনীতিতে আরও সচেতন ও বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হলে, আমাদের মনের ভেতরের এই অবচেতন কাঠামো বা ‘ফ্রেম’গুলোকে চিনতে হবে। তরুণ ভোটারদের বুঝতে হবে, ঠিক কোন পেছনের গল্পগুলো তাদের মতামতকে প্রভাবিত করছে। এই ধারণাগুলোকে সচেতনভাবে যাচাই-বাছাই ও চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমেই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এতে তারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে আরও সচেতনভাবে অংশ নিতে পারবে।

বাংলাদেশের জেন জেড কেবল নতুন ভোটার নয়; তারা রাজনৈতিক অর্থে একটি নতুন মানসিক পরিকাঠামো। প্রশ্ন হলো, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি এই নতুন মনোজগৎকে বোঝার মতো প্রস্তুত? নাকি তারা এখনো ১৮ শতকের রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে ২১ শতকের নাগরিককে বোঝানোর চেষ্টা করবে? দেশের রাজনীতি কি এই নতুন প্রজন্মকে বুঝতে প্রস্তুত?

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

জেন জেডের রাজনীতি ও মগজের নতুন ‘ফ্রেম’

আপডেট সময় : ০৭:২৯:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫

দিন কয়েক আগে আমার গবেষণা দলের সঙ্গে একটি মিটিং ছিল। উদ্দেশ্য ছিল চলমান কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা। আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করা। মিটিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখি মাত্র দুজন ছাড়া আর কেউ হাজির হননি। এর ফাঁকে বলে রাখি, আমার গবেষণা দলের বেশিরভাগ সদস্যই বয়সে তরুণ। হালের প্রচলিত ভাষা অনুযায়ী তারা ‘জেন জেড’। সেদিন হাজির দুই সদস্যের একজন ‘জেন জেড’। আরেকজন ‘মিলেনিয়েল’। প্রাথমিক কিছু আলাপ সেরে সেই দুজন সদস্যকে বিদায় জানিয়ে উঠবো, ঠিক তখনই মিলেনিয়েল প্রজন্মের সদস্যটি দলের অন্যান্য সদস্য জেন জেডদের সময়বোধ ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে কিছু একটা বলেন। এতে দ্বিতীয়জন প্রবল আপত্তি জানায়।

বয়সের ফেরে আমি মিলেনিয়েলেই পড়ি। তাদের যুক্তিতর্কের কোনও পক্ষ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে থাকি। একপর্যায়ে তাদের আলোচনা দুই প্রজন্মের চিন্তার প্যাটার্ন ও সমাজ মূল্যবোধ থেকে রাজনীতি ও রাজনৈতিক চেতনাবোধে গিয়ে ঠেকে। এই দুই প্রজন্মের চিন্তার আঙ্গিক ও কাঠামো নিয়ে বাদানুবাদ দেখতে বেশ পুলক বোধ করি। কারণ আমার বর্তমান চিন্তা ও কাজের একটা বড় জায়গাজুড়ে আছে সোশ্যাল ও কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবিক যোগাযোগ, আচরণ ও স্বাস্থ্যকে দেখা ও বোঝার চেষ্টা। একপর্যায়ে তারা আমার মতামত ও অবস্থান জানতে চাইলেন। এতে আমি খানিকটা মসিবতে পড়ে যাই।

বর্তমান জেন জেড ও রাজনীতি নিয়ে আমার জানাশোনার সীমাবদ্ধতার কথা বলি। কিছুটা এড়ানোর জন্য বলি এই প্রজন্মের রাজনৈতিক বোধ, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে খুবই সহায়ক স্নায়ুবিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ জর্জ ল্যাকফ এর ‘দ্য পলিটিক্যাল মাইন্ড’ বইটি পড়ার কথা বলি। কিন্তু তারা নাছোড় বান্দা। আমার মতামত তারা জানবেই। যাহোক, আজকের আলোচনাটি মূলত আমার দুই গবেষণা সহকারীকে যা বলেছিলাম তার ভিত্তিতেই।

শুরুতেই আসা যাক জর্জ ল্যাকফ-এর বইটি প্রসঙ্গে। এই বইয়ের একজন জ্ঞানবিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ। ২০০৮ সালে প্রকাশিত বইটির পুরো নাম ‘দ্য পলিটিক্যাল মাইন্ড: এ কগনিটিভ সায়েন্টিস্টস গাইড টু ইয়োর ব্রেইন অ্যান্ড ইটস পলিটিক্স’। কভার পেজের পরের প্রথম পৃষ্ঠায় বইটির শিরোনামের সাথে লেখা আছে ‘কেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মস্তিষ্ক দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি বোঝা সম্ভব নয়’।

আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু এই বাক্যটিতেই। সহজ কথায় আমরা যদি ৩০০ বছর আগের পুরনো চিন্তাধারা (অষ্টাদশ শতাব্দী) দিয়ে আজকের যুগের (একবিংশ শতাব্দী) আধুনিক রাজনীতি বোঝার চেষ্টা করি, তবে আমরা তা বুঝতে পারবো না। কারণ আজকের রাজনীতি বুঝতে হলে মানুষের অবচেতন মন ও স্নায়ুবিজ্ঞান সম্পর্কে নতুন জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে।

সাধারণত আমরা ধরে নিই যে মানুষ খুব যুক্তিবাদী প্রাণী। কিন্তু বাস্তবে তা সত্যি না। আমাদের চিন্তা-ভাবনা বা নীতি-নৈতিকতা শরীরের বাইরে হাওয়ায় ভাসে না। এগুলো এমন না যে আমরা দরকার মতো নিলাম আর কাজে লাগালাম। বরং এগুলো আমাদের মগজের ভেতরেই তৈরি হয়। মগজের মধ্যে এগুলোর একটা বাস্তব শারীরিক কাঠামো আছে। যেমন ধরুন, নাচ বা টাইপ করা শিখলে সেটা আমাদের শরীরের অভ্যাসে পরিণত হয়। ঠিক তেমনি আমাদের মনের মধ্যেও কিছু নির্দিষ্ট ‘গল্প’ বা ‘ধারণা’ তৈরি হয়ে যায়। আমরা নতুন কোনও তথ্য পেলে ওই পুরনো ধারণার ছাঁচেই সেটাকে ফেলতে চাই। একবার একটা ধারণা মনে গেঁথে গেলে তা বদলানো খুব কঠিন। ওই ধারণা বদলে নতুন কিছু ভাবা, নতুন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখার মতোই কষ্টসাধ্য কাজ।

জর্জ ল্যাকফ তাঁর ‘দ্য পলিটিক্যাল মাইন্ড’ বইটিতে বলেছেন যে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসগুলো মূলত তৈরি হয় কিছু অবচেতন গল্প বা ধারণা এবং মানসিক কাঠামোর মাধ্যমে। এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের খুব গভীরে গেঁথে থাকে। আমাদের সংস্কৃতি, উপমা এবং রীতিনীতি থেকেই এই গল্পগুলো গড়ে ওঠে। আমরা কোনও জটিল বিষয় কীভাবে বুঝবো, তাতে আবেগ দিয়ে কীভাবে সাড়া দেবো, কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকবো–তা এই ভেতরের গল্পগুলোই ঠিক করে দেয়।

ল্যাকফ জোর দিয়ে বলেছেন, রাজনীতির বেশিরভাগ চিন্তাই শুধু যুক্তি দিয়ে আসে না। বরং এগুলো চালিত হয় আবেগ, অভ্যাস আর মনের ভেতরে আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকা কাঠামোর মাধ্যমে। গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া আর নানা প্রতীক এই বিশ্বাসগুলোকে আরও মজবুত করে তোলে, ফলে এগুলো সহজে বদলানো যায় না।

যাহোক, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তারা অধৈর্য। কোনও কথা শোনে না। রাজনীতি বুঝে না। তারা কেবল ফেসবুক-টিকটক রাজনীতি করে। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই প্রজন্ম রাজনীতি একেবারে ভিন্নভাবে দেখে। তারা দেশের পুরনো রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণ নিয়ে তাদের মাঝে কোনও আবেগ বহন করে না। তাদের মাথার ভেতর তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ধারণা। এই পরিবর্তন শুধু বৈশ্বিক প্রবণতা নয়; বাংলাদেশের ভোটার বাস্তবতায়ও এর স্পষ্ট প্রভাব আছে।

ভোটের মাঠে হোক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সিদ্ধান্ত ও বিতর্ক–দুটোতেই তাদের প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু এই প্রজন্মের রাজনৈতিক আচরণকে শুধু ‘আবেগ’, ‘অভিজ্ঞতার অভাব’ বা ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমপ্রসূত উত্তেজনা’ বলে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতাকে ছোট করে দেখা হয়। তাদের রাজনৈতিক মনোজগৎ তৈরি হচ্ছে এমন এক পরিবেশে, যা আগের কোনও প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রচলিত ভাষা দিয়ে এই পরিবর্তন বোঝা কঠিন।

আগের প্রজন্ম সংবাদ পেতো গুটিকয়েক টিভি চ্যানেল, রেডিও ও পত্রিকা থেকে। কিন্তু জেন জেড প্রতিদিন শত শত রাজনৈতিক ছবি, ভিডিও, গল্প দেখে। নিউরোসায়েন্স বলে, বারবার যে বিষয় চোখে পড়ে, সেটাই মনের ভেতর ‘ফ্রেম’ হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় নানান লাইভ ভিডিও, লাঠিপেটা, আর্তনাদ, হাজারও দুর্নীতি ও বৈষম্যের চিত্র ও সংবাদ এসব তরুণদের মনে ন্যায্যতাবোধের একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করেছে। আর রাজনীতির প্রতি তাদের অবিশ্বাস বা ক্ষোভের বড় অংশ তৈরি হয়েছে এই অভিজ্ঞতা থেকে।

আমাদের রাজনীতিতে বহুদিন ধরে ‘বড় নেতা, বড় দল, বড় আদর্শ’-এর ওপর ভিত্তি করে চিন্তা গড়ে উঠেছে।  ল্যাকফ এটিকে বলেন ‘স্ট্রিক্ট ফাদার ফ্রেম’। অর্থাৎ, নেতা মানে অভিভাবক। তাঁর কথা মানতেই হবে। কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। জেন জেড এই ভাষা বোঝে না। বোঝার প্রয়োজনও মনে করে না। তাদের কাছে রাজনীতি মানে দায়িত্ব ভাগাভাগি, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা। তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই থেকে হয়নি। হয়েছে ইউটিউবের ইনফ্লয়েন্সারদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনা, জলবায়ু আন্দোলন, আর অনলাইন ভিডিওর মাধ্যমে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে অনেকে অভিহিত করছেন এটি হঠাৎ তরুণদের মাঝে একটি ক্ষোভের বিস্ফোরণ হিসেবে। কিন্তু যোগাযোগ-নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিতে এটি আরও গভীর ঘটনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পুরো প্রজন্ম রাজনীতিকে নতুনভাবে বুঝতে শিখেছে। তাদের মস্তিষ্কে রাজনীতির কাঠামোই বদলে গেছে।

বাংলাদেশে এখন ১৫-২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। এদের সিংহভাগের রাজনৈতিক জ্ঞান গঠিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও, ভাইরাল ক্লিপ, পডকাস্ট, ওয়েব সিরিজ ও বিদেশি কনটেন্টের মাধ্যমে। এটি আগের প্রজন্মের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় তথ্যনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পুরো বিপরীত। নিউরোসায়েন্স জানায়, পুনরাবৃত্তি ও আবেগ উদ্দীপক ছবি-ভিডিও মানুষের মস্তিষ্কে স্থায়ী ‘ফ্রেম’ তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা এখনও ‘উন্নয়ন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’-কে মূল সূচক ধরে চলে। এই ভাষা আসলে এক ধরনের ‘কঠোর পিতা’ ফ্রেমের।  এই ফ্রেমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানেই তারা দেশ ও জাতির অভিভাবক। তাদের কথা মানতেই হবে। বিরোধিতা মানে বেয়াদবি। শৃঙ্খলা ব্যক্তিস্বাধীনতার চেয়ে বড়।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার জনগণকে বলে এসেছে ‘আমরা উন্নয়ন দেবো, তোমরা আনুগত্য দেখাও’। কিন্তু জেনারেশন জেড এই ফ্রেম মানতে চায় না। তাদের বড় হওয়া ভিন্ন পরিবেশে–ইন্টারনেট, বৈশ্বিক সংযোগ, ডিজিটাল স্বাধীনতা ও মানবাধিকার আলোচনার মধ্যে। তাদের মস্তিষ্ক ‘উন্নয়ন’ আর ‘গণতন্ত্র’কে আলাদা করে দেখে না। তাদের কাছে বৈধ সরকার মানে উন্নয়ন ও অধিকার দুটোই একসাথে। তাই যখন সরকার বলে, ‘উন্নয়ন পাচ্ছো, গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করো না’ তখন তরুণদের মধ্যে তীব্র মানসিক বিরোধ তৈরি হয়। কেননা জেন জেডের কাছে রাজনীতি মানে ‘সহযোগিতামূলক প্রকল্প’, যেখানে তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাযোগ্য হবে। আর শাসন হবে অংশগ্রহণভিত্তিক। এটি সম্পূর্ণ আলাদা নৈতিক গঠন। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্ম পুরনো ভাষা আর গ্রহণ করে না। ফলে রাজনৈতিক বার্তা ও তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে মেলবন্ধন হয় না।

ল্যাকফ দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক পছন্দ আসলে নৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তরুণ বাংলাদেশের তিনটি নৈতিক কাঠামো সবচেয়ে স্পষ্ট– ন্যায্যতা, মানবিকতা, ও মর্যাদা। চাকরি, সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা সবকিছুতেই ‘সমান সুযোগ’ তাদের প্রধান দাবি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে তারা তাই প্রশাসনিক নয়, নৈতিক দাবি হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু দুর্যোগ ও নারীর অধিকার এসব বিষয়ে তরুণদের মানবিক সাড়া আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। তাদের রাজনৈতিক বোধ মানবিক প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে দেয় না। আর বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি তাদের কাছে মর্যাদাহানির অনুভূতি। এই অনুভূতি রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেয় দ্রুত।

যুবসমাজের বড় অংশ মনে করে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ‘তাদের জন্য তৈরি নয়’। এই ধারণা কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার বোধের জন্ম দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়মকানুন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠী আপনা-আপনিই সুযোগ-সুবিধা থেকে বাদ পড়ে যায়। এটি ব্যক্তিগত কোনও ঘৃণা নয়। বরং পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই এই বর্জন প্রক্রিয়া বা বৈষম্য গেঁথে থাকে। উদাহরণ– যদি এমন কোনও চাকরির নিয়ম করা হয় যেখানে শুধু ইংরেজি মাধ্যম থেকে আসা ছাত্ররাই আবেদন করতে পারবে, তবে সেখানে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রদের প্রতি ‘কাঠামোগত বর্জন’ করা হলো।  নিউরোসায়েন্স বলে, যখন কোনও গোষ্ঠী বারবার অবহেলার অভিজ্ঞতা পায়, তখন তাদের মস্তিষ্কে শক্তিশালী ‘বঞ্চনা স্কিমা’ তৈরি হয়। এই স্কিমা ভবিষ্যতের ঘটনাকেও পূর্বনির্ধারিত সন্দেহ ও ক্ষোভের চোখে দেখে। বাংলাদেশে তরুণদের রাজনীতিবিরোধী ক্ষোভের কেন্দ্রে তাই কোনও একক ঘটনা নয়। বরং ধারাবাহিক বাদ পড়ার অনুভূতি।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ধরে নেয়– তরুণদের উন্নয়ন সূচক দেখালে তারা সন্তুষ্ট হবে। জাতীয় ইতিহাসের প্রতি আনুগত্য দেখানোই যথেষ্ট। নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করে। কিন্তু জেন জেড এই ভাষায় সাড়া দেয় না। তাদের কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রক্রিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বক্তৃতার চেয়ে স্বচ্ছতা বেশি জরুরি। আনুগত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন-যুক্তির চেয়ে ন্যায্যতা বেশির দরকারি। তাই প্রচলিত দলীয় প্রচার তাদের কাছে অসঙ্গত মনে হয়।

আমি মনে করি জেন জেড-এ এই রাজনৈতিক চেতনা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে দু’ভাবে বদলে দেবে। আর তা হলো দলীয় রাজনীতির পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মানদণ্ড। ব্যক্তিনির্ভর দলীয় কাঠামো তাদের কাছে আকর্ষণীয় নয়। তারা চাইবে নীতিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক দল। আর  রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মানদণ্ডের প্রশ্নে তারা আশা করবে– তথ্য হবে খোলামেলা।  সিদ্ধান্ত হবে ব্যাখ্যাযোগ্য। নেতৃত্ব হবে জবাবদিহিমূলক। আর রাজনৈতিক বিতর্ক হবে তথ্যসমৃদ্ধ।

রাজনীতিতে জেন জেড তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি মূল্য দেবে। আর তা হলো  ন্যায্যতা, মানবিকতা ও সম্মান। তাদের কথা কথা শুনতে হবে। অবমূল্যায়ন করা যাবে না। এই মূল্যবোধগুলো আগের প্রজন্মের রাজনীতির সঙ্গে অনেক সময় সাংঘর্ষিক। ফলে দুই পক্ষের আলোচনায় দূরত্ব তৈরি হয়। যেমনটা হয়েছিল আমার সেই দুই গবেষণা সহকারীর মাঝে।

এছাড়াও আজকের তরুণরা বেকারত্ব, অসমতা, দুর্নীতি, অন্যায় আচরণ- এসবকে কেবল অভিযোগ হিসেবে দেখে না। তারা এগুলোকে দেখে ‘ব্যবস্থার সমস্যা’ হিসেবে। তাই তাদের ক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়। তারা পুরাতন রাজনৈতিক চিন্তার ধরনকেও প্রত্যাখ্যান করছে। তবে জেন জেড কোনও দলবিরোধী নয়। তারা কেবল চায় রাজনীতি যেন ২১ শতকের মানুষের মতো হয়–গতি, ন্যায়, সম্মান আর খোলামেলা আচরণে ভরা। তারা চায় কথার চেয়ে কাজ। নীতির চেয়ে প্রয়োগ। এই প্রজন্ম ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক কথোপকথন বদলে দিয়েছে। সামনে তারা ভোটের মাঠও বদলে দেবে।

রাজনীতিতে আরও সচেতন ও বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হলে, আমাদের মনের ভেতরের এই অবচেতন কাঠামো বা ‘ফ্রেম’গুলোকে চিনতে হবে। তরুণ ভোটারদের বুঝতে হবে, ঠিক কোন পেছনের গল্পগুলো তাদের মতামতকে প্রভাবিত করছে। এই ধারণাগুলোকে সচেতনভাবে যাচাই-বাছাই ও চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমেই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এতে তারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে আরও সচেতনভাবে অংশ নিতে পারবে।

বাংলাদেশের জেন জেড কেবল নতুন ভোটার নয়; তারা রাজনৈতিক অর্থে একটি নতুন মানসিক পরিকাঠামো। প্রশ্ন হলো, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি এই নতুন মনোজগৎকে বোঝার মতো প্রস্তুত? নাকি তারা এখনো ১৮ শতকের রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে ২১ শতকের নাগরিককে বোঝানোর চেষ্টা করবে? দেশের রাজনীতি কি এই নতুন প্রজন্মকে বুঝতে প্রস্তুত?

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।