বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন কিছু নাম আছে, যাদের চারপাশে শুধু দলীয় অনুসারী নয়; বরং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতার দীর্ঘ ছায়া জড়িয়ে থাকে। বেগম খালেদা জিয়া সেই নামগুলোর অন্যতম। তাঁর অসুস্থতার এই সময়ে যেভাবে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে মানুষের প্রার্থনা, উদ্বেগ ও শুভকামনা একই সুরে উচ্চারিত হচ্ছে তা দেখায় তিনি কেবল কোনও দলের নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যাকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক স্মৃতি এক গভীর স্রোতধারার মতো বহমান।
১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি যে পরিস্থিতিতে রাজনীতির মঞ্চে আসেন, সেটি ছিল গভীর ব্যক্তিগত শোক ও অনিশ্চয়তার সময়। সেই শোকের মাঝেই তিনি ধীরে ধীরে যে নেতৃত্ব গড়ে তোলেন, তা পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০- এই সাত বছরের দীর্ঘ সংগ্রামে তাঁর গৃহবন্দি থাকা, বারবার গ্রেফতার, শান্ত ও সংযত আচরণে রাজপথে দৃঢ় উপস্থিতি সবকিছু তাঁকে জনগণের কাছে বিকল্প নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।তাঁর নেতৃত্বের বাস্তবতা তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ভিন্ন রাজনৈতিক জোটের আন্দোলন একজন নারী হিসেবে স্বাভাবিক দক্ষতায় পরিচালনা করেন, একটি যুগ পরিবর্তনের আন্দোলনকে পৌঁছে দেন ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিণতিতে।
১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্তটি শুধু প্রতীকী অগ্রগতি নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রচিন্তার মোড় পরিবর্তনের সূচনা। তাঁর নেতৃত্বেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা, যেখানে নির্বাহী ক্ষমতা সংসদের কাছে জবাবদিহির আওতায় ফেরে। রাষ্ট্রপরিচালনার কাঠামো, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নীতি প্রণয়নের নতুন একটি ধারা সেই সময়ে দৃশ্যমান হয়।তাঁর শাসনামলের কিছু সিদ্ধান্ত আজও বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পুনর্বাসনে তাঁর দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ, মেয়েদের শিক্ষায় বিপ্লবী পদক্ষেপ-উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই, বিদ্যালয়মুখী কর্মসূচি, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সংরক্ষিত নারী আসনের সম্প্রসারণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা তাঁর অনন্য অবদান।
দ্বিতীয় মেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো তাঁর প্রশাসনিক সক্ষমতার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে। ২০০৪ সালের বন্যার সময় তাঁর সরকারের সমন্বিত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমও সেই অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পরিচায়কই বটে।
তবে তাঁর পথ কখনোই সহজ ছিল না। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা, দীর্ঘ কারাবাস, গৃহবন্দি জীবন, অপপ্রচার, সবকিছুর মাঝেও তাঁর নীরব সংযম, রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং সহনশীল আচরণ তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ব্যতিক্রমী মর্যাদা দিয়েছে। এমনকি মতাদর্শগতভাবে বিপরীতমুখী রাজনীতিকরাও অনেক সময় তাঁর ধৈর্য ও অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করেছেন।আজ যখন দেশের রাজনীতি আবারও এক নতুন ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে, দীর্ঘ দুঃশাসনের অবসানের পর নতুন পথচলা শুরু হচ্ছে তখন জনগণ এমন একজন অভিভাবকের প্রত্যাশা করছে যিনি অভিজ্ঞ, পরিণত, বিভক্ত রাজনীতিকে সংকুচিত করে ঐক্যের রেখা তৈরি করতে পারেন। এই জায়গায় এসে বেগম জিয়ার অসুস্থতা একটি বৃহৎ শূন্যতাবোধ তৈরি করছে, যেটি মানুষের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলছে। তাঁর নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সংযম সবই আজকের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য মূল্যবান সম্পদ।
বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনও বিশ্বাস করেন, পরীক্ষিত নেতৃত্ব মানেই গণতন্ত্রের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক পথরেখা। এই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে আজও রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।তিনি ইতিহাসের অংশ। তিনি বর্তমানেরও প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিও।
আজ তাঁর অসুস্থতার মুহূর্তে দেশজুড়ে যে প্রার্থনা, উদ্বেগ এবং মানবিক সংহতির ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কিছু নেতার উপস্থিতি কেবল রাজনৈতিক নয়, তা একটি জাতির মানসিক ভরসার অংশ। বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতি ও আবেগে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান ঠিক তেমনই এক গভীর, অমলিন উপস্থিতি। আর তাই সর্বস্তরের মানুষের চাওয়া বাংলাদেশের এই রাজনীতিকের সুস্থতা এবং তাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অভিভাবকত্ব।
রিপোর্টারের নাম 

























