মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০২:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬

জীবনের শেষ আশ্রয়: ২০ বছরে ৩০ হাজার কফিনের কারিগর গোরখোদক মিঞা হোসেন

শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা ঝড়-তুফান—কোনো কিছুই দমাতে পারে না তাদের। যখনই কোনো মৃতদেহ আসে, তখনই শুরু হয়ে যায় তাদের কর্মব্যস্ততা। দিন বা রাত, আপন-পর নির্বিশেষে নিঃস্বার্থভাবে তারা খনন করেন কবর। এরপর মৃত ব্যক্তিকে নিজ হাতে কবরে শুইয়ে দিয়ে দোয়া শেষে বাড়ি ফেরেন।

এমনই এক নিবেদিতপ্রাণ গোরখোদক মিঞা হোসেন, যিনি গত ২০ বছরে অন্তত ৩০ হাজার মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করেছেন। ৫০ বছর বয়স্ক এই মানুষটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে মাটির অন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন। বাবা সোহরাব মিঞার হাত ধরেই তার এই পেশায় আসা। মিঞা হোসেন জানান, এখন কবর না খুঁড়লে যেন পেটে ভাতই হজম হয় না।

৩৫ বছর বয়সী ইকবাল জানান, তার আয়ের অন্য কোনো পথ নেই। দিনে তিন-চারটি কবর খনন করে তিনি ৩০০ থেকে হাজার টাকা আয় করেন। মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা খুশি হয়ে যা দেন, তাই নেন তারা। কোনো জোর করেন না, আবার কোনো দাবিও করেন না। গরিব মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে তারা কোনো টাকা নেন না, বরং ভালোবেসেই কাজটি করে দেন।

তবে এমনও মানুষ আসেন, যারা স্বজনদের কবরস্থ করে কোনো টাকা-পয়সা না দিয়েই চলে যান। মানবতার খাতিরে তারা তা মেনে নেন। শুধু কবর খননই নয়, কবরের দেখভালও করেন তারা। এতে কিছু স্বজন খুশি হয়ে মাসিক একটা টাকা দেন, যা তাদের বাড়তি আয়। প্রতিদিনের আয় আর এই বাড়তি টাকায় কোনোমতে তাদের সংসার চলে।

গোরখোদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রতিদিন নিজ দায়িত্বে এই কাজ করেন। বেশিরভাগ মানুষের দেহের মাপ অনুযায়ী সাড়ে তিন হাত গভীর করে তারা প্রতিটি কবর কাটেন। কবর খননের পর বাঁশ ও চাটাই সরবরাহ করা হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে।

কবরস্থান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৩৫টি লাশ আসে। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য সরকারি ফি ৫০০ টাকা। ছোট বাচ্চাদের লাশের জন্য চাটাই, কবর খোদাই ও বাঁশের জন্য ৪৪৮ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। ছোট থেকে বয়স্ক লাশের দাফনের জন্য মোট ১ হাজার ১০৫ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হয়।

পৃথিবীতে বিচিত্র পেশার মানুষের বাস। তেমনি কিছু মানুষ মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এমন অনেক গোরখোদক রয়েছেন, যাদের জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই রকম—নিঃস্বার্থ সেবা আর সীমিত আয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিটি শিক্ষার্থীর একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

জীবনের শেষ আশ্রয়: ২০ বছরে ৩০ হাজার কফিনের কারিগর গোরখোদক মিঞা হোসেন

আপডেট সময় : ১২:৪২:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা ঝড়-তুফান—কোনো কিছুই দমাতে পারে না তাদের। যখনই কোনো মৃতদেহ আসে, তখনই শুরু হয়ে যায় তাদের কর্মব্যস্ততা। দিন বা রাত, আপন-পর নির্বিশেষে নিঃস্বার্থভাবে তারা খনন করেন কবর। এরপর মৃত ব্যক্তিকে নিজ হাতে কবরে শুইয়ে দিয়ে দোয়া শেষে বাড়ি ফেরেন।

এমনই এক নিবেদিতপ্রাণ গোরখোদক মিঞা হোসেন, যিনি গত ২০ বছরে অন্তত ৩০ হাজার মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করেছেন। ৫০ বছর বয়স্ক এই মানুষটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে মাটির অন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন। বাবা সোহরাব মিঞার হাত ধরেই তার এই পেশায় আসা। মিঞা হোসেন জানান, এখন কবর না খুঁড়লে যেন পেটে ভাতই হজম হয় না।

৩৫ বছর বয়সী ইকবাল জানান, তার আয়ের অন্য কোনো পথ নেই। দিনে তিন-চারটি কবর খনন করে তিনি ৩০০ থেকে হাজার টাকা আয় করেন। মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা খুশি হয়ে যা দেন, তাই নেন তারা। কোনো জোর করেন না, আবার কোনো দাবিও করেন না। গরিব মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে তারা কোনো টাকা নেন না, বরং ভালোবেসেই কাজটি করে দেন।

তবে এমনও মানুষ আসেন, যারা স্বজনদের কবরস্থ করে কোনো টাকা-পয়সা না দিয়েই চলে যান। মানবতার খাতিরে তারা তা মেনে নেন। শুধু কবর খননই নয়, কবরের দেখভালও করেন তারা। এতে কিছু স্বজন খুশি হয়ে মাসিক একটা টাকা দেন, যা তাদের বাড়তি আয়। প্রতিদিনের আয় আর এই বাড়তি টাকায় কোনোমতে তাদের সংসার চলে।

গোরখোদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রতিদিন নিজ দায়িত্বে এই কাজ করেন। বেশিরভাগ মানুষের দেহের মাপ অনুযায়ী সাড়ে তিন হাত গভীর করে তারা প্রতিটি কবর কাটেন। কবর খননের পর বাঁশ ও চাটাই সরবরাহ করা হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে।

কবরস্থান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৩৫টি লাশ আসে। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য সরকারি ফি ৫০০ টাকা। ছোট বাচ্চাদের লাশের জন্য চাটাই, কবর খোদাই ও বাঁশের জন্য ৪৪৮ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। ছোট থেকে বয়স্ক লাশের দাফনের জন্য মোট ১ হাজার ১০৫ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হয়।

পৃথিবীতে বিচিত্র পেশার মানুষের বাস। তেমনি কিছু মানুষ মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এমন অনেক গোরখোদক রয়েছেন, যাদের জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই রকম—নিঃস্বার্থ সেবা আর সীমিত আয়।