ইতিহাসের পাতায় রাজা, সেনাপতি, সম্রাট বা বিজয়ীদের নাম বড় করে লেখা হলেও, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা প্রায়শই একই ধরনের চিত্র দেখতে পাই। দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর, যারা এই পরিবর্তনের মূল কারিগর ছিলেন, তাদের অনেকেই আজ বিস্মৃতির অতলে।
বিগত সরকারের আমলে কথিত উন্নয়নের গল্পে গড়ে ওঠা উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বহুতল ভবনের পেছনে যাদের ঘর ভেঙেছে, দোকান উচ্ছেদ হয়েছে, বস্তি রাতারাতি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, বা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা কোথায়? তাদের প্রায়শই ‘অবৈধ দখলদার’, ‘উন্নয়নবিরোধী’ বা ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়। অথচ জুলাইয়ের সেই জনদ্রোহে এসব মানুষই ছিলেন সবার সামনে, প্রথম সারিতে। কিন্তু আন্দোলন শেষ হতে না হতেই তারা যেন হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতা থেকে।
জুলাই মাসে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই চর্বিতচর্বণের ইতিহাস কমবেশি সবাই লিখছে। কিন্তু যারা এই আন্দোলনে নিজের বাড়ির সামনে থেকেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের কেন হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়, সেই প্রশ্নটাও করা দরকার। যারা আন্দোলনে গিয়েছিল, অন্যদের মতো তাদেরও ঘর ছিল, হাঁড়ি ছিল, বিছানা ছিল, ছেলেমেয়ের স্কুল ছিল, মেয়ের বিয়ের সঞ্চয় ছিল, রোগে আক্রান্ত বাবা-মায়ের ওষুধ ছিল। তাদের অনুন্নত জীবনের শত কান্নার আড়ালে ছিল কিছু হাসিমুখ আর হাসিমাখা গল্প। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের কথিত উন্নয়নের ভাষায় এগুলোকে বলা হতো ‘পুনর্বাসন সমস্যা’ বা ‘ক্ষতিপূরণ জটিলতা’। অথচ এরাই যখন আন্দোলন করে সেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিল, তখন সুকৌশলে তাদের আবারও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিহাসের পাদটীকা থেকেও।
যদি আমরা মানুষের ভাষায় জুলাইয়ের ইতিহাস লিখতে চাই, তখন এগুলো হতে পারে ভিটেহারা হওয়া, স্মৃতিহারা হওয়া এবং নিরাপত্তাহারা হওয়া কিছু মানুষের চরম নির্মম আর্তনাদ। সম্ভবত এজন্যই এই ঘটনাগুলো ইতিহাস থেকে বাদ পড়ে যায়, বা বাদ দেওয়া হয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, জুলাইয়ে কেউ মিছিলে স্লোগান দিয়েছিলেন, কেউ আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কেউ গোপনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন, কেউ ওষুধ কিনে দিয়েছিলেন। কেউ নিজের ঘরের দরজা খুলেছিলেন। কেউ ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় বিকল্প পথে তথ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন। কেউ খাবার রান্না করেছিলেন। কেউ সন্তানকে হারানোর ভয় বুকের ভেতর চেপে রেখে অন্যের সন্তানকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আবার কেউ হয়তো শুধু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে সমর্থন জানিয়েছিলেন—তাদের সকলের সম্মিলিত আত্মত্যাগই এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি ছিল।
রিপোর্টারের নাম 

























