ঢাকা ০২:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

অপরিকল্পিত উন্নয়নে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল, হারাচ্ছে ঐতিহ্য

নাটোরের সিংড়া থেকে খায়রুল ইসলাম জানান, অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে দিন দিন আয়তন কমছে দেশের অন্যতম বৃহৎ চলনবিল। যুগ যুগ ধরে মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, জাতীয় মহাসড়ক, ব্রিজ নির্মাণ এবং পুকুর খননসহ নানা কর্মকাণ্ড চলনবিলকে তার ঐতিহ্য ও জৌলুস থেকে বঞ্চিত করছে। এর ফলে বিলের আয়তন, পানির প্রবাহ ও গভীরতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত চলনবিল বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে গঠিত। ১ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি আয়তনের এই বিলটি বর্তমানে পলিমাটি জমে বর্ষাকালে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।

চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদীর অনেকগুলোই পলি জমে ভরাট হয়ে নাব্য সংকটের কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। একসময় এসব নদনদী ও খালে মাছ শিকারের সঙ্গে ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষও মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

একসময় চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসী, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, আইড়, পাবদার মতো মাছ খুব জনপ্রিয় ছিল। নদনদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবেশ না করা এবং অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের ফলে দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে। ফলে অনেক জেলে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। জেলেদের উৎপাদিত দেশীয় শুঁটকি মাছ বিদেশে রপ্তানি হতো এবং এই শুঁটকি তৈরির সঙ্গে হাজারো পরিবার সম্পৃক্ত ছিল। বর্ষায় মাছ বিক্রির টাকায় জেলেদের সারা বছরের খোরাক জুটতো। কিন্তু মাছ কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও কমে গেছে, ফলে কমেছে শুঁটকি উৎপাদনকারীদের সংখ্যাও।

১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহে চরমভাবে বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ চলনবিলের ওপর বড় বাধা তৈরি করে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮.৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইস গেট নির্মাণ হয়েছে। চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, যা পানির গতিপথ বন্ধ করে দিয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বেলুচিস্তানের কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে ৩২ শ্রমিক নিহত, ১০ জন নিখোঁজ

অপরিকল্পিত উন্নয়নে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল, হারাচ্ছে ঐতিহ্য

আপডেট সময় : ১২:০৬:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

নাটোরের সিংড়া থেকে খায়রুল ইসলাম জানান, অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে দিন দিন আয়তন কমছে দেশের অন্যতম বৃহৎ চলনবিল। যুগ যুগ ধরে মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, জাতীয় মহাসড়ক, ব্রিজ নির্মাণ এবং পুকুর খননসহ নানা কর্মকাণ্ড চলনবিলকে তার ঐতিহ্য ও জৌলুস থেকে বঞ্চিত করছে। এর ফলে বিলের আয়তন, পানির প্রবাহ ও গভীরতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত চলনবিল বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে গঠিত। ১ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি আয়তনের এই বিলটি বর্তমানে পলিমাটি জমে বর্ষাকালে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।

চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদীর অনেকগুলোই পলি জমে ভরাট হয়ে নাব্য সংকটের কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। একসময় এসব নদনদী ও খালে মাছ শিকারের সঙ্গে ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষও মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

একসময় চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসী, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, আইড়, পাবদার মতো মাছ খুব জনপ্রিয় ছিল। নদনদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবেশ না করা এবং অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের ফলে দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে। ফলে অনেক জেলে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। জেলেদের উৎপাদিত দেশীয় শুঁটকি মাছ বিদেশে রপ্তানি হতো এবং এই শুঁটকি তৈরির সঙ্গে হাজারো পরিবার সম্পৃক্ত ছিল। বর্ষায় মাছ বিক্রির টাকায় জেলেদের সারা বছরের খোরাক জুটতো। কিন্তু মাছ কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও কমে গেছে, ফলে কমেছে শুঁটকি উৎপাদনকারীদের সংখ্যাও।

১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহে চরমভাবে বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ চলনবিলের ওপর বড় বাধা তৈরি করে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮.৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইস গেট নির্মাণ হয়েছে। চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, যা পানির গতিপথ বন্ধ করে দিয়েছে।